Published on Sep 12, 2025 Updated 0 Hours ago

সীমান্ত সমস্যা এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আলোচনার জন্য নরেন্দ্র মোদী  এবং শি জিনপিং তিয়ানজিনে মিলিত হন। মোদী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর শান্তির গুরুত্বের উপর জোর দেন। উভয় দেশ সীমান্ত নির্ধারণের জন্য কাজ করতে সম্মত হয়েছে। এসসিও ঘোষণাপত্রে পহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করা হয়েছে। ভারত তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অধিকার বজায় রেখেছে। নয়াদিল্লি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাঠিয়েছে ওয়াশিংটনকে।

মোদীর সঙ্গে শি'র সাক্ষাৎ: স্পষ্ট সীমারেখাসহ একটি নতুন প্রয়াস

৩১ আগস্ট সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তিয়ানজিনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাৎ হয়। ২০২০ সালে সীমান্তে ভারত ও চিনের সেনাদের সংঘর্ষের পর এটি মোদীর প্রথম চিন সফর।

এই প্রচারণার মাধ্যমে এবং নিয়মিত এসসিও মন্ত্রী পর্যায়ের আলাপচারিতার সময়, নয়াদিল্লি বেজিংয়ের কাছে তার লাল রেখা স্পষ্ট করে দিয়েছে। মোদী এবং শি'র মধ্যে আলোচনায় প্রধানত সীমান্তের বিষয়টি উঠে এসেছে। মোদী 'পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং পারস্পরিক সংবেদনশীলতার' উপর ভিত্তি করে দুই দেশের মধ্যে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক স্থাপনের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) বরাবর শান্তি ভারত-চিন সম্পর্কের গতিপথের উপর প্রভাব ফেলবে। পূর্ব লাদাখে এলএসি বরাবর সেনা পিছিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু হলেও, এই অঞ্চলে এলএসি-র উভয় পাশে এখনও প্রায় ৫০,০০০-৬০,০০০ সেনা মোতায়েন থাকায় উত্তেজনা এখনও কমেনি।


মোদী দুই দেশের মধ্যে 'পারস্পরিক শ্রদ্ধা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং পারস্পরিক সংবেদনশীলতার' ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলেছেন।



আগস্ট মাসে, চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ২৪তম দফার বিশেষ প্রতিনিধিদের আলোচনার জন্য নয়াদিল্লিতে ছিলেন। ২০০৩ সালের একটি চুক্তিতে এসআরএস মেকানিজম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সীমান্ত প্রশ্নটি সমাধানের উপায়গুলি খতিয়ে দেখার জন্যই এই ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছিল। এই বৈঠকে সীমান্ত এলাকায় সীমানা নির্ধারণের সম্ভাব্যতা নির্ধারণের জন্য ভারত-চিন সীমান্ত বিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয়ের কার্যকরী ব্যবস্থার অধীনে একটি 'বিশেষজ্ঞ দল' গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, এবং এলএসি বরাবর শান্তি বজায় রাখার জন্য কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি 'ওয়ার্কিং গ্রুপ' গঠন করা হয়েছিল। জুন মাসে এসসিওতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকের সময় ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং তাঁর প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন যে, দুই দেশের সীমান্তে সীমানা নির্ধারণের স্থায়ী সমাধান এবং স্থায়ীভাবে সম্পৃক্ততা ও উত্তেজনা হ্রাসের একটি কাঠামোগত রোডম্যাপের লক্ষ্যে কাজ করা উচিত। এইভাবে, যা বিবাদের মূল কারণ ছিল  সেই এলএসি-‌র কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত চিহ্নিত করার উদ্যোগ গতি পেয়েছে।

