এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় টাইমস অফ ইন্ডিয়া-য়।
অপারেশন সিঁদুরের এক বছর পর ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের প্রতিক্রিয়া যতটা না সম্পর্কছেদের মুহূর্ত তার চাইতেও বরং আস্তে আস্তে গড়ে ওঠা কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংহত করার প্রকাশ বলেই মনে হয়েছে। পহেলগাম সন্ত্রাসবাদী হামলায় ২৬ জন নাগরিক নিহত হওয়ার পর নয়াদিল্লির পদক্ষেপগুলি নিছক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল না; সেগুলি ছিল পরিমাপিত, সুচিন্তিত এবং এই সঙ্কেত দেওয়ার জন্য পরিকল্পিত যে, ভারতের এখন তার স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা ও রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি দুটোই রয়েছে। সেই বিবেচনা অনুযায়ী, অপারেশন সিঁদুর এমন একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত, যেখানে উদ্দেশ্য ও সক্ষমতা এক অভূতপূর্ব স্বচ্ছতার সঙ্গে মিলে গিয়েছে।
অভিযানগত পর্যায়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতের সামরিক সমন্বয়ের পরিপক্বতা। যে ব্যবস্থাটি প্রায়শই বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতার জন্য সমালোচিত হয়, সেখানে চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফের অধীনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর নির্বিঘ্ন সমন্বিতকরণ এটাই প্রমাণ করে যে, ভারত চাপের মুখেও জটিল ও বহুমাত্রিক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। এর পাশাপাশি দেশীয় ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহারও ছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে, প্রতিরক্ষায় আত্মনির্ভরশীলতার প্রচেষ্টা এখন যুদ্ধক্ষেত্রে বাস্তব সুবিধায় রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে। এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের সক্ষমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারতের সামর্থ্যের উপর আস্থাকে আরও জোরদার করেছে।
নিয়ন্ত্রণ রেখার বাইরে পাকিস্তানের কৌশলগত গভীরতায় আঘাত হেনে ভারত দেখিয়ে দিয়েছে যে, পারমাণবিক প্রতিরোধের দ্বারা আরোপিত সীমাবদ্ধতাগুলি এক সময় যতটা কঠোর বলে মনে করা হত, বাস্তবে ঠিক ততটাও প্রযোজ্য নয়।
যুদ্ধক্ষেত্রের সম্প্রসারণও সমান তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। নিয়ন্ত্রণ রেখার বাইরে পাকিস্তানের কৌশলগত গভীরতায় আঘাত হেনে ভারত দেখিয়ে দিয়েছে যে, পারমাণবিক প্রতিরোধের দ্বারা আরোপিত সীমাবদ্ধতাগুলি এক সময় যতটা কঠোর বলে মনে করা হত, বাস্তবে ঠিক ততটাও প্রযোজ্য নয়। উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে পঙ্গু হয়ে পড়ার পরিবর্তে নয়াদিল্লি দেখিয়েছে যে, সতর্ক ভাবে পরিকল্পিত প্রচলিত অভিযানগুলি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেও ক্ষতিসাধন করতে পারে। সামুদ্রিক মাত্রাটি এই পরিবর্তনকে আরও শক্তিশালী করেছে, যেখানে নৌবাহিনী মোতায়েন অভিযানের পরিধিকে প্রসারিত করেছে।
অপারেশন সিঁদুরের কূটনৈতিক পরিণতি এই ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসকে আরও জোরদার করেছে। পাকিস্তানের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি আরও সুসংহত হয়েছে এবং এমন একটি কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সম্পৃক্ততা স্পষ্টতই আচরণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জল ও সংযোগের মতো পূর্বে বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রগুলিকে বৃহত্তর নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে নয়াদিল্লি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, প্রক্সি সহিংসতাকে সমর্থন করার পরিণাম কেবল শাস্তিমূলকই নয়, বরং বহুমাত্রিক হবে।
অপারেশন সিঁদুরের প্রতি আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ভারতের বাহ্যিক পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র প্রদান করে চলেছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় উত্তেজনা বৃদ্ধির বদলে সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী অভিযান হিসেবে ভারতের ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়েছে। কিন্তু এক বছর পর এ কথা স্পষ্ট যে, এই ‘স্বীকৃতি’ রূপান্তরমূলক না হয়ে বরং শর্তসাপেক্ষ ছিল। বস্তুত, এই ঘটনাটি ভারত-মার্কিন সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যমান লেনদেনমূলক