চিন যখন স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করছে, তখন ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থান কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে আস্থার ঘাটতি আরও গভীর করছে।
১২ জুন রাতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও পারমাণবিক কেন্দ্রগুলিতে ইজরায়েলি যুদ্ধবিমান হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও কেঁপে ওঠে। ইজরায়েল ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও হত্যা করতে সক্ষম হয়। তবে এই হামলার পর ইরান চুপ করে বসে থাকেনি। কারণ পরের দিন থেকে ইরান তেল আভিভ এবং হাইফার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলিকেও লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। এই মুহূর্তে উভয় পক্ষই প্রতিশোধমূলক চক্রে আটকা পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েল-ইরান সংঘাত থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করলেও তেল আভিভের তরফে অভিযানের প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ সমর্থন বিশ্বের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ওয়াশিংটনের ভাবমূর্তি ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে।
প্রকৃত ইজরায়েল-হামাস সংঘাতের চেয়েও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলি আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে ওয়াশিংটনের দ্বিমুখী নীতি নিয়ে উদ্বেগ, এমনকি হতাশাও প্রকাশ করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশই মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখে না, বরং ফিলিস্তিনে ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে ইতিমধ্যেই যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যে কোনও অস্থিতিশীলতাকে তারই সম্প্রসারণ বলে মনে করে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েলি নাগরিকদের উপর সন্ত্রাসবাদী হামলা তেল আভিভকে এই ভয়াবহ হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার প্রদান করেছিল। কিন্তু পরবর্তী মাসগুলিতে যা ঘটেছিল, তার ফলে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি ঘটে। ইজরায়েলের প্রতিক্রিয়ার অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকৃতি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনেই-সহ অনেক মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশের তরফে তীব্র নিন্দার জন্ম দিয়েছে। তা ছাড়া, সিঙ্গাপুর প্রাথমিক ভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও ইজরায়েলের কার্যকলাপের আরও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে সিঙ্গাপুরের মিনিস্টার অফ ফরেন অ্যাফেয়ার্স ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণন উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘ইজরায়েলি সামরিক প্রতিক্রিয়া এখন অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।’ মে মাসে প্রাইম মিনিস্টার লরেন্স ওং জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ড ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
তবে প্রকৃত ইজরায়েল-হামাস সংঘাতের চেয়েও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলি আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে ওয়াশিংটনের দ্বিমুখী নীতি নিয়ে উদ্বেগ, এমনকি হতাশাও প্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারকরা যখন ইজরায়েলি প্রাইম মিনিস্টার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর তৎকালীন ডিফেন্স মিনিস্টার ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন, তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছিলেন। অতএব, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির জন্য আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখা আঞ্চলিক শান্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, বিশেষ করে যখন দক্ষিণ চিন সাগরে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তীব্রতর মার্কিন-চিন শক্তি প্রতিযোগিতার কারণে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার ভিত্তিগুলি চাপের মধ্যে পড়ছে। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের স্টেট অফ সাউথ-ইস্ট এশিয়ার সমীক্ষায়, ইজরায়েল-হামাস সংঘাত এই অঞ্চলের প্রধান ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব রীতিমতো খর্ব হয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে উঠে চিন এই অঞ্চলের জন্য পছন্দের জোটবদ্ধ অংশীদার বা বিকল্প হয়েছে।
