চিনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই আরো স্থিতিশীল ও উদ্ভাবন-চালিত প্রবৃদ্ধি কৌশলের আওতায় প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতাকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং একটি প্রযুক্তি-নিরাপত্তা মডেলের দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি উন্মোচিত চিনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার রূপরেখা ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশটির নীতিগত গতিপথের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আলোকে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখতে পাচ্ছে। এর মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদে মাথাপিছু জিডিপি দ্বিগুণ করা একটি কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার।
বেজিং ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য সংক্রান্ত যে কোনও সমঝোতাকেই অস্থায়ী বলে মনে করে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৃহত্তর প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতার আহ্বান জানিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে পরিকল্পনার রূপরেখায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তার জন্য ‘প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা’ উন্নত করতে এবং দুর্লভ খনিজ পদার্থে ‘প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা’ তৈরি করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিনের মনোযোগ কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, জৈব-উৎপাদন, হাইড্রোজেন শক্তি এবং ষষ্ঠ প্রজন্মের মোবাইল যোগাযোগের মতো ভবিষ্যৎ শিল্পের উপর নিবদ্ধ। পরিকল্পনাবিদরা শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বল ক্ষেত্রগুলিকে চিহ্নিত করেছেন এবং ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট, শিল্প যন্ত্রপাতি, উচ্চ মানের সরঞ্জাম, মৌলিক সফটওয়্যার, উন্নত উপকরণ এবং জৈব-উৎপাদনের মতো মূল প্রযুক্তিগুলিতে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জনের জন্য ‘অসাধারণ পদক্ষেপ’ করার অঙ্গীকার করেছেন।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আলোকে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখতে পাচ্ছে।
প্রযুক্তিগত স্থিতিস্থাপকতার এই আকাঙ্ক্ষা একটি অভ্যন্তরীণ উদ্ভাবনী বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং এই পরিকল্পনায় বার্ষিক ৭ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ শিল্পের জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক দক্ষতাসম্পন্ন নিকটবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে সংযুক্ত পরীক্ষামূলক উন্নয়ন অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা চলছে।
খসড়া রূপরেখাটি একটি ‘নতুন গুণগত উৎপাদন শক্তি’ (新质生产力), উদ্ভাবন-চালিত প্রবৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতার উপর আলোকপাত করে। এই পরিকল্পনাটি রফতানি সর্বোচ্চকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রিয়েল এস্টেট প্রবৃদ্ধির উপর দৃষ্টি নিবদ্ধকারী পূর্ববর্তী মডেল থেকে সরে এসে শিল্প আধুনিকীকরণ, উন্নত উৎপাদন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্রগুলির সম্প্রসারণের দিকে পরিবর্তনের উপর জোর দেয়। এই পরিকল্পনাটি চিনা অর্থনীতিতে পারিবারিক ভোগ বৃদ্ধি করার উপর গুরুত্বারোপ করে। কারণ সতর্কতামূলক সঞ্চয় হিসেবে ১১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পড়ে আছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ এবং রফতানি চালিকাশক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে একটি বর্ধিত সামাজিক সুরক্ষা জাল, পরিষেবা খাতের উদারীকরণ এবং চিনের রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠন, যাতে স্থানীয় সরকারগুলিকে এই ধরনের উদ্যোগে ব্যয় করার জন্য আরও বেশি সম্পদ দেওয়া যায় এবং অর্থনৈতিক আধুনিকীকরণ বাস্তবায়ন করা যায়।
স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হ্রাস
চিন সম্প্রতি তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বিগত তিন বছরের ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪.৫–৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যা উচ্চ প্রবৃদ্ধি থেকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই পুনর্বিন্যাসটি স্থানীয় সরকারের ঋণ, সঙ্কটগ্রস্ত আবাসন খাত এবং দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা-সহ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও সতর্ক ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়নের প্রতিফলন। আগ্রাসী রাজস্ব প্রণোদনার পরিবর্তে বেজিং একটি সংযত পন্থা অবলম্বন করেছে। স্থানীয় সরকারের বিশেষ-উদ্দেশ্যমূলক বন্ডে ৪.৪ ট্রিলিয়ন আরএমবি এবং অতি-দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বন্ডে ১.৩ ট্রিলিয়ন আরএমবি-র কোটা অপরিবর্তিত রয়েছে। ভোক্তা ভর্তুকি চালু করা সত্ত্বেও ২০২৬ সালে চিনের রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির ৪ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে। এটি স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার চেয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং কাঠামোগত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে চিনের সুস্পষ্ট নীতিগত পছন্দকে প্রতিফলিত করে।
