কঠোর শক্তি প্রয়োগ এবং ভূ-রাজনীতি মহাসাগর ও বাণিজ্য পথগুলিকে সংঘাতের রণাঙ্গনে পরিণত করায় বিশ্ব ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলাফল বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন রূপ দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বের উপর এর প্রভাব অবশ্যই সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে হবে। বৈশ্বিক সম্পর্কের জালিকার শেষ সুতোটিও ছিঁড়ে যেতে দেওয়া যাবে না।
একসময় বাণিজ্যের ধারাগুলি বাণিজ্যের এক সমৃদ্ধ জাল বুনেছিল, যেখানে স্থিতিশীল পথ এবং বিনিময় কেন্দ্রগুলি দেশগুলির সমৃদ্ধি বাড়িয়ে তুলেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানচিত্র আর শান্ত নেই—আমরা এখন কঠিন শক্তির উত্তাল সমুদ্র এবং ভূ-রাজনীতির হিংস্র মহাসাগরে ভেসে চলেছি।
সমুদ্র ডাকাতি এক সময়কার বেপরোয়া দুঃসাহসিকতা থেকে বিবর্তিত হয়ে এখন পুরো অর্থনীতির উপর একটি পদ্ধতিগত আক্রমণে পরিণত হয়েছে। আজ বাণিজ্যের ভাগ্য দুটি শক্তিধর দেশের হাতে পণবন্দি, যাদের একজন পূর্বের এবং অন্যজন পশ্চিমের, এবং তারা অর্ধ শতাব্দীর অগ্রগতিকে উল্টে দিতে ও সবচেয়ে বিধ্বংসী অস্ত্রটি ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর: আর তা হল ক্ষমতা।
গত পাঁচ বছরে আমাদের অস্তিত্বের বুনন একটি ভাইরাসের দ্বারা প্রায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, এবং এখন বাণিজ্যের বুননও ছিন্নভিন্ন হওয়ার পথে। প্রথমটি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। কোভিড এবং এর রূপান্তরিত রূপগুলো প্রতিটি সংস্থাকে সংক্রমিত করেছে, প্রতিটি অর্থনীতিকে আঘাত করেছে, এবং প্রতিটি দেশকে দুর্বল করে দিয়েছে। এটি বিশ্ব জিডিপিতে ২.৩৭ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে, যা ইতালি, কানাডা বা ব্রাজিলের পুরো অর্থনীতির চেয়েও বড়। সরকারগুলি ব্যাপকভাবে বর্ধিত সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে আর্থিক সংকট মোকাবিলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
বাণিজ্যের দ্বিতীয় স্তম্ভটি দুটি বৃহত্তম অর্থনীতির বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের গোপন ও প্রকাশ্য হাতিয়ার দ্বারা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), যা একটি বৈশ্বিক সংযোগ প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল, তা 'উলফ-ওয়ারিয়র ডিপ্লোম্যাসি' এবং ঋণ-ফাঁদের মাধ্যমে আগ্রাসনের একটি ময়দানে পরিণত হয়েছে।
প্রযুক্তিগতভাবে, বেজিং তার ৫জি পরিকাঠামোর মাধ্যমে বিশ্বের ডেটায় অনুপ্রবেশ এবং দখল করার চেষ্টা করেছে; দেশগুলি এই হুমকি উপলব্ধি করে তাদের ব্যবস্থাগুলিকে সুরক্ষিত করেছে। বিআরআই এখন তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ভারে নুয়ে পড়ছে, এমনকি বেজিং নিজেকে বিশ্বায়নের একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, এবং একইসঙ্গে এমন নীতিগত হাতিয়ার ব্যবহার করছে যা বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহকে ব্যাহত করে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার দ্বারা চালিত হয়ে, ফেব্রুয়ারি ২০১৫ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্কের গুলি চালিয়ে বাণিজ্যের কাঠামোকে ক্ষতবিক্ষত করছেন। এগুলি বাণিজ্য বাধার রূপ নিলেও, প্রকৃতপক্ষে এগুলি ব্যাপক ভীতি প্রদর্শনের অস্ত্র হিসেবে কাজ করে, যা প্রতিপক্ষ এবং মিত্র উভয়কেই নতজানু করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
কানাডা ও মেক্সিকো থেকে শুরু করে ইউরোপের মিত্রদেশগুলি, ব্রিকসের মতো জোট এবং ভারতের মতো দেশ—খুব কম দেশই এর থেকে রেহাই পেয়েছে। এমনকি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাও বিরোধ নিষ্পত্তিতে নিজেকে অক্ষম দেখতে পাচ্ছে। একমাত্র ব্যতিক্রম: চিন, যাকে ট্রাম্প কোনও পরিণতি ছাড়া ভয় দেখাতে পারেন না।
ফলস্বরূপ, যে বুননটি ধারণা, পণ্য, কর্মসংস্থান এবং সমৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তা এখন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? চলুন, কোনও সূত্র খুঁজে পেতে সমুদ্রের দিকে তাকাই। এক সময়ের উন্মুক্ততার প্রতীকগুলি এখন ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালে বিশ্ব বাণিজ্য ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে: যার মধ্যে প্রায় ২৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের পরিষেবা অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বের পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ সমুদ্রপথেই পরিবাহিত হয়েছে।
