খলিল হাক্কানির হত্যাকাণ্ড অভ্যন্তরীণ তালিবান বিভাজন এবং আইএসকেপি হুমকির ক্রমবর্ধমান গভীরতাকেই দর্শায়, যা গোষ্ঠীটির স্থিতিশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্দেহ উস্কে দিয়েছে।
২০২১ সালের ১১ ডিসেম্বর কাবুলে ইসলামিক আমিরাত অফ আফগানিস্তানের (আইইএ) মিনিস্টার অফ রিফিউজি অ্যান্ড রিপাট্রিয়েশন খলিল উর-রেহমান হাক্কানিকে হত্যা করা হয়। ২০২১ সালের অগস্ট মাসে তালিবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর এটিই ছিল প্রথম কোনও উচ্চ মর্যাদার তালিবানি কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড। হাক্কানি নেটওয়ার্কের এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব দুপুরের নামাজ সেরে কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় মন্ত্রকের প্রাঙ্গণেই এক আত্মঘাতী হামলায় মারা যান। ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশ-এর (আইএসকেপি) তার টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে এই হামলায় দায় স্বীকার করা আসলে বরিষ্ঠ তালিবানি আধিকারিকদের আক্রমণ করার আইএসকেপি-র ক্ষমতাকেই দর্শায়। এই হত্যাকাণ্ড কেবল আইএসকেপি-র তরফে উত্থাপিত ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকিকেই তুলে ধরে না, বরং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য তালিবানের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
আমিরের নীতির বিরুদ্ধে তালিবানি মন্ত্রীদের বারবার বিরোধিতা প্রকাশ পেয়েছে, যা অন্যান্য গোষ্ঠীর জন্য এই বিভাজনগুলিকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
তালিবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে আমির মোল্লা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা গোষ্ঠীটির উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ এবং সরকারের মধ্যে ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য ফরমান জারি করে আসছেন। আমিরের নীতির বিরুদ্ধে তালিবানি মন্ত্রীদের বারবার বিরোধিতা প্রকাশ পেয়েছে, যা অন্যান্য গোষ্ঠীর জন্য এই বিভাজনগুলিকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তালিবান আনুষ্ঠানিকভাবে হাক্কানির মৃত্যুকে ‘শহিদ হওয়ার’ সামিল বলে তুলনা করে শোক প্রকাশ করেছে এবং হাইবাতুল্লাহ শোকপ্রার্থনায় অংশ নেননি বলে জানা গিয়েছে। কান্দাহার-ভিত্তিক নেতৃত্ব এবং কাবুল-ভিত্তিক হাক্কানি গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বোঝার জন্য এই হত্যাকাণ্ডের মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাক্কানি নেটওয়ার্ক
সোভিয়েত-বিরোধী জিহাদের সময় জালালুদ্দিন হাক্কানি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হাক্কানি নেটওয়ার্ক তালিবানের সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। জালালুদ্দিন হাক্কানির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে সিরাজউদ্দিন হাক্কানি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২১ সালে ইসলামিক আমিরাতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। মূলত জাদরান উপজাতির সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই শৃঙ্খলটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহী কৌশলের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যার মধ্যে আফগানিস্তানে জিহাদের সময় আত্মঘাতী বোমা হামলাকে মূল অভিযানমূলক কৌশল হিসেবে প্রবর্তন করাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি) হাক্কানি নেটওয়ার্ককে একটি অনুমোদিত সত্তা হিসেবে মনোনীত করে, যা এর বিশ্বব্যাপী কুখ্যাতিকেই দর্শায়।
তালিবান এবং হাক্কানিদের মধ্যে সম্পর্ক মূলত লেনদেনের। তালিবানদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে, অন্য দিকে হাক্কানিরা সর্বদা মন্ত্রিসভায় নামমাত্র মর্যাদা ধরে রেখেছে ও তাদের নিজ নিজ উদ্দেশ্য অনুসারে স্বাধীন ভাবে কাজ করেছে। হাক্কানিদের নিজস্ব আর্থিক উৎসও রয়েছে, যা তালিবানের উপর নির্ভরশীল নয়। টিকে থাকা ও সম্প্রসারণের জন্য সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কারণে এই শৃঙ্খলটিকে তালিবানের শ্রেণিবিন্যাসের একটি ‘স্বায়ত্তশাসিত অথচ অবিচ্ছেদ্য’ অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
কাতার, তুর্কি, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলিও হাক্কানির হত্যার নিন্দা জানিয়েছে। তালিবানের দীর্ঘদিনের বিরোধিতার জন্য পরিচিত প্রাক্তন আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং খলিল হাক্কানিকে ‘একটি বিশিষ্ট জিহাদি পরিবারের সদস্য’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এর পাশাপাশি হাক্কানির নিজের শহরে সফরের সময় তিনি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং সেই সময় তিনি দলের বরিষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে কথাও বলেছেন।
হাক্কানি নেটওয়ার্ক ক্রমাগত ভিন্নমত প্রকাশ করেছে, সিরাজউদ্দিন হাক্কানি আরও বেশি করে আমিরের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন এবং তাঁর নীতি ও শাসনব্যবস্থার প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন।
হাক্কানির মৃত্যুর পর এআরজি প্রাসাদ শোক প্রার্থনার আয়োজন করে, যা তালিবানের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের উপস্থিতিতে পরিচালিত হয়। সিরাজউদ্দিন হাক্কানি শোক প্রার্থনার আয়োজন করেন এবং সেখানে প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার অংশগ্রহণকারী এসেছিলেন। এই কৌশলগত পদক্ষেপটি বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সিরাজউদ্দিন হাক্কানির বিস্তৃত সংযোগ শৃঙ্খলকেই তুলে ধরে, যা তাঁর কূটনৈতিক নাগাল ও প্রভাবকেই দর্শায়।
