ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ, চিনের উত্থান এবং ধারাবাহিক ভাবে বিশ্বব্যাপী সঙ্কটের মধ্যেই ভারত-ইইউ অংশীদারিত্ব ভঙ্গুর বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য একটি প্রতিশ্রুতিময় ও স্থিতিশীল পথনির্দেশিকা প্রদান করে।
বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের ধারা দৃশ্যত পরিবর্তিত হয়েছে এবং বিশ্ব ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প ২.০-এর বর্ধিত শুল্ক ও হ্রাসপ্রাপ্ত সাহায্য ২০২৫ সালের শুরুতে প্রকাশ্যে এসেছিল, যার ফলে ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতিতে এক বিরাট প্রভাব পড়েছে। নতুন ধারার উদ্ভব হচ্ছে, যেখানে উন্নত দেশগুলি - যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ (সিইই), অস্ট্রেলিয়া ও জাপান - স্থিতিশীলতা ও স্থায়িত্বের মেরুগুলির দিকে নজর রাখছে। ইউক্রেন সঙ্কট, গাজা ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান সংঘাত, আফ্রিকা ও এশিয়ার কিছু অংশে সন্ত্রাসবাদের আকস্মিক বৃদ্ধি - যার মধ্যে পহেলগাম সন্ত্রাসবাদী হামলার পর সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান বিবাদও রয়েছে - বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থাকে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে তুলেছে।
ভারত এবং ইইউ-ও এর হাত থেকে রেহাই পায়নি। উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থান করা ও ভিন্ন ভিন্ন বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নয়াদিল্লি এবং ব্রাসেলসের মধ্যে অভিন্ন সাধারণ কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী ও প্রসারিত করার একটি দৃশ্যমান ইচ্ছা রয়েছে। উরসুলা ফন দের লেইনের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কলেজ অফ কমিশনার্সের ভারত সফর কেবল ইইউ-র বাইরে নতুন কমিশনের প্রথম সফরই নয়, বরং ভারত-ইইউ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এটিই প্রথম সফর, যা তাদের নতুন মতাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য সূচনা। ২০০৪ সালে ভারত-ইইউ কৌশলগত অংশীদারিত্ব স্বাক্ষরের দুই দশকেরও বেশি সময় পরে, ইইউ ২০১৮ সালে তাদের ভারত কৌশল চালু করে। তা সত্ত্বেও কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় সর্বাধিক করার জন্য প্রচুর সুযোগ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
স্থিতিশীলতার কৌশল নির্ধারণ
বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার কর্মসূচির অগ্রগতি ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য ২০৩০-পরবর্তী একটি পথনির্দেশিকা তৈরি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যেখানে স্থিতিশীল অর্থায়ন, গুণমান ও দীর্ঘমেয়াদি সংযোগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য জোরদার করা ও অর্থনৈতিক বাধা হ্রাস করা এবং অভিযোজন ও প্রশমন উভয়ের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা সম্পর্কিত বিষয়গুলিও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ইইউ এবং ভারত উভয়ই স্থিতিশীল উন্নয়ন এবং বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেশ সরব।
ইইউ এবং ভারত উভয়ই স্থিতিশীল উন্নয়ন এবং বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বেশ সরব। উদাহরণস্বরূপ, জি২০ সভাপতিত্বের সময় ভারত লাইফস্টাইল-এর (পরিবেশের জন্য জীবনধারা) একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং গ্লোবাল নর্থের দেশগুলিকে উৎপাদন ও খরচের প্রতি সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছিল, যার ফলে একটি বৃত্তাকার অর্থনীতির লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্য দিকে, ইইউ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবায়ু নেতা হিসাবে বিবেচিত হয়ে এলেও এর ব্যবহারিক গ্রহণ ন্যূনতম ছিল। সেই দিক থেকে দেখলে, ভারত এবং ইইউ প্রযুক্তি স্থানান্তরে অর্থায়নের ব্যবধান পূরণ করে এবং জলবায়ু অর্থায়ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা প্রসারিত করে শক্তি পরিবর্তনের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি আরও সুসংহত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাসেলস ভারতের ইস্পাত খাতকে কার্বনমুক্ত করার জন্য যৌথ গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভারত সরকারের ‘গ্রিন স্টিল মিশন’কে সমর্থন করছে। ভারতের স্থিতিশীল লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইইউ-র দূষণহীন শক্তি ও জলবায়ু-স্থিতিস্থাপক প্রযুক্তিতে সবুজ উদ্ভাবনগুলিকেও কাজে লাগানো উচিত।
অংশীদারিত্বের জন্য চাপ দেওয়া
দু’টি মূল কারণের দরুন গ্লোবাল সাউথে ভারতের অবস্থান অনন্য - এটি একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি এবং একটি ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক উদ্যোগ।
