এটি 'সাগরমন্থন এডিট ২০২৫ প্রবন্ধ সিরিজের অংশ।
সারা বিশ্বের উপকূলীয় জনসম্প্রদায়গুলির জন্য সমুদ্র শুধু আয় ও খাদ্য নিরাপত্তার উৎসই নয়—এটি তাদের সংস্কৃতি, পরিচয় এবং জীবনযাত্রার ভিত্তি। ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল দ্বীপরাষ্ট্রগুলির (এসআইডিএস), বা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে বৃহৎ মহাসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির (বিওএস), জন্য এই নির্ভরতা আরও বহুগুণে বেশি। সমুদ্র তাদের জীবনের প্রতিটি দিককে স্পর্শ করে। এটি তাদের অর্থনীতিকে রূপ দেয়, খাদ্যের প্রধান উৎস সরবরাহ করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা সাংস্কৃতিক অনুশীলনের কেন্দ্রে থাকে। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে সমুদ্রই তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ।
মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতির কথাই ধরা যাক, যা তার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) মাধ্যমে প্রায় ৩৫ লক্ষ বর্গ মাইল সমুদ্র এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। প্রায় ১,৩০,০০০ জনসংখ্যার এই ক্ষুদ্র দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতের চেয়েও বেশি সমুদ্র এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিশাল সমুদ্র এলাকাগুলি নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে তুলে ধরে, বিশেষ করে মৎস্যচাষ, জাহাজ চলাচল এবং পর্যটনের মতো শিল্পের মাধ্যমে। একই সঙ্গে এরা বৃহৎ মহাসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি এই বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করার পাশাপাশি জনসম্প্রদায়ের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গিয়ে যে সব অনন্য দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় তাও তুলে ধরে।
সুস্থ বাস্তুতন্ত্র, সুস্থ অর্থনীতি
নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা নির্ভর করে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের উপর, যার মধ্যে প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ এবং গভীর সমুদ্রের মৎস্যক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত। এই প্রাকৃতিক ভিত্তিগুলো ছাড়া মৎস্যচাষ, পর্যটন, জলজ চাষ এবং জাহাজ চলাচল ক্ষেত্রে স্থিতিশীল বৃদ্ধি অসম্ভব। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলির জন্য, যেগুলি মূলত একটি বৃহৎ উপকূলীয় জনসম্প্রদায়, জাতীয় পর্যায়ে সমুদ্রের নৈকট্য এবং এর উপর ব্যাপক নির্ভরতা একটি সুস্থ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা নির্ভর করে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের উপর, যার মধ্যে প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ এবং গভীর সমুদ্রের মৎস্যক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত।
উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন অভ্যাসগুলি, তা প্রবাল প্রাচীর পুনরুদ্ধারের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি হোক, মাছের মজুত হ্রাস রোধে মাছ ধরার স্থান পরিবর্তন করা হোক, বা প্রাকৃতিক ঝড় প্রতিরোধক হিসেবে ম্যানগ্রোভ রক্ষা করা হোক, সবই টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রমাণিত ব্যবস্থা। এই অভ্যাসগুলি শুধুই ‘প্রথা’ নয়; এগুলি সম্পদ ব্যবস্থাপনার পরিশীলিত মডেল যা জাতীয় ও আঞ্চলিক নীল অর্থনীতির কৌশলগুলিকে অবহিত ও শক্তিশালী করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রদায়-নেতৃত্বাধীন মৎস্যচাষ পদ্ধতি যা আহরণের চেয়ে পুনরুজ্জীবনকে অগ্রাধিকার দেয়, তা বৃহত্তর পরিসরের টেকসই মৎস্যচাষের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। একইভাবে, জনসম্প্রদায়-ভিত্তিক প্রবাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পগুলি প্রায়শই সফল হয় যেখানে বাহ্যিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হয়, কারণ এগুলি স্থানীয় জ্ঞান ও মালিকানার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তাই, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সামুদ্রিক শাসনে জনসম্প্রদায়ের নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং অন্তর্ভুক্ত করার থেকে অবিচ্ছেদ্য।
বিশেষ ব্যবস্থাপনা এলাকা: টোঙ্গা মডেল
টোঙ্গা ২০০২ সালের মৎস্য ব্যবস্থাপনা আইনের অধীনে প্রবর্তিত বিশেষ ব্যবস্থাপনা এলাকা (এসএমএ) বা, যা সাধারণত সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা (এমপিএ) নামে পরিচিত, তার মাধ্যমে মৎস্য শাসনে জনসম্প্রদায়ের নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই কাঠামোটি স্বীকার করে যে, শুধুমাত্র সরকার একা বিশাল সামুদ্রিক সম্পদ টেকসইভাবে পরিচালনা করতে পারে না এবং জনসম্প্রদায়কে অবশ্যই ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে থাকতে হবে। এসএমএ কর্মসূচির অধীনে, উপকূলীয় সম্প্রদায়গুলি একটি এসএমএ হিসেবে মনোনীত হওয়ার জন্য আবেদন করে এবং ব্যবস্থাপনার কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। প্রতিটি এসএমএ-কে জনসম্প্রদায়গুলি সরকারের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা করে, যা বিভিন্ন উপকূলের ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তৈরি করা হয়। এর পরিপূরক হিসেবে, মাছের আবাসস্থল সংরক্ষণাগার (এফএইচআর) কঠোরভাবে মাছ ধরা নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে মনোনীত করা হয়, যা সামুদ্রিক জীবকে পুনরুজ্জীবিত হতে এবং আশেপাশের মৎস্য সম্পদকে পুনঃপূরণ করতে সাহায্য করে।
