Author : Kabir Taneja

Published on Feb 02, 2026 Updated 4 Days ago

জনগণের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং উত্তরাধিকারের রাজনীতি একত্রিত হওয়ায় ইরানের বিপ্লবী ব্যবস্থা ১৯৭৯ সালের পর থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে।

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরানের দ্বন্দ্ব

২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত ছিলযার রেশ এখনও এই অঞ্চলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অংশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলি কেবল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিভাজনকেই নয়বরং অর্থনৈতিক সঙ্কটের পরিণতিকেও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

আশকান হাশেমিপুরের মতো অনেক বিশ্লেষক বলছেনচলমান অসন্তোষের কারণ আসলে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের মূলেই নিহিতযার ফলে তৎকালীন নির্বাসিত আয়াতোল্লাহ খোমেইনি ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং পশ্চিম-সমর্থিত শাহ রেজা পহলভির রাজতন্ত্রকে উৎখাত করা হয়। বর্তমান ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনেই - যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন - সেই বিপ্লব-নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞার পরিচয়  স্থায়িত্ব… উভয় ক্ষেত্রেই একটি সন্ধিক্ষণের সম্মুখীন হয়েছেন। চলতে থাকা বিক্ষোভগুলিকে এখন সফল ভাবে দমন করা যদিও বা সম্ভব হয়, তা হলেও তেহরানের পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে সব কিছু চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব না- হতে পারে।

অপরিহার্য অবকাঠামো — অর্থাৎ বিদ্যুৎ, জল, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা — সরবরাহ করা ক্ষমতা ও জনগণের সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ইরান যখন মাসের পর মাস ধরে টালমাটাল অবস্থায় ছিল, তখন পতনের ধাক্কাটি এসেছিল মূলত দু’টি দিক থেকে: একটি হল জল সঙ্কট এবং অন্যটি হল মুদ্রার পতন।

নিষেধাজ্ঞার কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রেখে জনগণের অভিযোগ সামলানো এবং তার দরুন হওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রেক্ষাপটে  নিঃসন্দেহে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার বিষয়। নভেম্বর মাসে ইরানের রাজধানী তেহরানে জলের সঙ্কটের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিকল্পনা মূলত আত্মনির্ভরশীলতার উপর ভিত্তি করে তৈরিযা বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকারই একটি পরিণতি। তবে ইরান ৯০ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যাবিশিষ্ট একটি দেশযা স্থিতিশীল উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীলতার রাজনীতিকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। দিনের শেষে রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলি মৌলিক কাঠামোর দিক থেকে একে অপরের চেয়ে খুব বেশি আলাদা নয়যেমন জনগণ রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলা। অপরিহার্য অবকাঠামো  অর্থাৎ বিদ্যুৎ, জলকর্মসংস্থানস্বাস্থ্যসেবা  শিক্ষা সরবরাহ করা ক্ষমতা জনগণের মধ্যকার সম্পর্কের জন্য অপরিহার্য। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যেইরান যখন মাসের পর মাস ধরে টালমাটাল অবস্থায় ছিলতখন পতনের ধাক্কাটি এসেছিল মূলত দুটি দিক থেকে: একটি হল জল সঙ্কট এবং অন্যটি হল মুদ্রার পতন

