একটি সম্ভাব্য জি২ কাঠামো এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে করিয়ে দেয় যে, ইন্দো-প্যাসিফিক একটি বহুমেরু অঞ্চল এবং এই অঞ্চলের একটি সুসংহত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে পারে না।
৩০ অক্টোবর এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) শীর্ষ সম্মেলনের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুসানে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বহু প্রতীক্ষিত এই ট্রাম্প-শি বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যখন বিশ্ব জুড়ে ভূ-রাজনৈতিক আলোড়ন চলছে। এই আলোড়নের বৈশিষ্ট্য হল, বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার মাত্রা পুনর্নির্ধারণ এবং নতুন ভৌগোলিক অঞ্চলে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের কৌশল বাস্তবায়নে বেজিংয়ের সুচিন্তিত অগ্রযাত্রা। নানা দিক থেকে দেখলে, এই নতুন ব্যবস্থা নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য। তবে ওয়াশিংটনের কথিত পশ্চাদপসরণ এবং বেজিংয়ের অবিচলিত অগ্রগতির ফলে সৃষ্ট নতুন ঘটনাপ্রবাহ বিশ্ব নিরাপত্তা পরিমণ্ডলে এক গভীর ছাপ রেখে যাবে। বৈঠকের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, ‘জি২ দ্রুতই ই বৈঠকে বসবে।’ যখন বিশ্বের দু’টি প্রধান অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্র একটি একক কৌশলগত জোট গঠনের চেষ্টা করবে, তখন তা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে কী ভাবে আকার দেবে?
বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে সংঘাত ও যুদ্ধ চললেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন একে অপরের বিরুদ্ধে কোনও সংঘাতে জড়ায়নি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বেজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোনও সংঘাতে রূপ নেয়নি। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৈশিষ্ট্য হল বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। লক্ষ্যণীয় ভাবে বিশ্বের সকল সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই সবচেয়ে তীব্র বলে মনে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চিন সহযোগিতার জল্পনা যখন ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বৈধতা পাবে, তখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল কী ভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে।
যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিক থেকে একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকে নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থা বজায় রাখার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছে, এই অঞ্চলের প্রতি বেজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বৃহত্তর প্রভাব বিস্তারের।
দীর্ঘদিন ধরে ইন্দো-প্যাসিফিককে মার্কিন-চিন প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে, যা এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে যে, আঞ্চলিক ব্যবস্থাটি একটি দ্বিমেরু ব্যবস্থা। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিক থেকে একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকে নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থা বজায় রাখার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছে, এই অঞ্চলের প্রতি বেজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বৃহত্তর প্রভাব বিস্তারের। ইন্দো-প্যাসিফিকে চিনের সম্পৃক্ততা এই অঞ্চলে তার ক্রমবর্ধমান সার্বভৌম দাবির দ্বারা চিহ্নিত হয়েছে, যার লক্ষ্যে বেজিং কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ করছে এবং তার নৌবাহিনী, উপকূলরক্ষী ও সামুদ্রিক সেনা মোতায়েন করছে। এর ফলে ফিলিপাইন্সের মতো দেশগুলির উপকূলরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষও ঘটেছে। অন্য দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক জুড়ে কৌশলগত ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে, আন্তর্জাতিক আইন এবং নৌচলাচলের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে চিনের প্রতিক্রিয়াকে এই অঞ্চলে বেজিংয়ের উত্থানকে প্রতিহত করার একটি কৌশল হিসেবেই ব্যাপক ভাবে দেখা হয়েছে।
জি২ কাঠামোটি কৌশলগত চিন্তাবিদদের মধ্যে সংশয়ের সঙ্গে গৃহীত হলেও মার্কিন-চিন সৌহার্দ্যের ধারণাটি অবশ্যই অন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারদের মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করবে। অনেকে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত ভূগোলকে বেজিং এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্বিমেরু প্রতিযোগিতার একটি ক্ষেত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করলেও এটি প্রকৃতপক্ষে একটি বহুমেরু ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ তাদের স্বার্থ ও বাধ্যবাধকতা রক্ষা করে চলেছে। যেহেতু ইন্দো-প্যাসিফিক আঞ্চলিক ব্যবস্থা মার্কিন-চিন জুটির চেয়েও বৃহত্তর কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে, তাই বেজিং এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে বর্ধিত সহযোগিতার সম্ভাবনাকে অবশ্যই অন্য সমমনস্ক অংশীদারদের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত, যাতে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর ন্যূনতম নির্ভরতা রেখে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার পথ খুঁজে নিতে পারে।
