ভারতের শিল্পনীতি ২.০ ‘ভাব্য’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশব্যাপী প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে শিল্প পার্কের প্রসার ঘটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এগুলির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য শুধুমাত্র পরিকাঠামোর উপর নির্ভর না করে, বরং সমন্বিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তুতন্ত্র-চালিত শিল্প উন্নয়নের উপরেও নির্ভর করবে।
প্রায় ৩৩,৬৬০ কোটি ভারতীয় টাকা (৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দেশ জুড়ে প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে শিল্প পার্ক গড়ে তোলার জন্য ভারত ঔদ্যোগিক বিকাশ যোজনার (ভাব্য) কথা ঘোষণা করে। এই ঘোষণাটি তুলনামূলক ভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও এটি শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে ভারতের ক্রমবর্ধমান মনোযোগকেই তুলে ধরে। ভাব্য উদ্যোগটির লক্ষ্য হল লজিস্টিকস, উৎপাদন ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং একই সঙ্গে মূল মূল্য সংযোজিত পরিকাঠামো তৈরি করা। উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলিতে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিল্প পার্ক স্থাপনের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। এর শক্তি নিহিত রয়েছে দেশের তুলনামূলক সুবিধাকে কাজে লাগানো এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে এর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করার মধ্যে।
উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলিতে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিল্প পার্ক স্থাপনের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে।
কেস স্টাডি হিসেবে চিন
সরকারগুলি কী ভাবে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং শিল্প উন্নয়নকে চালিত করতে শিল্প পার্ক ব্যবহার করেছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল চিন। ১৯৮০-র দশকে প্রথম এ হেন পার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেখানে। চিন তার রফতানিমুখী সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার জন্য এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনাইটেড নেশনস ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ইউএনআইডিও) উল্লেখ করেছে যে, চিনের শিল্প পার্কগুলি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চিনে ২,৫০০-এর বেশি জাতীয় ও প্রাদেশিক শিল্প পার্ক রয়েছে, যা জাতীয় জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশ অবদান রাখে। প্রধান পার্কগুলি উপকূলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত এবং নবায়নযোগ্য শক্তি সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক্স, বায়োমেডিসিন, বস্ত্র, পোশাক, জুতা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ উৎপাদনের উপর মনোযোগ দেয়। অতি সম্প্রতি দেশটি কার্বন নিঃসরণ কমাতে তার শিল্প এলাকাগুলিকে ‘জিরো-কার্বন পার্ক’-এ রূপান্তরিত করার দিকে মনোনিবেশ করছে। এটি কেবল কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যকেই সমর্থন করে না, বরং কার্বন ট্রেডিং, কার্বন সম্পদ ব্যবস্থাপনা, শক্তি নিরীক্ষা এবং সবুজ অর্থায়ন পরিষেবার মতো ক্ষেত্রে নতুন বাজারের সুযোগও তৈরি করে। এই উদ্যোগগুলি সবুজ লেবেলিংয়ের জন্য বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রয়োজনীয়তার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা প্রদান করে।
সফল শিল্প পার্কের মূল চালিকাশক্তি