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সর্বদা এমন কাঠামোর সংমিশ্রণযা প্রায়শই বিপ্লবের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পরিসরগুলিকে প্রভাবিত করে এর অর্থ হল, আয়াতোল্লাহ- সম্পূর্ণ ক্ষমতা এবং তিনি  তাঁর পূর্বসূরি খোমেইনি ১৯৭৯ সাল থেকে যে ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন, এটি তারই ফল। পরিস্থিতি তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠেযখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেই উভয় সঙ্কটে জড়িয়ে পড়েন পেজেশকিয়ান ২০২৪ সালের নির্বাচনে একমাত্র মধ্যপন্থী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন ওই বছরই একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির অকালমৃত্যুর পর তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন বিক্ষোভের সময় পেজেশকিয়ান আবার সরকারের এই বক্তব্যের পক্ষ নেন যেদেশের অভ্যন্তরে চলতে থাকা অস্থিরতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের বাহ্যিক হস্তক্ষেপের দরুন উস্কানি পেয়েছে তিনি এই ইঙ্গিতও দেন যেরাষ্ট্রকে অবশ্যই স্বীকার করে নিতে হবে যেভুল হয়েছে। এই সব কিছুই প্রজাতন্ত্রের নির্বাচনী কাঠামোর সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেবিশেষ করে এই কারণে যেইরান প্রায়শই নিজেকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলটির একমাত্র ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে এবং তারাই নিয়মিত নির্বাচন পরিচালনা করে।

পেজেশকিয়ানের জন্য এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপতির পদের জন্যও ভারসাম্যটি সর্বদা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কোনও ইরানি প্রেসিডেন্ট যে সংস্কারই বা পরিবর্তনই আনতে চান না কেন, তা আসলে রাজপথে ঘটে চলা বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে স্থিতিশীলতার উপর নির্ভর করে। পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের বহুস্তরীয় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে একত্রিত করাও সহজ কাজ নয়।

পেজেশকিয়ানের জন্য এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপতির পদের জন্যও ভারসাম্যটি সর্বদা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। কোনও ইরানি প্রেসিডেন্ট যে সংস্কার বা পরিবর্তনই আনতে চান না কেনতা আসলে রাজপথে ঘটে চলা বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে স্থিতিশীলতার উপর নির্ভর করে। পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের বহুস্তরীয় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিকে একত্রিত করাও সহজ কাজ নয়। পেশায় চিকিৎসক পেজেশকিয়ানই ছিলেন একমাত্র মধ্যপন্থী, যাঁকে আয়াতোল্লাহ নির্বাচনের জন্য অনুমোদন করেছিলেন।  কথাও ব্যাপক ভাবে বিশ্বাস করা হত যেমধ্যপন্থীদের এই নামমাত্র প্রতিনিধিত্ব - যে দলটি আবার নিজেই অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত - বড়জোর একটি প্রতীকী পদক্ষেপে পরিণত হতে পারে কারণ প্রাক্তন পারমাণবিক মধ্যস্থতাকারী (বা নিউক্লিয়ার নেগোশিয়েটরসঈদ জালিলিকে — যিনি রক্ষণশীলদের নিতান্তই পছন্দের ব্যক্তি রাইসির উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

বর্তমানে তথাকথিত মধ্যপন্থা নিজেই একটি মারাত্মক ক্ষতবিক্ষত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পেজেশকিয়ানের জন্য নিজের কার্যালয়ের  হেন অদ্ভুত  অস্বচ্ছ ক্ষমতার অভিজ্ঞতা এই প্রথম নয় গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের তরফে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলিতে বোমা হামলার পর এবং ইজরায়েল কর্তৃক ইরানের অনেক শীর্ষ সামরিক গোয়েন্দা নেতাকে নির্মূল করার ঘটনার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটির উপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় কাতার - যার তেহরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে এবং যে দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মধ্যে একটি যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে - এই আঞ্চলিক সংঘাতের ডামাডোলে আটকা পড়া আরব উপসাগরীয় শক্তিগুলির অন্যতম উদাহরণ হয়ে উঠেছিল ঘাঁটিতে এই হামলাটি এমন সীমা অতিক্রম করেছিলযা নিয়ে আরব রাজধানীগুলি দীর্ঘদিন ধরে ভীত ছিল। পেজেশকিয়ান তখন নিজে এমন একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েনযখন তাঁকে কাতারের আমিরের কাছে তেহরানের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এই বার্তা দিতে হয়েছিল যেহামলাটি তাঁর নিজের দেশের সামরিক বাহিনীই চালিয়েছে।