শি'র কাছে মোদী আরেকটি যে বিষয় উত্থাপন করেছিলেন তা হল সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি, যা ২২ এপ্রিল পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর আবার সামনে এসেছে, যেখানে ২৬ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এসসিও-র পূর্ববর্তী মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও ভারতীয় প্রতিনিধিরা এই বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। জুলাই মাসে এসসিও বৈঠকের সময়, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চিনকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে বহুপাক্ষিক গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করা। নিষিদ্ধ হুয়াওয়ে স্যাটেলাইট ফোন এবং এনক্রিপ্ট করা অ্যাপগুলি পহেলগাম সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত সন্ত্রাসীদের সীমান্তের ওপারে তাদের হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সহায়তা করছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এর আগে, বেজিং জৈশ-ই-মোহাম্মদের রউফ আসগর, লস্কর-ই-তৈয়বার সাজিদ মীর এবং আবদুর রহমান মাক্কিকে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপগুলিতে বাধা দিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং জুন মাসে চিনে এসসিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকে একটি যৌথ বিবৃতি অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, কারণ ভারত তার অবস্থান প্রতিফলিত করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। এই সমন্বিত প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তিয়ানজিনে গৃহীত এসসিও ঘোষণায় বলা হয়েছে যে "তারা মৃত এবং আহতদের পরিবারের প্রতি তাদের গভীর সহানুভূতি এবং সমবেদনা প্রকাশ করেছে, এবং "এই ধরনের হামলার অপরাধী, সংগঠক এবং পৃষ্ঠপোষকদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।" যৌথ ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে যে, "সদস্য রাষ্ট্রগুলি সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি, সন্ত্রাসী, বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলিকে ভাড়াটে উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রচেষ্টার অ-‌গ্রহণযোগ্যতার উপর জোর দেয়।" এটি পাকিস্তানকে সতর্ক করে দেয় কারণ ইসলামাবাদ প্রক্সি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে ব্যবহারের জন্য পরিচিত এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।


নিষিদ্ধ হুয়াওয়ে স্যাটেলাইট ফোন এবং এনক্রিপ্ট করা অ্যাপগুলি পহেলগাম সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত সন্ত্রাসীদের সীমান্তের ওপারে তাদের হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সহায়তা করছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।



পরিশেষে, ভারত ও চিনের মধ্যে পূর্ববর্তী কথোপকথনের সময় তাইওয়ানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। নয়াদিল্লি ও তাইপেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা জোরদার করে আসছে। ফক্সকনের চেয়ারম্যান এবং সিইও ইয়ং লিউ গত বছর প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার পেয়েছিলেন, এবং পরে তিনি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে নয়াদিল্লিতে মোদীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। মোদী-শি শীর্ষ সম্মেলনের পরে  মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তাইওয়ানের বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল। প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকার পরিবর্তে, নয়াদিল্লি দৃঢ়ভাবে বলেছে যে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যেমন চিন-তাইওয়ান সম্পর্ক রয়েছে, সেইভাবে একই ক্ষেত্রে তাইপেইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা ভারতের অধিকারের মধ্যে পড়ে। এছাড়াও, তাইওয়ান ইস্যুতে ভারতের অবস্থানের যেহেতু কোনও পরিবর্তন হয়নি তাই এই দাবিটি বেশ রহস্যজনক, কারণ ভারত এক-চিনের ধারণার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার কথা পুনরাবৃত্তি করেনি। প্রকৃতপক্ষে, প্রয়াত বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ চিনা বিদেশমন্ত্রীকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে চিন যদি এক-ভারত নীতি মেনে না চলে, তাহলে ভারত কেন এক-চিন নীতি মেনে চলতে চাইবে?

তিয়ানজিন শীর্ষ সম্মেলনের সময় মোদী চিনের প্রতি ভারতের লাল রেখা চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন, একইসঙ্গে আমেরিকাকেও তিনি বার্তা দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল আমদানির কারণে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মোদীর ভ্রমণের মাধ্যমে নয়াদিল্লি ওয়াশিংটনকে একটি বার্তা পাঠিয়েছে যে তারা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের উপর আরও বেশি জোর দেবে এবং পিছু হটবে না।



এই মন্তব্যটি মূলত
ইকোনমিক টাইমসে  প্রকাশিত হয়েছিল।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.