প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতা এবং ‘এআই প্লাস’ কৌশল
চিনের নতুন উন্নয়ন মডেলের মূল ভিত্তি হল ‘নতুন উৎপাদন শক্তি’ তৈরির উপর জোর দেওয়া। এটি উচ্চ মানের প্রবৃদ্ধি চালনা এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরকে সমর্থন করার জন্য একটি কারিগরি কর্মীবাহিনী তৈরিতে বেজিংয়ের নতুন করে মনোযোগ দেওয়ার প্রতিফলন। গত বছর চালু হওয়া এআই+ উদ্যোগটির লক্ষ্য হল, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং প্রযুক্তি-চালিত প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন শিল্প, উৎপাদন এবং পরিষেবা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সমন্বিত করা। বেজিং প্রযুক্তি গ্রহণ থেকে সরে এসে দেশীয় উদ্ভাবনের দিকে যেতে চায়। এটি ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যে অনুকরণের ঊর্ধ্বে উঠে বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমানোর এক বৃহত্তর উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দেয়।
প্রযুক্তি-নিরাপত্তা রাষ্ট্রের উত্থান
চিন আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে পৃথক পথ হিসেবে দেখে না। সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী এবং এআই-এর মতো মূল প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরশীলতাকে একটি নিরাপত্তা অপরিহার্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরে সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শিক্ষাবিদ তাই মিং চেউং যুক্তি দিয়েছেন যে, চিন একটি ‘প্রযুক্তি-নিরাপত্তা’ রাষ্ট্র হয়ে উঠতে চায়, যেখানে অর্থনীতি, উদ্ভাবন, সামরিক শক্তি এবং জাতীয় নিরাপত্তা সমন্বিত থাকবে।
প্রযুক্তি-নিরাপত্তা মডেলটি বলে যে, একটি পরাশক্তিকে স্থিতিশীল হতে হলে তার সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ডিজিটাল অবকাঠামো অবশ্যই সুরক্ষিত হতে হবে, যা বাহ্যিক নিষেধাজ্ঞা বা ভূ-রাজনৈতিক চাপ থেকে সুরক্ষিত একটি ‘দুর্গ’ হিসেবে কাজ করবে। এই বৈঠকে প্রতিফলিত একটি বৃহত্তর পরিবর্তন হল অর্থনৈতিক শাসনে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিবেচনার সংহতিকরণ। এই পদ্ধতির লক্ষ্য হল অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা শক্তিশালী করার মাধ্যমে চিনকে ভূ-রাজনৈতিক, প্রযুক্তিগত বা আর্থিক… যে কোনও বাহ্যিক ধাক্কা থেকে রক্ষা করা। পাশাপাশি এর আরও লক্ষ্য হল সেমিকন্ডাক্টরে আত্মনির্ভরশীলতা এবং সুরক্ষিত সরবরাহ শৃঙ্খল অর্জন করা ছাড়াও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টা এবং শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা বজায় রাখা।
চিন সম্প্রতি তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বিগত তিন বছরের ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪.৫–৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যা উচ্চ প্রবৃদ্ধি থেকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সারসংক্ষেপে বললে, পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সূচনা নিরাপত্তা, ধারাবাহিকতা এবং কৌশলগত মনোযোগ দ্বারা সংজ্ঞায়িত একটি শাসন মডেলে চিনের রূপান্তরকে সুদৃঢ় করেছে। এটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে সুসংহত করে এবং একটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা আইনের আইনগত আনুষ্ঠানিকীকরণকে এগিয়ে নিয়ে যায়, যা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে রাষ্ট্রের একটি কেন্দ্রীয় কৌশলগত নির্দেশিকা হিসেবে স্থাপন করে এবং একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের জন্য কর্মক্ষমতার মানদণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনে ঝুঁকি পরিহারকে অন্তর্ভুক্ত করে। চিন এমন একটি উন্নয়ন প্রতিমানকে সুসংহত করছে, যা প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়, ভোগ বৃদ্ধি করে এবং উচ্চ মানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মুদ্রা সঙ্কোচনের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এই মডেলটি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে আরও গভীর করে, প্রবৃদ্ধির গতির চেয়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং একটি অধিকতর চিন-কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
কল্পিত এ মানকিকর অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ফেলো।
অমিতরঞ্জন আলোক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের রিসার্চ ইন্টার্ন।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Kalpit A Mankikar is a Fellow with Strategic Studies programme and is based out of ORFs Delhi centre. His research focusses on China specifically looking ...
Read More +
Amit Ranjan Alok is a Research Intern at ORF. He is a second-year PhD candidate in Chinese political economy at the Centre for East Asian ...
Read More +