চিনের সাফল্যের আখ্যান থেকে বোঝা যায় যে, শিল্প পার্কগুলি কেবল অবকাঠামো-নির্ভর উন্নয়ন নয়, বরং এগুলি কৌশলগত, পরিকল্পিত এবং সুপরিচালিত শিল্প বাস্তুতন্ত্র। এগুলির লক্ষ্য শুধু জিডিপি বা রফতানি বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং পরিবেশ সুরক্ষার দিকেও নিবদ্ধ। আঞ্চলিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য শ্রম, পরিষেবা ও পরিবহণের সহজলভ্যতাকে সর্বোত্তম করার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এগুলি পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পার্কগুলি কোনও একটি নির্দিষ্ট মডেলের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়নি, বরং স্থানীয় পরিস্থিতি এবং শক্তিকে সমন্বিত করে তৈরি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি সহায়ক নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো ছিল, যেখানে কেন্দ্রীভূত ও সুসংগঠিত প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কাজ করত। এগুলি উদ্ভাবন এবং মেধাসম্পদ সহায়তা, ইনকিউবেটর ও প্রতিভা কর্মসূচির মাধ্যমে শিল্পগুলিকে ভ্যালু চেন বা মূল্য শৃঙ্খলের উপরের দিকে নিয়ে যাওয়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। পরিশেষে বলা যায়, চিকিৎসা সুবিধা, শিক্ষা, আবাসন এবং সামাজিক উন্নয়নের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে পার্কের অভ্যন্তরে জীবনযাত্রার মান উন্নত করার একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর এগুলি নির্মিত হয়েছিল।
চিনের সাফল্যের আখ্যান থেকে বোঝা যায় যে, শিল্প পার্কগুলি কেবল অবকাঠামো-নির্ভর উন্নয়ন নয়, বরং এগুলি কৌশলগত, পরিকল্পিত এবং সুপরিচালিত শিল্প বাস্তুতন্ত্র।
ভারতের প্রেক্ষাপট
শিল্প পার্ক স্থাপনে ভারত যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। এখানে ৪,৫০০-এর বেশি শিল্প পার্ক রয়েছে, যার মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক পার্ক অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান এবং কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলিতে অবস্থিত। তবে ভারতীয় শিল্প পার্কগুলি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যার মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগের অভাব, ছাড়পত্র পেতে বিলম্ব এবং বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে অবকাঠামো-কেন্দ্রিক মডেল গ্রহণের প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চাহিদা এবং সেগুলি আদৌ উপযুক্ত কি না, তা মূল্যায়ন করার আগেই পার্ক স্থাপন করা হয়, যা নকশা পর্যায়ে দুর্বল পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক রেটিং সিস্টেম (আইপিআরএস) ২.০ প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের শিল্পভূমি বাস্তুতন্ত্রের উন্নয়নে তথ্যের ঘাটতি এবং স্বচ্ছতার অভাব প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গিয়েছে।
এর মোকাবিলায়, স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য ইন্ডিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল ল্যান্ড ব্যাঙ্ক (আইআইএলবি) তৈরি করা হয়েছে, যা পরিকল্পনা এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা করে। প্রতিবেদনটিতে পার্কগুলির একটি অসম বণ্টনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যার সর্বোচ্চ ঘনত্ব পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলে দেখা যায়। এটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী কৌশলগত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব, মধ্যাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলের মতো কম প্রতিনিধিত্বকারী এলাকাগুলিতে। তা ছাড়া, বেশির ভাগ শিল্প পার্কই সরকারি মালিকানাধীন এবং এতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ সীমিত, যার ফলে এই পার্কগুলিতে বিনিয়োগ কম হতে পারে এবং মূলধন বরাদ্দ হ্রাস পেতে পারে। তবে প্রতিবেদনে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার অবস্থা, বিশেষ করে আবাসন, পরিষেবা এবং সংযোগ ব্যবস্থার বিষয়টি সে ভাবে তুলেই ধরা হয়নি। ভারতের কিছু শিল্প এলাকার সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, সেখানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবের পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য পরিবহণ ও পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্প এলাকাগুলির লাভজনকতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিল্প পার্কগুলিকে ভবিষ্যৎ-উপযোগী করে তোলা