আক্রমণকে সহজতর করার জন্য সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ বা অভ্যন্তরীণ সহায়তার খবরও প্রকাশ্যে এসেছে, যা সম্ভবত তালিবান-নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের মধ্যে আদর্শগত বিভাজন এবং ক্ষমতার লড়াই থেকে উদ্ভূত। হাক্কানি নেটওয়ার্ক ক্রমাগত ভিন্নমত প্রকাশ করেছে, সিরাজউদ্দিন হাক্কানি আরও বেশি করে আমিরের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন এবং তাঁর নীতি ও শাসনব্যবস্থার প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন। নারী শিক্ষা ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দুর্গগুলিতে কিছু আদেশ বলপূর্বক প্রয়োগের মতো প্রধান বিষয়গুলি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন সদস্যদের দ্বারা তীব্র সমালোচিত হয়েছে – যেগুলি ব্যক্তিগত সংস্কার দ্বারা কম এবং বাস্তববাদী রাজনীতি দ্বারা বেশি চালিত এবং যা পশ্চিমি সমর্থন আকর্ষণ করতে সাহায্য করতে পারে। অতি সম্প্রতি হাইবাতুল্লাহ তাঁর সরাসরি আদেশের অধীনে সামরিক সরঞ্জাম বিতরণ ও ব্যবহারের ঘোষণা করেছেন, যা তাঁর অধীনস্থদের মধ্যে অবিশ্বাসের গভীরতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই পদক্ষেপ তাঁর মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের মধ্যে বিরক্তির জন্ম দিয়েছে, যাঁর মধ্যে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি, পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী একে স্তানেকজাই এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা ইয়াকুব।
আইএসকেপি-র ক্রমবর্ধমান হুমকি
খলিল হাক্কানির মৃত্যুর এক দিন পর আইএসকেপি তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করে নেয়। এটি আফগানিস্তানে আইএসকেপি-র হামলার তালিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আইএসকেপি ধারাবাহিক ভাবে তালিবান সরকারের বৈধতা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করে আসছে। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি), আল-কায়েদা এবং তালিবানদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা থেকে উদ্ভূত আইএসকেপি কঠোর ইসলামি আইনশাস্ত্র দ্বারা পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক খেলাফত গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর বর্ণনায় তালিবানদের আপসহীন হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ইসলামি নীতি থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় আইএসকেপি-র ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রত্যক্ষ হুমকিও বটে। এই গোষ্ঠীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা আফগানিস্তানের বাইরেও বিস্তৃত এবং এর লক্ষ্য হল মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করার পাশাপাশি তালিবানদের অকার্যকর নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরে আইএসকেপি নিজস্ব কার্যকারিতার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। এর ফলে কিছু তালিবানি যোদ্ধা আইএসকেপি-তে যোগ দিতে বাধ্য হতে পারে। উপরন্তু, জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি তালিবানদের কঠোর আচরণ আইএসকেপি-র নিয়োগ প্রচেষ্টাকে সহায়তা জুগিয়েছে। আফগানিস্তানের ছিদ্রযুক্ত সীমান্ত ও তালিবানের সীমিত শাসন ক্ষমতা আইএসকেপি-কে আরও বেশি করে নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও আক্রমণ চালাতে সক্ষম করেছে, যার মারাত্মক আঞ্চলিক প্রভাব পড়েছে।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করার পাশাপাশি তালিবানদের অকার্যকর নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরে আইএসকেপি নিজস্ব কার্যকারিতার প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।
খলিল হাক্কানির হত্যাকাণ্ড কেবল আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্যদের জন্য ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতের প্রতি তালিবানদের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতার বিষয়টিও তুলে ধরে, যা আইএসকেপি-র মতো সংগঠনগুলি কাজে লাগাতে পারে। এই হত্যাকাণ্ড আইএসকেপি-র কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির উপর জোর দেয়, যা তালিবানদের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার উপর গোষ্ঠীটির দুর্বল দখল ও প্রশাসনিক অক্ষমতার আখ্যানকে শক্তিশালী করে। এটি সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ জটিলতাকেও দর্শায়, যা অত্যন্ত সুরক্ষিত সরকারি স্থাপনাগুলির মধ্যে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রমাণিত।
আক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলটি বর্ধিত ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে, যার ফলে আফগানিস্তান এবং তার বাইরে আরও অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা রোধে একটি শক্তিশালী প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন। এই প্রেক্ষিতে তালিবানরা কত দিন নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারে, তা দেখার বিষয়। কারণ তাদের নেতৃত্ব দেশের উন্নয়নমূলক নীতির ক্ষেত্রে বিভক্ত বলে মনে হয়। অধস্তনদের উপর হাইবাতুল্লাহর দৃঢ় দখল এবং গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর কর্তৃত্বপূর্ণ ভাবমূর্তি অদূর ভবিষ্যতে তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়।
শিবম শেখাওয়াত অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জুনিয়র ফেলো।
পুষ্প কুমারী অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের রিসার্চ ইন্টার্ন।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Shivam Shekhawat is a Junior Fellow with ORF’s Strategic Studies Programme. Her research focuses primarily on India’s neighbourhood- particularly tracking the security, political and economic ...
Read More +