পরিবর্তনশীল জোট, অভ্যন্তরীণ বাধা এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক ঝুঁকির মাঝেই জেসিপিওএ-র এক দশক পর ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি উত্তরাধিকার-সংজ্ঞায়িত পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন করতে চান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্ব বাণিজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলে শুরু হওয়া বিশৃঙ্খলার চক্রের মাঝেই ওয়াশিংটন ও তেহরান আবারও আলোচনা শুরু করছে। শক্তি ও অভিপ্রায়ের প্রদর্শনের জন্য আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য ও তার আশপাশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র জড়ো করেছে, যাতে পি৫+১ রাষ্ট্রগুলির (চিন, ফ্রান্স, রাশিয়া, সংযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি) সঙ্গে ইরানের মধ্যে হওয়া প্রথম পারমাণবিক চুক্তির দশ বছর পর ইরানের নেতৃত্বকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে চাপ দেওয়া যায়। এই চুক্তিটি জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামেও পরিচিত।
ক্ষমতায় থাকার প্রথম মেয়াদেই ট্রাম্প ২০১৮ সালে জেসিপিওএ থেকে নির্বিচারে বেরিয়ে যান এবং বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা আলোচনার উপর কার্যত জল ঢেলে দেন, যার ফলে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ট্রাম্প বরাবরই চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন এবং এটিকে ‘দুর্বল’ ও তেহরানের প্রতি ‘একপেশে’ বলে অভিহিত করেছেন। এখন আবার যখন তিনি হোয়াইট হাউসে ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন, তখন ট্রাম্প আর একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে চাইছেন। এমন একটি চুক্তি ট্রাম্প করতে চাইছেন, যাতে তিনি তাঁর পূর্বসূরি প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের উত্তরাধিকারকে সমর্থন করার পরিবর্তে নিজেই চুক্তির মালিকানা নিতে পারেন। এ হেন চুক্তির প্রধান প্রয়োজনীয়তা হল ট্রাম্পের ‘অনুমোদনের শিলমোহর’ এবং তার ফলে শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার নেপথ্যে ট্রাম্পের ক্ষমতা… খবরের শিরোনামে নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরার প্রয়াস।
ইজরায়েলি নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে গতিশীল সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে, আলোচনার পরিবর্তে হামলার পক্ষে, অথবা অন্তত পক্ষে আলোচনার টেবিলে ইরানের অবস্থান দুর্বল করার দরুন এবং মার্কিন ও ইজরায়েলি অভিপ্রায়ের উদাহরণ প্রদানের জন্য বল প্রয়োগের পক্ষে থেকেছে।
বর্তমানের বিশ্বব্যবস্থা ২০১৫ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য রকমের আলাদা। ট্রাম্প - যিনি একজন স্বঘোষিত চুক্তি স্বাক্ষরকারী বা চুক্তির প্রস্তুতকারক - ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে ‘সরাসরি’ আলোচনার ঘোষণা করেন, যা ওমানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। প্রায় একই সময়ে ইজরায়েলের প্রাইম মিনিস্টার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও ওয়াশিংটনে সরকারি সফরে ছিলেন। ইজরায়েলি নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে গতিশীল সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে, আলোচনার পরিবর্তে হামলার পক্ষে, অথবা অন্তত পক্ষে আলোচনার টেবিলে ইরানের অবস্থান দুর্বল করার দরুন এবং মার্কিন ও ইজরায়েলি অভিপ্রায়ের উদাহরণ প্রদানের জন্য বল প্রয়োগের পক্ষে থেকেছে। তবে নেতানিয়াহুর অবস্থান মার্কিন সমর্থন পায়নি।
নিঃসন্দেহে ২০১৫ সালের তুলনায় এই অঞ্চলে ইরানের অবস্থান এখন দুর্বলতর। এর ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ - ইজরায়েলি, মার্কিন এবং কিছুটা হলেও সমগ্র অঞ্চলে আরব শক্তি ও প্রভাবকে অবমূল্যায়ন করার লক্ষ্যে অ-রাষ্ট্রীয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির একটি অনানুষ্ঠানিক জোট – ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ৭ অক্টোবরের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর গাজার হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহ উভয়কেই ইজরায়েলের অস্তিত্বগত আঘাতের সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং ইয়েমেনের হুতিরা - হঠাৎ করেই যে দলটি অক্ষশক্তির মূল উস্কানিদাতার ভূমিকায় উন্নীত হয়েছে - বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছ থেকে তীব্র আক্রমণের সম্মুখীন হচ্ছে।
গত দু’মাস ধরে আমেরিকা দেখিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ক্ষয়িষ্ণু শক্তি হওয়ার যে কোনও ধারণাই ভুল। তবে ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন শক্তির ব্যবহার এই শর্তসাপেক্ষ যে, আঞ্চলিক অংশীদারদেরও এই সম্পৃক্ততার মূল্য চোকাতে হবে। এটি মার্কিন অভিযানগুলিকে ‘প্যাক্স আমেরিকানা’র বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের পরিবর্তে ‘ভাড়াটে সামরিক বাহিনী’ হয়ে ওঠার ইঙ্গিত প্রদান করে।
