চিনা আলোচনায় মোদীর চিন সফরকে ভারতের প্রভাব সম্প্রসারণ এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক গতিশীলতার মধ্যে তার স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
দীর্ঘ সাত বছর পর প্রধানমন্ত্রী মোদীর চিন সফর চিনের অভ্যন্তরে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কারণ সেখানে মানুষজন এই বিতর্কে মেতেছিল যে, চিন-ভারত সম্পর্কের হঠাৎ ইতিবাচক পরিবর্তন কি একটি অস্থায়ী সমন্বয় না কি উভয় দেশের মৌলিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করে এবং পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্মিত একটি কৌশলগত পছন্দ। প্রচলিত মতামত ছিল এই যে, মোদীর চিন সফরের সিদ্ধান্ত কেবল চিন-ভারত সম্পর্ক নয়, বরং ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জনে তার বিশাল, বহুমাত্রিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই ভ্রমণের লক্ষ্য হল বেজিংয়ের সঙ্গে বর্ধিত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চিনের মধ্যে বৃহৎ শক্তি প্রতিযোগিতার জটিল গতিশীলতার মধ্যে ভারতের জন্য আরও কৌশলগত স্থান ও প্রভাব অর্জন করা।
প্রচলিত মতামত ছিল এই যে, মোদীর চিন সফরের সিদ্ধান্ত কেবল চিন-ভারত সম্পর্ক নয়, বরং ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জনে তার বিশাল, বহুমাত্রিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
চিনা পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন যে, প্রধানমন্ত্রী মোদীর চিন সফর আসলে মার্কিন-ভারত সম্পর্কের ভাঙন নয়, বরং ‘উপযোগী কূটনীতি’র একটি ধূর্ত প্রদর্শন। তাঁদের যুক্তি হল এই যে, প্রধানমন্ত্রী মোদী চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক গতিশীলতাকে পুঁজি করছেন; তাই চিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি ওয়াশিংটনকে একটি স্পষ্ট সঙ্কেত পাঠাচ্ছেন যে, ভারত একটি ঘুঁটি নয়, বরং একটি ‘বিশ্বশক্তি’, যার একটি স্বাধীন কৌশলগত ইচ্ছাশক্তি রয়েছে এবং যে উভয় দেশের সঙ্গেই কার্যকরী সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম। এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হল প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি করা, যা মার্কিন-ভারত সম্পর্কে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকা থেকে ভারতকে বিরত রাখবে।
উল্লেখ্য যে, মার্কিন-ভারত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্য, শুল্ক, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি লেনদেন এবং অস্ত্র ক্রয়ের মতো বিষয়গুলিতে উভয় পক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়ে গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘আধা-মিত্র’ হিসেবে দেখে এবং আশা করে যে, ভারত মার্কিন অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। অন্য দিকে ভারত ‘বিশ্বশক্তি’ হিসেবে তার অবস্থানের উপর জোর দেয় এবং অধস্তন ভূমিকায় মাথা নিচু করে থাকতে অস্বীকার করছে। মোদীর চিন সফরের উদ্দেশ্য হল ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের’ উপর তাঁর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা এবং চিনের সঙ্গে পুনঃসম্পর্কের মাধ্যমে জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে ‘উভয় পক্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে’ এবং নিজের স্বার্থ সর্বাধিক করার ক্ষেত্রে ভারতের ক্ষমতা প্রদর্শন করা।
অন্য দিকে, চিনা পক্ষ উল্লেখ করেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক গভীরতর হওয়ার পরেও ভারত এখনও ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় থেকে রাশিয়াকে একটি সময়-পরীক্ষিত ‘কৌশলগত সমর্থন’ হিসাবে বিবেচনা করে আসছে। চিনা ভাষ্যকাররা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক চিন-ভারত এবং চিন-রাশিয়া সম্পর্কের চেয়ে বেশি স্থিতিশীল। যুক্তি দেওয়া হয় যে, ভারত এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে চায় এবং অন্য দিকে রাশিয়ার সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ককে চিন, পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য ঘনিষ্ঠ জোটকে প্রতিহত করার জন্য ব্যবহার করে, যার ফলে ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ সুরক্ষিত হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ‘আধা-মিত্র’ হিসেবে দেখে এবং আশা করে যে, ভারত মার্কিন অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। অন্য দিকে ভারত ‘বিশ্বশক্তি’ হিসেবে তার অবস্থানের উপর জোর দেয় এবং অধস্তন ভূমিকায় মাথা নিচু করে থাকতে অস্বীকার করছে।
