চিনে এআই চিপ রফতানির উপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে সিদ্ধান্তহীনতা ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি ও অসংগতিপূর্ণ প্রযুক্তি নীতিকে তুলে ধরেছে, যা মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতার কৌশলকে - এমনকি তার নিজের মিত্রদের মাঝেও - সন্দেহের মধ্যে ফেলেছে।
প্রায় এক দশক ধরে - বিশেষত দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে – চিনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও রফতানি নীতির অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে আসছে। এর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং প্রায় সমস্ত বিদ্যমান প্রযুক্তিতে এর সংযুক্তির কারণে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এ ক্ষেত্রে একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এটি এআই রফতানি নীতিকে বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। তবে চিনে এআই চিপ বিক্রির উপর রফতানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত এই বিষয়ে আমেরিকার বিদ্যমান অবস্থানকে গুরুতর সন্দেহের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
চিনের পাল্টা জবাব এবং তাদের ডেটা সেন্টারের জন্য দেশীয় ভাবে উৎপাদিত চিপের উপর নির্ভর করার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে, ট্রাম্প প্রশাসন অবশেষে চিনে এনভিডিয়ার সদ্য বিকশিত বি৩০এ চিপ বিক্রি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরো ঘটনাটি ট্রাম্পের বিভ্রান্তি ও লক্ষ্যহীন প্রযুক্তি নীতিকে তুলে ধরে। অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার পাশাপাশি এটি মার্কিন মিত্রদের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রবর্তিত, চিন থেকে প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খল বিচ্ছিন্ন করার বৃহৎ কৌশলটি বিশ্ব জুড়ে একাধিক অর্থনীতির উপর একটি উল্লেখযোগ্য — এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকর — প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে অনেকেই এই কৌশলের কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যতে এটি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
মার্কিন এআই নীতি এবং কৌশলগত উদ্যোগ
ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক মাসগুলিতে স্টারগেট প্রজেক্ট, আমেরিকার এআই অ্যাকশন প্ল্যান এবং চিপস অ্যাক্টের অধীনে ট্যাক্স ক্রেডিটের মেয়াদ বৃদ্ধি-সহ একাধিক এআই ও প্রযুক্তি নীতি সংক্রান্ত পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। এই সমস্ত উদ্যোগের সাধারণ লক্ষ্য হল দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা, চিনা উৎপাদনের উপর নির্ভরতা কমানো এবং রফতানি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে চিনের অগ্রগতিকে বাধা দেওয়া।
উদাহরণস্বরূপ, এনভিডিয়ার এইচটুও চিপ - যা সংস্থার সবচেয়ে উন্নত চিপগুলির (যেমন ব্ল্যাকওয়েল) একটি নিম্ন মানের সংস্করণ এবং বিশেষ ভাবে চিনা বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি - বাইডেন প্রশাসনের সময় আরোপিত রফতানি নিয়ন্ত্রণ মেনে চলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প চিনে এইচটুও চিপ বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যার ফলে বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে এনভিডিয়ার প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লোকসান হয়। সিইও জেনসেন হুয়াং-এর মতে, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে জুলাই ত্রৈমাসিকে সংস্থাটির আরও প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লোকসান হয়েছে।
এআই চিপ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চিন টানাপড়েন
২০২৫ সালের অগস্ট মাসে ট্রাম্প মার্কিন সরকারের কাছে বিক্রয়লব্ধ আয়ের ১৫ শতাংশ ছাড়ের বিনিময়ে এনভিডিয়া এবং এএমডি চিপের ওপর থেকে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। এই পদক্ষেপটিকে সম্ভাব্য অসাংবিধানিক রফতানি শুল্ক হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি চিন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মার্কিন নীতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যের উদ্দেশ্য নিয়ে একাধিক মতামত থাকলেও, কয়েকটি মতামত বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
চিনের প্রতি এআই নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ভণ্ডামিপূর্ণ ও স্ববিরোধী। মার্কিন রফতানি নিয়ন্ত্রণের কারণে তাইওয়ান, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি চিনের বাইরে তাদের চিপ উৎপাদন কেন্দ্র স্থানান্তর করতে বাধ্য হচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। অন্য দিকে, চিনে এআই চিপ রফতানির বিষয়ে আমেরিকার নিজস্ব দোদুল্যমান অবস্থান সামগ্রিক কৌশলের প্রতি আস্থা জাগাতে তেমন কোনও ভূমিকা রাখে না।
এই ঘোষণাটি করা হয়েছে এনভিডিয়ার মাসব্যাপী লবিংয়ের পর, যার ফলস্বরূপ জুলাই মাসে ট্রাম্প ও হুয়াংয়ের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। চিনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের অন্যতম প্রধান প্রবর্তক হওয়া সত্ত্বেও এনভিডিয়ার দাবির কাছে ট্রাম্পের নতি স্বীকার করার আপাত সিদ্ধান্তটি কৌশলগত এবং কর্পোরেট স্বার্থের মিশ্রণকেই নির্দেশ করে বলে মনে হয়। তিনি যে যুক্তি দিয়েছিলেন তা হল, এইচটুও চিপগুলি অত্যাধুনিক ব্ল্যাকওয়েল চিপের একটি নিম্ন মানের ও নিকৃষ্ট সংস্করণ। তবে এটি একটি কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি বিক্রির ন্যায্যতাকে প্রমাণ করে না, বিশেষ করে পশ্চিমি প্রযুক্তি রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করার ক্ষেত্রে চিনের প্রবণতার কথা বিবেচনা করলে। সর্বোপরি, চিনাদের কাছে সরাসরি হার্ডওয়্যার বিক্রি করার পরিবর্তে ক্লাউড পরিষেবার মাধ্যমে দূরবর্তী প্রবেশাধিকার প্রদানের বিকল্পটি একটি কার্যকর বিকল্প ছিল।