জি২ কাঠামোটি কৌশলগত চিন্তাবিদদের মধ্যে সংশয়ের সঙ্গে গৃহীত হলেও মার্কিন-চিন সৌহার্দ্যের ধারণাটি অবশ্যই অন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদারদের মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করবে।
বাস্তবতা হল এই যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একাধিক পক্ষ এই অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তাকরণ প্রচেষ্টায় গভীর ভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সামরিক ব্যয়ের নিরিখে বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ স্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সম্পৃক্ততার উপর জোর দেওয়া। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলও ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া নজরদারির আওতায় এসেছে। এই বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন অউকাস-কে (অস্ট্রেলিয়া-সংযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) পর্যালোচনার অধীনে রেখেছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রাইম মিনিস্টার আলবানিজের মধ্যে বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস অউকাস-এর কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ফিলিপাইন্সকে নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্র-বহুপাক্ষিক গোষ্ঠী ‘দ্য স্কোয়াড’-এর ক্ষেত্রেও এই বছরের শুরুতে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে খুব সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। ‘কোয়াড’-এর উপরেও অচলাবস্থা বিরাজ করছে। সর্বোপরি, তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার মাত্রা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে চলেছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের প্রকৃতি ও পরিধি নিয়ে আসন্ন অনিশ্চয়তা এবং জি২-র উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এই অঞ্চলের সমমনস্ক অংশীদারদের জন্য তাদের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরতা কমানো অত্যাবশ্যক। তবে সামনের পথ জটিল এবং প্রতিবন্ধকতাময় হতে পারে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যেহেতু চিনের সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান হুমকি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন অংশীদারদের নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্রমাগত প্রভাবিত করছে, তাই এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য দেশগুলিকে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে এবং বিদ্যমান অংশীদারিত্বগুলিকে আরও জোরদার করতে হবে। এটি ইন্দো-প্যাসিফিকের কৌশলগত চরিত্রকে একটি বহুমেরুকৃত ক্ষেত্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার একটি উপযুক্ত সুযোগ বলেও মনে হচ্ছে, যা কেবল মার্কিন-চিন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সঙ্কীর্ণ ভাবে সংজ্ঞায়িত না হয়ে বরং বৈচিত্র্যময় ও বহুমুখী স্বার্থের এক বিশাল পরিমণ্ডল দ্বারা গঠিত।
যেহেতু চিনের সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান হুমকি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিভিন্ন অংশীদারদের নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্রমাগত প্রভাবিত করছে, তাই এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য দেশগুলিকে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে এবং বিদ্যমান অংশীদারিত্বগুলিকে আরও জোরদার করতে হবে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু, যা এই ভূখণ্ডে চলমান ব্যাপক পরিবর্তনের অনেকটাই প্রভাবিত করে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার প্রকৃতি ও পরিধি পরিবর্তিত হচ্ছে বলে মনে হলেও এই পরিবর্তন ক্রমাগত বিকশিত হতে থাকবে। যেহেতু ইন্দো-প্যাসিফিক ভূখণ্ড ক্রমশ একটি বহুকেন্দ্রিক ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করছে, তাই এই অঞ্চলে একটি নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থার প্রবক্তাদের জন্য নতুন অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। জি২ কাঠামোটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুস্মারক যে, ইন্দো-প্যাসিফিক একটি বহুকেন্দ্রিক অঞ্চল এবং এই অঞ্চলের একটি সুসংহত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে পারে না।
সায়ন্তন হালদার অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Sayantan Haldar is an Associate Fellow with ORF’s Strategic Studies Programme. At ORF, Sayantan’s work is focused on Maritime Studies. He is interested in questions on ...
Read More +