চিনা মূল্যায়ন অনুযায়ী, মোদী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কৌশল হল এমন একটি ‘বহুমেরুকৃত বিশ্ব’ নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা, যা কোনও একক পরাশক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন উভয়ের বিরুদ্ধে ‘কৌশলগত গভীরতা’ প্রদান করে এবং উভয় পক্ষের চাপের সম্মুখীন হলে কৌশলগত পদক্ষেপের সুযোগ নিশ্চিত করে। অতএব, মোদীর চিন সফর কেবল চিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয়, বরং তাঁর ‘সর্বব্যাপী কূটনীতি’ কৌশলের একটি অংশ, যার লক্ষ্য হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে স্বাধীন ও বাস্তবসম্মত মিথস্ক্রিয়া বজায় রেখে ভারতের জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত প্রভাব সর্বাধিক করা।
‘মোদীর চিন সফর তাৎপর্যপূর্ণ হলেও তিনি বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে যোগ দেননি, যা ভবিষ্যতে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের পুনর্মিলনের সুযোগ করে দিয়েছে... বিপরীতে, সফরের ঠিক আগে ভারত চিনের প্রভাবের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য জাপান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্সের মতো দেশগুলির সঙ্গে যোগ দিয়েছে এবং ‘কোয়াড্রিল্যাটেরাল সিকিউরিটি ডায়লগ’-এর প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। অন্য দিকে, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ও সংবেদনশীল সীমান্ত সমস্যাগুলি চিন-ভারত সম্পর্ককে বিপর্যস্ত করে তুলছে। সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের ডিরেক্টর এবং ফুদান ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর আমেরিকান স্টাডিজের অধ্যাপক ঝাং জিয়াদং উল্লেখ করেছেন, ‘চিন-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোনও অপ্রত্যাশিত ঘটনা এই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতিকে সহজেই বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।’
চিন ভারতের হিসাব-নিকাশ (অর্থাৎ ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানকে খর্ব করার জন্য চিনকে ব্যবহার করা’) বুঝতে পারলেও চিন এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তার নিজস্ব স্বার্থকে সর্বাধিক করে তুলতে আগ্রহী। চিন ভারতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে ইচ্ছুক। কারণ তাদের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের স্থিতিশীলতা ও ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার সামগ্রিক চিন-মার্কিন সমীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই অনুযায়ী, চিন একাধিক ক্ষেত্রে ভারতের দিকে ঝুঁকছে। যেমন চিনা নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা পুনরায় চালু করা, চিন ও ভারতের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু করা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রকল্প শুরু করা, ‘ওয়ান-চায়না’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করা এবং তাইওয়ানকে চিনের অংশ হিসেবে প্রকাশ্যে গ্রহণ করা। এই সবই চিন অবশ্য করছে বিরল পার্থিব চুম্বক, সার ও টানেল বোরিং মেশিন ইত্যাদির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে।
চিন ভারতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে ইচ্ছুক। কারণ তাদের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের স্থিতিশীলতা ও ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার সামগ্রিক চিন-মার্কিন সমীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকৃতপক্ষে কিছু চিনা পর্যবেক্ষক মনে করেন যে, চিন-ভারত আলোচনা তাৎক্ষণিক ভাবে সফল না হলেও তা তেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে না। কারণ চিনের জন্য প্রাথমিক উদ্বেগ হল, ভারত-মার্কিন সম্পর্ক যাতে আরও বিকশিত না হয়, সে কথা সুনিশ্চিত করা। চিন-মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হওয়ার প্রেক্ষাপটে চিনারা যুক্তি দেন, যে কোনও দেশই যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক না রাখে, তবে সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সে দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত। আর যদি সেই দেশ ভারত হয়, তবে তা আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য।
সংক্ষেপে বললে, আপাতত চিনা পক্ষ বেশ কিছুটা স্বস্তিই বোধ করছে যে, চিন-ভারত অবশেষে কিছু সাধারণ ভিত্তি খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছে এবং নিজেদের পার্থক্যগুলি দূরে সরিয়ে রেখে ও ট্রাম্পের শুল্কের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হওয়ার জন্য একটি যৌথ ফ্রন্ট গঠন করতে পারছে। সর্বোপরি এ কথা মনে রাখতেই হবে যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও চিরন্তন বন্ধু বা শত্রু নেই, কেবল চিরন্তন স্বার্থই বিদ্যমান।
অন্তরা ঘোষাল সিং অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ফেলো।
নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখক(দের) ব্যক্তিগত।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Antara Ghosal Singh is a Fellow at the Strategic Studies Programme at Observer Research Foundation, New Delhi. Her area of research includes China-India relations, China-India-US ...
Read More +