পেজেশকিয়ান তখন নিজে এমন একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েন, যখন তাঁকে কাতারের আমিরের কাছে তেহরানের মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ‘দুঃখ’ প্রকাশ করে এই বার্তা দিতে হয়েছিল, যে হামলাটি তাঁর নিজের দেশের সামরিক বাহিনীই চালিয়েছে।

ভবিষ্যতে ইরানি কর্তৃপক্ষের জন্য পরিস্থিতি সহজ না- হতে পারে। বর্তমান অস্থিরতার চক্র শুরু হওয়ার অনেক আগেই ইরান ৮৬ বছর বয়সি আয়াতোল্লাহ খামেনেই-এর উত্তরাধিকার নিয়ে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যদিও ইরানি শাসনব্যবস্থার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিবর্গ এই আলোচনার বেশিরভাগ গোপনেই রেখেছিলেনতবুও দুটি নাম জনসমক্ষে উঠে এসেছিল। প্রথমতপ্রয়াত ইব্রাহিম রাইসি এবং দ্বিতীয়ত আয়াতোল্লাহ খামেনেইয়ের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র মোজতবা খামেনেই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি বিপ্লবের সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে কারণ এমনটা হলে ক্ষমতা হস্তান্তরকে একটি বংশানুক্রমিকরাজতান্ত্রিক হস্তান্তর হিসেবেই মনে করা হবেযা বিপ্লবী আদর্শ কোনও ভাবেই মেনে নিতে চাইবে নাবিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন আয়াতোল্লাহ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত ইরানের প্রাক্তন শাহের পুত্র রেজা পহলভির আহ্বানে রাজতন্ত্রপন্থীরা রাস্তায় নেমেছিলেন।

এই হিসেব-নিকেশের মধ্যে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) স্বার্থের কথাও ভাবতে হবে। আইআরজিসি - যা একচেটিয়া ভাবে আয়াতোল্লাহ- অধীনে পরিচালিত হয় - নিজের সৃষ্টিকর্তা   লালনপালনকারী ব্যবস্থার প্রতি স্থিতিস্থাপক  অনুগত বলে প্রমাণিত হয়েছে। গত কয়েক বছরে আইআরজিসি নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর প্রক্রিয়া তৈরিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেযা সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম করেছে। ইরানের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে গভীর স্বার্থ নিয়ে এই সামরিক ব্যবস্থাটি নিজের ভূমিকা বজায় রেখেছে এবং নিশ্চিত করেছে যেআইআরজিসি- কারণে যেন কোনও পতন না ঘটে।

আইআরজিসি - যা একচেটিয়া ভাবে আয়াতোল্লাহ-র অধীনে পরিচালিত হয় - নিজের সৃষ্টিকারী ও লালনপালনকারী ব্যবস্থার প্রতি স্থিতিস্থাপক ও অনুগত বলে প্রমাণিত হয়েছে। গত কয়েক বছরে আইআরজিসি নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর প্রক্রিয়া তৈরিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যা সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম করেছে।

পরিশেষে বলা যায়ইরানের পতনের ফলে আবেগতাড়িত যে কোনও পদক্ষেপ আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা দুইয়ের জন্যই গভীর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, বিশেষ করে এমন এক সময়েযখন বৈশ্বিক ব্যবস্থা নিজেই দিশাভ্রষ্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে ব্যবস্থা কয়েকটি পশ্চিমি নেতৃত্বাধীন বহুপাক্ষিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ছিলতা দ্রুত গতিতে ভেঙে পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও হামলার সম্ভাবনাকে এখনও উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও ইরান কী ভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ জটিলতাগুলি সামাল দেয়তা এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথের উপর অনেকটাই প্রভাব ফেলবে, অন্তত পক্ষে এখনও পর্যন্ত যেমনটা মনে হচ্ছে, তার চেয়েও অনেকটাই বেশি প্রভাব ফেলবে।

 


এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন মিডল ইস্ট (ওআরএফ এমই)-তে

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.