মনোভাবকে উন্মোচিত করেছে। ওয়াশিংটনের জন্য ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। কিন্তু পাকিস্তান-সম্পর্কিত সঙ্কটের ক্ষেত্রে সেই অংশীদারিত্বের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করার দাবিকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দাবিটি সঠিক হোক বা না হোক, এ ধরনের দাবি ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সতর্ক ভাবে গড়া আখ্যানকে জটিল করে তোলে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার যে কোনও প্রস্তাবকেই প্রতিহত করে আসছে, বিশেষ করে কাশ্মীর-সম্পর্কিত বিষয়গুলিতে। এমনকি বাহ্যিক হস্তক্ষেপের আভাসও অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে দেওয়া বার্তাটিকে দুর্বল করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। তার পর থেকেই এই দাবিটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ছায়া ফেলেছে এবং সেই ঘটনার রেশ ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে সূক্ষ্ম ভাবে হলেও প্রভাবিত করে চলেছে।
অপারেশন সিঁদুর সম্পর্কে চিনের ব্যাখ্যা ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত আত্মবিশ্বাসকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পাকিস্তানের অস্ত্রাগারে থাকা চিনা অস্ত্র ও ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্বাভাবিক ভাবেই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের পদক্ষেপ করার সদিচ্ছা জটিল পরিস্থিতিতে কাজ করার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
পাকিস্তানের জন্য এই দাবিগুলি কিছুটা কূটনৈতিক স্বস্তি এনে দিয়েছিল। মার্কিন সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত - তা যতই দুর্বল হোক না কেন - ভারতের সঙ্গে বিরোধকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করে। সেই অর্থে দেখতে গেলে, আখ্যান নিয়ে এই লড়াইটি প্রায় অভিযানটির মতোই তাৎপর্যপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়েছে। অপারেশন সিঁদুর প্রতিরোধের একটি নতুন যুক্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরিকল্পিত হয়েছিল, কিন্তু এর ব্যাখ্যা এখনও বিতর্কিত। ভারত কি একতরফা ভাবে ক্ষতিসাধন করতে সফল হয়েছিল, না কি শেষ পর্যন্ত বাহ্যিক চাপের অধীনে উত্তেজনা প্রশমন করা হয়েছিল? এই অস্পষ্টতা পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সম্পর্কের শর্তাবলি পুনর্নির্ধারণের জন্য ভারতের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তোলে। তবে রাওয়ালপিন্ডি আন্তর্জাতিক আখ্যানকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেও, অপারেশন সিঁদুরের ফলাফল প্রক্সি শক্তির উপর তার দীর্ঘদিনের নির্ভরতার মূল্যকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। দ্বিপাক্ষিক সমীকরণে আরও কঠোর হওয়ার এই পরিবর্তন কেবল ভারতের সংকল্পকেই প্রতিফলিত করে না, বরং অস্বীকারযোগ্য আগ্রাসনের সুযোগ সম্পর্কে ইসলামাবাদের প্রত্যাশার পুনর্বিন্যাসকেও তুলে ধরে।
অপারেশন সিঁদুর সম্পর্কে চিনের ব্যাখ্যা ভারতের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত আত্মবিশ্বাসকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। পাকিস্তানের অস্ত্রাগারে থাকা চিনা অস্ত্র ও ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্বাভাবিক ভাবেই মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের পদক্ষেপ করার সদিচ্ছা জটিল পরিস্থিতিতে কাজ করার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। বেজিংয়ের জন্য, এটি ভারতকে মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ করে— কেবলমাত্র একটি মহাদেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং আরও বহুমুখী ও সক্ষম কৌশলগত শক্তি হিসেবে।
এক বছর পর, যা স্পষ্ট হচ্ছে তা কোনও অনমনীয় মতবাদ নয়, বরং আচরণের একটি সুস্পষ্টতর ধরন। ভারত পরিমিত ও উদ্দেশ্যমূলক ভাবে শক্তি প্রয়োগের সদিচ্ছা প্রদর্শন করেছে, যা নমনীয়তা বজায় রেখে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। সুতরাং, ‘অপারেশন সিঁদুর’ ভারতের কৌশলগত পরিপক্বতার একটি চিহ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আগামিদিনের চ্যালেঞ্জ হবে এই ভারসাম্য বজায় রাখা এবং এটা নিশ্চিত করা যে, দৃঢ়তা যেন বিচক্ষণতা দ্বারাই পরিচালিত হয়।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় টাইমস অফ ইন্ডিয়া-য়।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +