Expert Speak Raisina Debates
Published on Feb 04, 2026 Updated 0 Hours ago

সমুদ্রের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় সম্প্রদায়ের জ্ঞানকে তুলে ধরার মাধ্যমে জাদুঘরগুলি একুশ শতাব্দীর জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল এবং জন-কেন্দ্রিক নীল অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সামুদ্রিক স্মৃতি সংরক্ষক হিসেবে মেরিটাইম মিউজিয়াম

একটি স্থিতিশীল নীল অর্থনীতিকে (ব্লু  ইকোনমিঅবশ্যই উপকূলীয় সম্প্রদায়ের কল্যাণকে তার কেন্দ্রে রাখতে হবে। উন্নয়ন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে উপকূলীয় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা এবং তাদের ক্ষমতায়ন করা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা  অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা… দুইয়ের জন্যই অপরিহার্য। তবে এই ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য আমাদের অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। ভারত মহাসাগর ভূমধ্যসাগরের মাঝে এবং উপকূলীয় গ্রাম বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি মাঝে সামুদ্রিক আদান-প্রদানের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যেসমুদ্র সবসময়ই সংযোগআলোচনা এবং সম্মিলিত ভাবে টিকে থাকার ক্ষেত্র ছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারসমূহ এই দীর্ঘ সামুদ্রিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। ১৯৩৮ সালে পম্পেইতে খননকালে একটি ছোট মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছিলযাকে অনেকে লক্ষ্মীর প্রতিরূপ বলে মনে করেছিলেন আবার অন্যরা সেটিকে যক্ষী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা  বিষয়ে একমত যে এটি খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর ভারতীয় শিল্পকর্ম। এর এক বছর আগে তামিলনাড়ুর রিকামেদুতে প্রায় ৪০০টি রোমান আমফোরা (অর্থাৎ দুই হাতলবিশিষ্ট সেরামিক জারআবিষ্কৃত হয়েছিল। ওয়াইনতেল এবং গারুম (মাছ, বিশেষ করে মাছের অন্ত্র জারিত করে তৈরি বিশেষ আচার, যা মূলত রোমান, গ্রিক বাইজান্টাইন সভ্যতায় বহুল ব্যবহৃত হতপরিবহণের জন্য ব্যবহৃত এই পাত্রগুলি ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত এসেছিল। এগুলি স্থানীয়  ভারতীয়দের ব্যবহারের জন্য ছিল নাবরং দূরদেশে বসবাসকারী সেই গ্রিক রোমান বণিকদের জন্য ছিল, যাঁরা বাড়ি থেকে দূরে থেকেও নিজেদের রুচি ঐতিহ্য বজায় রাখতে চেয়েছিলেন।

ভারত মহাসাগর ভূমধ্যসাগরের মাঝে এবং উপকূলীয় গ্রাম বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি মাঝে সামুদ্রিক আদান-প্রদানের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যেসমুদ্র সবসময়ই সংযোগআলোচনা এবং সম্মিলিত ভাবে টিকে থাকার ক্ষেত্র ছিল।

এই ধরনের আবিষ্কারগুলি স্পষ্টতই দর্শিয়েছে যেসামুদ্রিক ইতিহাসকে একটি ‘নুভূমিক’ ইতিহাস হিসেবেই সবচেয়ে ভাল ভাবে বোঝা দরকার বন্দরপোতাশ্রয়মৎস্যজীবী সম্প্রদায় এবং জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রগুলি নিছকই বিচ্ছিন্ন সত্তা ছিল নাবরং তারা ছিল বিনিময়ের এক বিশাল জালের কেন্দ্রবিন্দু। নাবিকবণিক এবং কারিগররা কেবল পণ্যই নয়কৌশলপ্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক প্রথাও সমুদ্রপথে বহন করে নিয়ে যেতেন তাঁরা এমন সম্প্রদায় তৈরি করেছিলেনযেখানে ভাষাধর্ম  রীতিনীতির বৈচিত্র্য সহাবস্থান করত এবং একে অপরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিত। সহস্রাব্দ ধরে বিস্তৃত এই ইতিহাস বর্তমান সময়ের জন্য শক্তিশালী শিক্ষা বহন করে।

আজ যখন আমরা একটি স্থিতিশীল নীল অর্থনীতির লক্ষ্যে কাজ করছিতখন আমাদের অবশ্যই সহাবস্থান  বিনিময়ের এই ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সম্প্রদায়-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগগুলি ইতিমধ্যেই পথ দেখাচ্ছে। মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলি নেতৃত্বে প্রবাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প থেকে শুরু করে প্রজনন ক্ষেত্রগুলিকে রক্ষা রতে সক্ষম ঐতিহ্যবাহী মৎস্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পর্যন্ত… উপকূলীয় সম্প্রদায়গুলি দর্শাচ্ছে যেকী ভাবে স্থানীয় জ্ঞান জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ভিত্তি হতে পারে। পারস্য উপসাগরে জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রগুলিতে এখনও কাঠের ঢো নৌকা তৈরি করা হয়যা প্রায়শই ভারতীয় কারিগরদের দ্বারা নির্মিত হয় এবং যাঁরা বংশপরম্পরায় এই কৌশলগুলি বহন করে চলেছেন। এই অনুশীলনগুলি ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ নেইবরং এগুলি পরিবর্তনশীল বিশ্বের জন্য অভিযোজনযোগ্য  জীবন্ত সমাধান।

মেরিটাইম মিউজিয়াম বা সামুদ্রিক জাদুঘরগুলির অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। চিরাচরিত ভাবে অনেক নৌ জাদুঘর (নেভাল মিউজিয়ামনৌবহরযুদ্ধ এবং বিজয়ের উপর বিশেষ ভাবে মনোযোগ দিয়ে এসেছে তবুও নতুন প্রজন্মের  সামুদ্রিক জাদুঘরগুলি একটি ভিন্ন আখ্যানই বলতে চায়: এমন এক আখ্যানযা মানুষবাণিজ্যঅভিবাসন  সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এই প্রতিষ্ঠানগুলি জ্ঞানের সহজলভ্যতাকে গণতান্ত্রিক করেঅমূল্য ঐতিহ্যকে রক্ষা করে এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে। তারা জলবায়ু পরিবর্তনঅতিরিক্ত মাছ ধরামাইক্রোপ্লাস্টিক  সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো জরুরি সমসাময়িক বিষয়গুলি সঙ্গেও জড়িত। এই চ্যালেঞ্জগুলিকে বাস্তব  বোধগম্য করে তোলার মাধ্যমে জাদুঘরগুলি সম্প্রদায়গুলিকে সমুদ্রের রক্ষক হিসেবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

পারস্য উপসাগরে জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রগুলিতে এখনও কাঠের ঢো নৌকা তৈরি করা হয়যা প্রায়শই ভারতীয় কারিগরদের দ্বারা নির্মিত হয় এবং যাঁরা বংশপরম্পরায় এই কৌশলগুলি বহন করে চলেছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রপুঞ্জের স্থিতিশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জাদুঘরগুলি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা এবং সকলের জন্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে (লক্ষ্য ) অবদান রাখে। তারা আজীবন শিক্ষা এবং মতপার্থক্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে শিক্ষাকে (লক্ষ্য ) শক্তিশালী করে। তারা দেশ সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বিত মঞ্চ তৈরি করে বৈষম্য হ্রাস করে (লক্ষ্য ১০) এমনকি জাদুঘরগুলি সম্প্রদায়গুলিকে একত্রিত করে (লক্ষ্য ১১) শহরগুলিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং স্থিতিস্থাপক করে তোলে। সর্বোপরিসামুদ্রিক জাদুঘরগুলি ১৪ নম্বর লক্ষ্য অর্থাৎ জলজ জীবন সম্পর্কে একটি অনন্য দায়িত্ব রয়েছে। তারা সমুদ্র সাক্ষরতার রক্ষকযাদের কাজ হল নাগরিকদের সমুদ্রের স্বাস্থ্য  জলবায়ু পরিবর্তনঅতিরিক্ত মাছ ধরা দূষণের বিপদ সম্পর্কে সচেতন করা।

এই জন-কেন্দ্রিক এবং ঐতিহ্য-নির্ভর পদ্ধতিটি নীতির জন্যও সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি নীল অর্থনীতি যদি শুধু মাত্র সম্পদ আহরণকারী হয় অথবা বর্জনমূলক হয় কিংবা টপ-ডাউন (শীর্ষ থেকে নিম্নমুখী) মনোভাবকে আঁকড়ে ধরেতা হলে তা ব্যর্থ হবে। কিন্তু সেই নীল অর্থনীতি যদি স্থানীয় নেতৃত্বে বিনিয়োগ করেউপকূলীয় সম্প্রদায়গুলির ক্ষমতায়ন করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেতা হলে তা স্থিতিস্থাপক এবং রূপান্তরকারী হয়ে উঠতে পারে। অংশীদারিত্বতা সে উপকূলীয় গ্রামগুলি মধ্যে হোকগ্লোবাল সাউথের অঞ্চলগুলি মধ্যে হোক বা সামুদ্রিক জাদুঘরগুলি শৃঙ্খলের মাধ্যমেই হোক না কেনতা সংহতি বিনিময়ের প্রসার ঘটাতে পারে। তারা ঐতিহ্যকে স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য একটি জীবন্ত সম্পদে পরিণত করতে পারে।

সামুদ্রিক ইতিহাস কেবল ক্ষমতা সংঘাত নিয়েই নয়বরং সহাবস্থানউদ্ভাবন এবং সম্মিলিত সহনশীলতা নিয়েও গড়ে ওঠে

সামুদ্রিক জাদুঘরগুলি স্মৃতি সংরক্ষণ  আখ্যান বিনির্মাণে তাদের সক্ষমতার মাধ্যমে এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যেসামুদ্রিক ইতিহাস কেবল ক্ষমতা সংঘাত নিয়েই নয়বরং সহাবস্থানউদ্ভাবন এবং সম্মিলিত সহনশীলতা নিয়েও গড়ে ওঠে

নীল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সমুদ্রের এই দীর্ঘতর গভীরতর ইতিহাসের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের উপর। স্থানীয় জ্ঞানকে মূল্য দিয়েসম্প্রদায়গুলিতে বিনিয়োগ করে এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সামুদ্রিক ভবিষ্যৎ গঠন করতে পারিযা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল এবং ন্যায়সঙ্গত। এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলেসামুদ্রিক ঐতিহ্য অতীতের কোন ধ্বংসাবশেষ নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি দিকনির্দেশক।

 


পিয়েরাঞ্জেলো কাম্পোদোনিকো ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ইতালিয়ান ইমিগ্রেশনের ডিরেক্টর

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.