প্রতিটি এসএমএ-কে জনসম্প্রদায়গুলি সরকারের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা করে, যা বিভিন্ন উপকূলের ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তৈরি করা হয়।
স্থানীয় জেলেদের জন্য টেকসই ব্যবস্থাপনা কোনও বিমূর্ত নীতি নয়, বরং এটি তাদের জীবিকা, তাদের সন্তানদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং তাদের জনসম্প্রদায়ের স্থিতিস্থাপকতার একটি রক্ষাকবচ। পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি বাহ্যিক বলপ্রয়োগের চেয়ে স্থানীয় মালিকানা এবং উত্তরদায়িতা দ্বারাই বেশি চালিত হয়। গত দুই দশকে, এসএমএ কর্মসূচিটি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে, এবং মূল্যায়নগুলিতে শক্তিশালী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যকর মাছের মজুত এবং উন্নত খাদ্য নিরাপত্তা দেখা গিয়েছে। সরকারি সহায়তার সাথে সম্প্রদায়ের নেতৃত্বকে একত্রিত করার মাধ্যমে টোঙ্গা প্রমাণ করেছে যে, শুধুমাত্র উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অংশীদারিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং সাশ্রয়ী ফলাফল প্রদান করে।
নীতি ও অনুশীলনের জন্য শিক্ষা
টোঙ্গার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে জনসম্প্রদায়ের অংশীদারিত্ব ছাড়া টেকসই নীল অর্থনীতির বৃদ্ধি সম্ভব নয়। জনসম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা ছাড়া কর্মসূচির বৈধতা ও কার্যকারিতা বিপন্ন হবে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল আইনি কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা, যাতে এসএমএ কর্মসূচিগুলি বিকশিত হতে পারে। এভাবে কর্মসূচিটিকে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারিত করা যেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারদের জনসম্প্রদায়ের সক্ষমতা জোরদার করার জন্য সম্পদ বিনিয়োগের সুযোগ দেবে।
উপকূলীয় জনসম্প্রদায়গুলিতে নীল অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠা করা
বিওএস-এর জন্য, স্থিতিস্থাপক সামুদ্রিক ভবিষ্যতের পথটি সরাসরি উপকূলীয় এলাকাগুলির মধ্য দিয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র বন্দর, জাহাজ চলাচল বা বৈদেশিক বিনিয়োগের উপর মনোযোগ দিয়ে টেকসই নীল অর্থনীতি অর্জন করা সম্ভব নয়। এই উপাদানগুলি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলি ততটুকুই শক্তিশালী, যতটা শক্তিশালী সেই জনসম্প্রদায়গুলি যারা সেগুলোকে ধারণ করে।
তাই নীতিগুলিকে অবশ্যই স্থানীয় কণ্ঠস্বরকে স্বীকৃতি দেওয়ার বাইরে গিয়ে জনসম্প্রদায়গুলির নেতৃত্বকে শাসনের একটি কাঠামোগত স্তম্ভ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
উপকূলীয় জনসম্প্রদায়গুলিকে কেন্দ্রে রাখলে তা নিশ্চিত করে যে নীল অর্থনীতি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই থাকবে। তাই নীতিগুলিকে অবশ্যই স্থানীয় কণ্ঠস্বরকে স্বীকৃতি দেওয়ার বাইরে গিয়ে জনসম্প্রদায়গুলির নেতৃত্বকে শাসনের একটি কাঠামোগত স্তম্ভ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
টোঙ্গার অভিজ্ঞতা যেমন দেখায়, সামুদ্রিক সম্পদ সংক্রান্ত কর্মসূচিগুলিতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য স্থানীয় জনসম্প্রদায়গুলিকে শক্তিশালী করা হলে তা পরিবেশগত ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা উভয়কেই জোরদার করে। এটি স্থিতিস্থাপকতার এমন একটি মডেল তৈরি করে যা শুধু তাৎক্ষণিক উন্নয়নের চাহিদাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মতো দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলিরও মোকাবিলা করে।
মহাসাগর প্রজন্ম ধরে উপকূলীয় জনসম্প্রদায়গুলিকে টিকিয়ে রেখেছে। এর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে, এই জনসম্প্রদায়গুলিকে আরও ক্ষমতায়িত করতে হবে, এবং এই স্বীকৃতি দিতে হবে যে বিশ্বজুড়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক, পুনরুজ্জীবনমূলক এবং স্থিতিস্থাপক নীল অর্থনীতি গঠনে তাদের নেতৃত্ব ও জ্ঞান অপরিহার্য।
ফেন ফাকাফানুয়া টোঙ্গার রয়্যাল ওশেনিয়া ইনস্টিটিউটের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Fane Fakafanua is the Chief Operating Officer at the Royal Oceania Institute, based in the Kingdom of Tonga in the South Pacific. She is also ...
Read More +