এর এক-চতুর্থাংশের বেশি ১০টি প্রধান সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচল করেছে; এবং প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মাত্র পাঁচটি পথ দিয়ে—ট্রান্স-প্যাসিফিক রুট, সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ-এশিয়া রুট, হরমুজ প্রণালী, উত্তর আটলান্টিক রুট এবং মালাক্কা প্রণালী। উপরন্তু, প্রতিটি ডিজিটাল পরিষেবা—চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত, গেমিং এবং শিক্ষা —সমুদ্রতলের ফাইবার কেবলের উপর নির্ভরশীল, যা ভার্চুয়াল বাণিজ্যের ভাগ্যকে ভূ-রাজনীতির সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে।
প্রতিটি জলপথ এখন প্রভাব বিস্তারের একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সুয়েজ খাল ইয়েমেনের হুথিদের দ্বারা নাশকতার শিকার হচ্ছে। দক্ষিণ চিন সাগর ছোটখাট সংঘর্ষে পরিপূর্ণ এবং সেখানে চিন তার দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় প্রতিবেশী ও তাইওয়ানের বিরুদ্ধে দাবি জানাচ্ছে। পানামা খাল আধিপত্যের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম চিনের প্রতিযোগিতার একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এশীয় ভোক্তাদের জন্য তেলের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী ক্রমাগত হুমকির মুখে রয়েছে। গলিত আর্কটিক পথগুলি নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে, যেখানে রাশিয়া ও পশ্চিমীরা আধিপত্যের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
মালাক্কা প্রণালী, যেখান দিয়ে বিশ্বের বার্ষিক তেল ও কন্টেনার পরিবহণের এক-চতুর্থাংশ চলাচল করে, তা পরবর্তী মার্কিন-চিন সংঘাতের কেন্দ্র হতে পারে। পরিহাসের বিষয় হল, ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক বেজিং এবং নয়াদিল্লিকে একটি অস্বস্তিকর সুবিধাবাদী জোটে ঠেলে দিতে পারে। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে যায়, তবে দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অঞ্চল দুটি আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতার অঞ্চলে রূপান্তরিত হতে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে পণ্যের চেয়ে অর্থ দ্রুত গতিতে চলাচল করে। সমুদ্রের তলদেশের অপটিক্যাল কেবলগুলি প্রতিদিন ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করে। বাণিজ্য ছাড়াও, মহাসাগরগুলিতে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদও রয়েছে। হাওয়াই এবং তাহিতির চারপাশের সমুদ্রে ১০০ বিলিয়ন টন বিরল মৃত্তিকা থাকতে পারে। বিশ্বজুড়ে সম্পদের অনুসন্ধান চলছে।
দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে জলের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, স্থলভাগ নয়, বরং মহাসাগরগুলিতেই একটি বড় ধরনের সামরিক শক্তি সঞ্চয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭৩০ মিলিয়ন মানুষ ১১,০০০ দ্বীপে বাস করেন; কিন্তু ১০ লক্ষেরও বেশি দ্বীপ জনবসতিহীন অবস্থায় পড়ে আছে। বেশ কিছু দ্বীপ প্রতিরক্ষা, সংযোগ এবং অর্থনৈতিক প্রাণশক্তির জন্য কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। ভারতের গ্রেট নিকোবর দ্বীপ প্রকল্পটি এর একটি উদাহরণ। কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ সার্বভৌমত্ব সম্প্রসারণ এবং পরিকাঠামো নির্মাণের একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা, যদিও এটি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ হতে পারে।
সহস্রাব্দ ধরে মহাসাগরগুলি বিভিন্ন দেশকে লালন-পালন ও পুষ্ট করেছে। এখন, সেগুলি জলজ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করতে বদ্ধপরিকর, এবং একই সঙ্গে দুর্বল দেশগুলিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। বাণিজ্যের কাঠামো ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের ভবিষ্যতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, এই কাঠামো যেন মেরামতের অযোগ্যভাবে ছিন্নভিন্ন না হয়ে যায়। যা বিশ্বকে একত্রিত করে রাখে সেই বাণিজ্যিক সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়।
এই ভাষ্যটি প্রথম মিন্ট -এ প্রকাশিত হয়েছিল।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Gautam Chikermane is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. His areas of research are grand strategy, economics, and foreign policy. He speaks to ...
Read More +