যাই হোক, বিশ্ব ব্যবস্থায় আমেরিকার কেন্দ্রিকতার চলমান পুনর্নির্মাণের জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে ইরানের সঙ্গে তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে শিয়া শক্তিকে কোণঠাসা করার জন্য আলোচনা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে। সর্বোপরি, ইরানের নেতৃত্ব আলোচনায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেক বেশি ধূর্ত বলে মনে হয়। প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেলেও অনেকেই অনুমান করেছেন যে, তেহরান চাইলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রধারী শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের নেতৃত্ব আলোচনায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেক বেশি ধূর্ত বলে মনে হয়।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে ইঙ্গিত দিয়ে আসছে যে, তারা ট্রাম্পের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও - যিনি ২০২৪ সালে একমাত্র মধ্যপন্থী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন - এই আলোচনার পক্ষে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রাক্তন ইরানি পারমাণবিক আলোচক জাভেদ জারিফ - যিনি জেসিপিওএ পরিচালনা করেছিলেন – মার্কিন সংবাদমাধ্যমে লিখেছিলেন যে, পেজেশকিয়ান আরব প্রতিবেশী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চান। তবে ইজরায়েলের বিষয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশটি অবিচলই থাকবে। আরও মজার বিষয় হল, ইরানের ফরেন মিনিস্টার সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি - যিনি পূর্বে প্রধান পারমাণবিক আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন - সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টে একটি মতামত প্রদানকারী নিবন্ধে লিখেছিলেন যে, আলোচনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বল আমেরিকার কোর্টে পৌঁছেছে। তবে এই নিবন্ধে আরাঘচি এক বারও ইজরায়েলের কথা উল্লেখ করেননি।
পারমাণবিক বিতর্ককে অনেকগুলি আনুষঙ্গিক বিষয়ও মোকাবিলা করতে হবে। ২০১৫ সালের চুক্তির বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগ ছিল যে, আলোচনাটি পারমাণবিক প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত থাকলেও এটি তেহরানকে তার মিলিশিয়াদের চক্রের প্রতি সমর্থন কমাতে চাপ দেয়নি। এ বারও একই ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে পারে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বিতর্কের অংশ হিসেবে ইরানের আঞ্চলিক নীতিগুলি থেকে বৃহত্তর বিচ্ছিন্নতার দাবি জানাতে পারে। বিদ্রোহ দমন, সন্ত্রাস দমন ও পারমাণবিক প্রতিরোধের এই অসংলগ্নতা এমন একটি অনন্য নীলনকশা তৈরি করে, যা বলা যতটা সহজ, বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন।
ইরান যতই চুক্তির প্রত্যাশী হোক না কেন, তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি পরিচালনার জন্যও তাকেও কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে। পরিশেষে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেই ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ করবেন। আয়াতুল্লাহ-কে মদত জোগাতে থাকা ইরানের রক্ষণশীলরা তীব্র ভাবে মার্কিন বিরোধী এবং জেসিপিওএ-র পতনকে ওয়াশিংটনের উপর আস্থা রাখার ঝুঁকি ও ব্যয়বহুলতার প্রমাণ বলে মনে করেন। তবুও ২০১০ সালের গোড়ার দিকে তেহরানের এই প্রচেষ্টার মূল কারণগুলি অপরিবর্তিত রয়েছে, নিষেধাজ্ঞাগুলি তার স্থানীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতের বহু-মেরুকৃত ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত হওয়ার ইচ্ছা এখন তার অক্ষ প্রকল্পের তীব্র সীমিত শক্তির সঙ্গে সমাপতিত হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ-কে মদত জোগাতে থাকা ইরানের রক্ষণশীলরা তীব্র ভাবে মার্কিন বিরোধী এবং জেসিপিওএ-র পতনকে ওয়াশিংটনের উপর আস্থা রাখার ঝুঁকি ও ব্যয়বহুল বলে মনে করেন।
ইরানের জন্য আজ পারমাণবিক প্রশ্নে একটি অপ্রত্যাশিত অথচ অনুকূল পরিস্থিতি হল, আমেরিকান একই কাজের পুনরাবৃত্তি এবং ট্রাম্পের মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ব্যবহারের জন্য ব্যবসায়ীদের মতো দৃষ্টিভঙ্গি অন্য দেশগুলিকেও তাদের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করছে। ইউরোপে বিশ্লেষকরা আগের চেয়ে আরও বেশি খোলামেলা ভাবে পারমাণবিক সুরক্ষার কথা বলছেন। কারণ ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য মার্কিন সামরিক সমর্থনের পুনর্বিবেচনা করছেন এবং মস্কোর সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে জনসাধারণের আলোচনায় একই রকম গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যেখানে উত্তর কোরিয়া একটি পারমাণবিক শক্তি হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।
অবশেষে, পারমাণবিক প্রসঙ্গে ইরান-মার্কিন আলোচনা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি বটে। আলোচনা কোথায় এগোবে বা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছবে, তা কেউ জানে না। তবে অনুকূল দিক হল যোগাযোগের চ্যানেল খোলা থাকবে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে এবং অ-সামরিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই জাতীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং ইরানকে একটি আনুষ্ঠানিক পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হল এই অঞ্চলের আরব শক্তিগুলিও একই ধরনের অস্ত্র তৈরির পথে দ্রুততার সঙ্গে এগোবে। একটি ভঙ্গুর বৈশ্বিক পরিবেশে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা তাই অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
কবির তানেজা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর এবং ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Kabir Taneja is the Executive Director of the Observer Research Foundation’s Middle East office. He previously focused on India’s relations with the Middle East (West ...
Read More +