২০২৫ সালে বান্দুং সম্মেলনের ৭০তম বার্ষিকী উপলক্ষে, এর মূল নীতিগুলি - মানবাধিকার, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার প্রচার, সংঘাত সমাধান এবং শান্তি - সমসাময়িক সময়ে উল্লেখযোগ্য প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখে। ২০২৩ সালে জি২০-র সভাপতিত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী ব্রিকস সদস্যপদ লাভের মাধ্যমে ভারত গ্লোবাল সাউথ থেকে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়নকে (এইউ) জি২০-র পূর্ণ সদস্য হিসেবে সমন্বিত করার জন্য নয়াদিল্লির প্রচেষ্টা এই উল্লেখযোগ্য উন্নয়নকে তুলে ধরে। দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা (এসএসসি) কোনও নতুন ঘটনা না হলেও ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং পশ্চিম ও গ্লোবাল সাউথের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভেদের মধ্যে এটি নতুন করে আগ্রহ অর্জন করেছে। দু’টি মূল কারণের দরুন গ্লোবাল সাউথে ভারতের অবস্থান অনন্য - এটি একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি এবং একটি ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক উদ্যোগ। প্রকৃতপক্ষে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নয়াদিল্লির প্রাধান্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, ট্রাম্পের বিচ্ছিন্নতাবাদ বিশ্ব ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা সত্ত্বেও ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইউক্রেন সঙ্কটে ভারতের অবস্থান শান্তি, আলোচনা ও কূটনীতির উপর নির্ভরশীল হলেও, এর দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবসম্মত ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারাও পরিচালিত। বহু-সাযুজ্যতার - অথবা যাকে বহু-অভিমুখী কূটনীতিও বলা যেতে পারে - সাধনা গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইইউ-র জন্য ভারতের সঙ্গে কাজ করার একটি লাভজনক সুযোগের প্রতিনিধিত্ব করে। নয়াদিল্লি ও ব্রাসেলস উভয়ই বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থায় অবদান রাখতে এবং শক্তিশালী, আরও স্থিতিস্থাপক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য তাদের সম্পৃক্ততাকে বৈচিত্র্যময় করতে আগ্রহী।
বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং ট্রাম্পের মোকাবিলা
জেনেভায় স্বাক্ষরিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি সাময়িক ভাবে উত্তেজনা কমাতে সক্ষম হলেও আন্তর্জাতিক বাজারগুলি এখনও সতর্ক। সর্বোপরি, ইউএসএআইডি-র বিলুপ্তি বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে কালো ছায়া ফেলেছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তির দূত হিসেবে কাজ করা এবং যুদ্ধবিরতি আলোচনার বিষয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য নয়াদিল্লি মোটেই ভাল ভাবে গ্রহণ করেনি।
একই সময়ে তীব্রতর বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে একটি পথ তৈরি করার চেষ্টা করার সময় ইইউ নিজেকে একটি অনিশ্চিত অবস্থানে খুঁজে পেয়েছে। ‘চিন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ’ ভারত এবং ইইউ উভয়ের জন্যই একটি যৌথ উদ্বেগ। হুমকিটি স্পষ্ট - ইইউ এখন খোলাখুলি ভাবেই চিনকে একটি পদ্ধতিগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। ‘ডিকাপলিং’ থেকে ‘ডিরিস্কিং’ করার অবস্থানের পরিবর্তন ব্রাসেলসের একটি মধ্যস্থতা বজায় রাখা এবং বেজিংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টাকেই তুলে ধরে।
ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: ইইউ কি চিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর করবে না কি গ্লোবাল সাউথের মধ্যে ভারতের মতো কোনও বিকল্প দেশ খুঁজবে?
ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: ইইউ কি চিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর করবে না কি গ্লোবাল সাউথের মধ্যে ভারতের মতো কোনও বিকল্প দেশ খুঁজবে? চিনের পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জগুলি বিবেচনা করে নয়াদিল্লির সঙ্গে মিলে কাজ করা ব্রাসেলসের জন্য আরও বাস্তবসম্মত বিকল্প বলে মনে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, বেজিং উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত বৃদ্ধি ঘটিয়ে ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক প্রতিহত করার জন্য ইউরোপীয় বাজারে সস্তা পণ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারে। সর্বোপরি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, অর্ধপরিবাহী, সৌর প্যানেল, হিউম্যানয়েড রোবট এবং অটোমোবাইলের মতো শিল্পগুলিতে কৃত্রিম ভাবে সস্তা পণ্য তৈরিতে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রসার ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইইউ-র উচিত উদীয়মান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে তার প্রতিযোগিতামূলকতা জোরদার করার জন্য ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করা, যা বিশ্ব ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করবে। সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ধরনের অংশীদারিত্ব পুনর্নবীকরণ ও পুনর্নির্ধারণ করা অপরিহার্য। সাধারণ বৈশ্বিক কল্যাণের জন্যই ভারত এবং ইইউ-র দীর্ঘমেয়াদি, রাজনৈতিক ভাবে লাভজনক, অর্থনৈতিক ভাবে সম্ভাব্য এবং উন্নয়নভিত্তিক পথনির্দেশিকার কৌশল গ্রহণ করা উচিত।
স্বাতী প্রভু অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সেন্টার ফর নিউ ইকোনমিক ডিপ্লোমেসির অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr Swati Prabhu is a Fellow with the Centre for New Economic Diplomacy at Observer Research Foundation. Her research explores the idea of aid, role of ...
Read More +