বর্তমানে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের কারণে অবিশ্বাসের বীজ আরও ভিতরে প্রবেশ করেছে। ট্রাম্প কেবল আইসিসি-র সদস্যদের উপর নিষেধাজ্ঞাই জারি করেননি, বরং গাজা উপত্যকা দখলের প্রস্তাবও দিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ড আক্রমণ ও কানাডাকে ৫১তম মার্কিন রাষ্ট্র করার বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য ও নানা রকমের বিবৃতি ওয়াশিংটনের স্পষ্ট সম্প্রসারণবাদী লক্ষ্য ও আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
তেহরানের নেতৃত্বকে নির্মূল করার জন্য তেল আভিভের স্পষ্ট অভিপ্রায়ের দিকে নজর রাখলে বোঝা যাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী ভাবে শাসন পরিবর্তনের বিষয়টিকে সমর্থন জোগাচ্ছে। এটি বিশেষ ভাবে বিতর্কিতও বটে। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলি শাসনে টিকে থাকা এবং নিরাপত্তার উপর উল্লেখযোগ্য দখল বজায় রেখেছে।
এই প্রসঙ্গে ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে বর্তমান সঙ্কট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ওয়াশিংটনের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ণ করতে পারে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ইতিমধ্যেই ইরানের উপর আক্রমণাত্মক হামলার জন্য ইজরায়েলের নিন্দা জানিয়েছে। তা ছাড়া, তেহরানের নেতৃত্বকে নির্মূল করার জন্য তেল আভিভের স্পষ্ট অভিপ্রায়ের দিকে নজর রাখলে বোঝা যাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী ভাবে শাসন পরিবর্তনের বিষয়টিকে সমর্থন জোগাচ্ছে। এটি বিশেষ ভাবে বিতর্কিতও বটে। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলি শাসনে টিকে থাকা এবং নিরাপত্তার উপর উল্লেখযোগ্য দখল বজায় রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলিকে উপেক্ষা করছে বলে মনে হচ্ছে। চিন নৈতিক ভাবে সঠিক অবস্থান বজায় রেখে আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূমির অধিকারের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের সুযোগও নিচ্ছে।
এ ছাড়া, কার্যকরী প্রেক্ষিত থেকে দেখলে ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্সের মতো দেশগুলির জন্য - যারা চিনের সঙ্গে সামুদ্রিক বিরোধে গভীর ভাবে জড়িয়ে আছে - পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের জন্য মূলত নির্ধারিত মার্কিন নৌ সম্পদগুলি ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এটি শক্তি ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক অঞ্চলে চিনের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য আরও সুযোগ তৈরি করতে পারে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক নীতিগুলিতে এমন কোনও উন্নতি সাধন করা হয়নি, যাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য আলোকে দেখে।
কার্যকরী প্রেক্ষিত থেকে দেখলে ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্সের মতো দেশগুলির জন্য - যারা চিনের সঙ্গে সামুদ্রিক বিরোধে গভীর ভাবে জড়িয়ে আছে - পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের জন্য মূলত নির্ধারিত মার্কিন নৌ সম্পদগুলি ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও তুলনামূলক ভাবে বস্তুগত সুবিধা বজায় রেখে চললেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার ক্রমহ্রাসমান ভাবমূর্তি অবশেষে তার কূটনৈতিক বিকল্পগুলিকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে, যার ফলে এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পররাষ্ট্র নীতিতে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে কার্যকর করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যেতে পারে। অতএব, ওয়াশিংটন যদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তার অবস্থান উন্নত করতে চায়, তা হলে আমেরিকাকে আঞ্চলিক দেশগুলির উদ্বেগ সম্পর্কে আরও সূক্ষ্ম ধারণা তৈরি করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে, বিশ্ব ক্রমশ আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ বিশ্বের এক অংশে আমেরিকা কী পদক্ষেপ করছে, তা অবশ্যই বিশ্বের অন্য দেশগুলির তরফে আমেরিকার প্রতি মনোভাবের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। সুতরাং, নীতি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগে অসঙ্গতি অনিবার্য ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করবে। চিন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে বলে এই পরিস্থিতি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ডন ম্যাকলেন গিল ফিলিপিন্সভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক এবং দে লা সালে ইউনিভার্সিটির (ডিএলএসইউ) ডিপার্টমেন্ট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Don McLain Gill is a Philippines-based geopolitical analyst author and lecturer at the Department of International Studies De La Salle University (DLSU). ...
Read More +