আর একটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চিন বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে পুরনো চিপ বিক্রির দরুন চিনকে একটি মিথ্যা নিরাপত্তাবোধে আচ্ছন্ন করাই ছিল উদ্দেশ্য। তবে এই কৌশলটি চিন দ্রুত ব্যর্থ করে দেয়, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাদের সংস্থাগুলিকে এইচ২০ চিপ কেনা থেকে নিষিদ্ধ করে। এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে সম্ভবত ছিল মার্কিন কংগ্রেসের একটি সম্ভাব্য আইনের ঘোষণা, যেখানে রফতানিকৃত চিপে ট্র্যাকিং এবং কিল-সুইচ সক্ষমতা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি, মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের মন্তব্যও এর একটি কারণ ছিল, যেখানে তিনি অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ‘চিনাদের সেকেলে প্রযুক্তিতে আসক্ত করার কৌশল’ নিয়ে কথা বলেন। চিন তার সিদ্ধান্তে আরও অটল হয় এবং তাদের ৩০ শতাংশের কম ক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টারগুলিকে সমস্ত ইনস্টল করা বিদেশি চিপ সরিয়ে ফেলতে বা সেগুলি কেনার পরিকল্পনা বাতিল করার নির্দেশ দেয়। এর জবাবে, হোয়াইট হাউস ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর চিনে এনভিডিয়ার ছোট আকারের বি৩০এ চিপ বিক্রি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি হিসেবে প্রধানত যে কারণটি দেখানো হচ্ছে তা হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতো চিন-বিরোধী কট্টরপন্থীদের বিরোধিতা, যাঁরা চিনে এআই চিপ সরবরাহের বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন। এই উদ্বেগগুলি প্রযুক্তির দ্বৈত-ব্যবহারের প্রকৃতির সম্ভাব্য সামরিক প্রভাব থেকে উদ্ভূত। তবে যেমনটা আগে উল্লেখ করা হয়েছে, মাত্র কয়েক মাস আগেও ট্রাম্প এই ধারণার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। সিদ্ধান্তের সময়কাল বিবেচনা করলে, এর সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ বলে মনে হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ায় এপেক সম্মেলনের ফাঁকে মাত্র কয়েক দিন আগে একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চিন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি চিপের উপর নির্ভরতা কমানোর ব্যাপারে চিনের অব্যাহত অঙ্গীকার।
ট্রাম্পের এআই ও প্রযুক্তি নীতি: ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
ট্রাম্পের নীতিগুলির লেনদেনমূলক প্রকৃতি সুবিদিত হলেও, দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এটি সবসময় একটি কার্যকর কৌশল নয়; কারণ এই নীতি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অংশীদার ও মিত্রদের প্রয়োজন দ্বারাও পরিচালিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, চিনের প্রতি এআই নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ভণ্ডামিপূর্ণ ও স্ববিরোধী। মার্কিন রফতানি নিয়ন্ত্রণের কারণে তাইওয়ান, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলি চিনের বাইরে তাদের চিপ উৎপাদন কেন্দ্র স্থানান্তর করতে বাধ্য হচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। অন্য দিকে, চিনে এআই চিপ রফতানির বিষয়ে আমেরিকার নিজস্ব দোদুল্যমান অবস্থান সামগ্রিক কৌশলের প্রতি আস্থা জাগাতে তেমন কোনও ভূমিকা রাখে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সুসংহত প্রযুক্তি নীতির অভাব পশ্চিমি-নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতার নীতিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এটি একটি উদীয়মান আমেরিকান আধিপত্যের ধারণাকেও বিশ্বাসযোগ্যতা দিচ্ছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের তাদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে প্ররোচিত করছে।
ট্রাম্প যদি একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ অব্যাহত রাখেন, তবে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, এমনকি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যেও, আরও অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে। এর ফলে তারা আমেরিকান প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর তাদের নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমানোর জন্য নতুন জোট গঠনে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত ২৫তম সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের পর ভারত-রাশিয়া-চিনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার মধ্যে এর একটি উদাহরণ ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে ভারতের জেদের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সুসংহত প্রযুক্তি নীতির অভাব পশ্চিমি-নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতার নীতিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এটি একটি উদীয়মান আমেরিকান আধিপত্যের ধারণাকেও বিশ্বাসযোগ্যতা দিচ্ছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের তাদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে প্ররোচিত করছে। ওয়াশিংটনে দৃঢ় ও অনুমানযোগ্য নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্পের নীতিকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা অন্য দেশগুলিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বাধীন নতুন কৌশল ও জোট গঠনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আগামী বছরগুলিতে এটি দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
প্রতীক ত্রিপাঠী অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সেন্টার ফর সিকিউরিটি, স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড টেকনোলজির (সিএসএসটি) অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Prateek Tripathi is an Associate Fellow at the Centre for Security, Strategy and Technology. His work focuses on an emerging technologies and deep tech including quantum ...
Read More +