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এর (ডব্লিউইএফ) মতে, প্রচলিত শিল্পনীতিতে প্রায়শই ভর্তুকি, সুরক্ষা বা খাত-ভিত্তিক প্রণোদনার উপর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হত না। শিল্পনীতি ২.০ আরও বেশি পদ্ধতিগত, যা অবকাঠামো, উদ্ভাবন, দক্ষতা, অর্থায়ন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি গ্রহণ, স্থায়িত্ব এবং ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্টকে প্রতিযোগিতামূলক কর্মসূচির সঙ্গে একীভূত করতে চায়। চিনের শিল্পনীতি এই বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রতিফলিত করে। তাই যে সব দেশ তাদের নিজস্ব শিল্পনীতি ২.০ প্রণয়ন করছে, তাদের জন্য চিন থেকে গৃহীত মূল শিক্ষা হল শিল্প পার্ক, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা প্রণোদনা প্রকল্পগুলির হুবহু অনুকরণ না করে, একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক পদ্ধতি গড়ে তোলা, যা লেনদেনের খরচ কমাতে, প্রতিষ্ঠান-স্তরের উন্নয়নে সক্ষম করতে, সরবরাহকারী শৃঙ্খল গভীর করতে, উদ্ভাবনকে সমর্থন করতে এবং উৎপাদন ক্লাস্টারগুলিকে দেশীয় ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করতে সাহায্য করবে।
ভারতের শিল্পনীতি ২.০-এর সাফল্য শক্তিশালী শিল্প ক্লাস্টারের উপর নির্ভর করবে; তবে এগুলিকে নিছক উৎপাদন কেন্দ্র থেকে অন্তর্ভুক্তি ও স্থায়িত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক স্থানে রূপান্তরিত হতে হবে।
ভাব্য উদ্যোগটি ভারতের শিল্প পার্ক কৌশলকে ভূমি-ভিত্তিক মডেল থেকে বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক পদ্ধতিতে স্থানান্তরের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যদিও শিল্প ক্লাস্টারগুলি মৌলিক ভৌত পরিকাঠামো তৈরি করেছে, তবে সংস্কারের পরবর্তী পর্যায়ে অবশ্যই উদ্যোগগুলির চারপাশের বাস্তুতন্ত্রকে শক্তিশালী করার উপর মনোযোগ দিতে হবে। এর মধ্যে সাধারণ পরীক্ষা, শংসাপত্র, নকশা, দক্ষতা কেন্দ্র এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংযোগের মতো ব্যবসায়িক সহায়তা পরিষেবাগুলিকে শক্তিশালী করা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পার্কগুলিকে অবশ্যই আবাসন, যাতায়াত, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, লিঙ্গ-সংবেদনশীল পরিকাঠামো এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধায় বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে তারা আঞ্চলিক উন্নয়নকে চালিত করে এমন উৎপাদনশীল শিল্প বাস্তুতন্ত্র হিসাবে কাজ করতে সক্ষম হয়।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ভাব্য-সংযুক্ত পার্কগুলিতে শূন্য-কার্বন এবং প্রযুক্তিগত ভাবে উন্নত শিল্প বাস্তুতন্ত্রকে একীভূত করা উচিত। এর জন্য নবায়নযোগ্য শক্তি, শক্তি-সাশ্রয়ী ভবন, কার্বন অ্যাকাউন্টিং এবং চক্রাকার উৎপাদন ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। তাদের সংস্থাগুলিকে দূষণহীন উৎপাদন প্রক্রিয়া গ্রহণে সক্ষম করতে হবে এবং স্থায়িত্ব-সংযুক্ত শংসাপত্রগুলিকে সমর্থন করতে হবে। ডিজিটাল ক্ষেত্রে, দক্ষ পরিকল্পনা এবং লজিস্টিকস অপ্টিমাইজেশনকে উৎসাহিত করার জন্য এআই-সক্ষম সাধারণ পরিকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়াও, শিল্প পরিকাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে সংযোগ ব্যবস্থাকে বিবেচনা করা উচিত। পার্কগুলিকে এমন ভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস হাব, অভ্যন্তরীণ করিডোর এবং রফতানি হাবগুলির সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগ নিশ্চিত হয় এবং বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে তাদের একীভূতকরণ সম্ভব হয়।
ভারতের শিল্পনীতি ২.০-এর সাফল্য শক্তিশালী শিল্প ক্লাস্টারের উপর নির্ভর করবে; তবে এগুলিকে নিছক উৎপাদন কেন্দ্র থেকে অন্তর্ভুক্তি ও স্থায়িত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বাস্তুতন্ত্র-ভিত্তিক স্থানে রূপান্তরিত হতে হবে।
শ্রুতি জৈন অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Shruti is an Associate Fellow at the Centre for Development Studies, Observer Research Foundation (ORF), where her research examines the intersections between policy, economic diplomacy ...
Read More +