পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল ধীরগতির শাসনব্যবস্থাকে সরিয়ে শিল্পের পুনর্জাগরণ, কৃষি-মূল্য সমন্বিতকরণ, আর্থিক বিচক্ষণতা এবং নগর গতিশীলতার উপর কেন্দ্র করে একটি সাহসী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের ৪ মে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে একটি চূড়ান্ত নির্বাচনী রায় প্রকাশ্যে এসেছে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই বিজয়ের মাধ্যমে ৪৯ বছরের সংঘাতপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার (বিবাদ, দ্বন্দ্ব এবং আদর্শগত উত্তেজনায় চিহ্নিত কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক) অবসান ঘটেছে, যা রাজ্যের বিদায়ী সরকারের অধীনে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আরও তীব্র হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেবল পর্যায়ক্রমিক প্রশাসনিক সংশোধনে নয়, বরং একটি কাঠামোগত অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে রূপান্তরিত করতে হবে। কয়েক দশক ধরে নীতিগত লক্ষ্যহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং শিল্পক্ষেত্রে নানাবিধ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পর, নতুন সরকারের কাছে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় পশ্চিমবঙ্গকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ রয়েছে। সম্ভাবনা থাকলেও এখনও পর্যন্ত সঠিক সমন্বয়ের অভাব ছিল এবং এর সংশোধন প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গ আজ ভারতের ষষ্ঠ বৃহত্তম রাজ্য অর্থনীতি, যার ২০২৫-২৬ সালে আনুমানিক মোট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (গ্রস স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বা জিএসডিপি) প্রায় ২০.৩ লক্ষ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবুও এই বিশালতার আড়ালে একটি কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। রাজ্যের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে পরিষেবা খাত থেকে, এর পরেই রয়েছে শিল্প খাত (প্রায় ২৪ শতাংশ) এবং কৃষি খাত (প্রায় ২১ শতাংশ)। অর্থনীতিকে পরিষেবা-নির্ভর বলে মনে হলেও কর্মশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষির উপর নির্ভরশীল, যা মোট উৎপাদনের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ অবদান রাখে। এর ফলস্বরূপ, প্রিম্যাচিওর টার্শিয়ারাইজেশন-এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি হয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রচ্ছন্ন স্বল্প কর্মসংস্থান এবং স্থবির উৎপাদনশীলতা।
যে কোনও উল্লেখযোগ্য পুনরুজ্জীবন শুরু করতে হবে আইনের শাসনের পুনর্নিশ্চয়তা, ভূমি ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং একটি রাজনীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে।
এ ছাড়াও, আপেক্ষিক অর্থনৈতিক নিরিখে রাজ্যটির ক্রমিক অবনতির বিষয়টির দিকে আলোকপাত করা প্রয়োজন। ১৯৬০-৭০-এর দশকে, মাথাপিছু মোট রাজ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (নেট স্টেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বা এনএসডিপি) পশ্চিমবঙ্গ ধারাবাহিক ভাবে তৃতীয় স্থানে ছিল এবং তখনকার আয় ছিল জাতীয় গড়ের প্রায় ১১৫-১২৫ শতাংশ। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে এর অবস্থানের অবনতি শুরু হয়, যার কারণ ছিল তৎকালীন অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রভাব, যা শিল্পবিমুখতা, অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, ধীর কাঠামোগত রূপান্তর এবং পশ্চিম ও দক্ষিণের রাজ্যগুলির তুলনায় দুর্বল বিনিয়োগ গতিশীলতার জন্ম দেয়। বর্তমানে, মাথাপিছু এনএসডিপি র্যাঙ্কিংয়ে পশ্চিমবঙ্গ ২০-এর মাঝামাঝি (মোটামুটি ২৩তম-২৮তম) অবস্থানে নেমে এসেছে এবং এর মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ। এটি রাজ্যটির প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংস্কৃতি এবং শাসনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ক্ষতিকেই দর্শায়। তবুও এর প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রাথমিক প্রস্তুতি এবং সংযোগ ব্যবস্থার মধ্যে একটি সুপ্ত সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে। সুতরাং, সামনের কাজটি হয়তো পুরোপুরি শূন্য থেকে সব কিছু গড়ে তোলার নয়, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর মধ্যে নিহিত।
প্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক অগ্রাধিকার হল আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা এবং ফলস্বরূপ, অর্থনৈতিক শাসনকে বিশ্বাসযোগ্য জনস্বার্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিনিয়োগ আসে পূর্বাভাসযোগ্যতা থেকে, কেবল অর্থনৈতিক প্রণোদনা থেকে নয়। যদিও বাংলা ক্রমাগত বিনিয়োগের প্রস্তাব আকর্ষণ করে চলেছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কর আদায় ও শিল্পোন্নয়নে উন্নতি প্রত্যক্ষ করেছে, তবুও দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ (সংগঠিত তোলাবাজি ও দুর্নীতির একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা), নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব প্রায়শই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যে কোনও উল্লেখযোগ্য পুনরুজ্জীবন শুরু করতে হবে আইনের শাসনের পুনর্নিশ্চয়তা, ভূমি ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং একটি রাজনীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে। বাংলায় অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন শুরু করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার সার্বভৌমত্ব দিয়ে।
দ্বিতীয়ত, রাজ্যকে একটি শিল্প নবজাগরণ ঘটাতে হবে। বাংলার শিল্পক্ষেত্রের পতন সুপ্রতিষ্ঠিত — রাজ্যের পাট ক্ষেত্র ও প্রকৌশল ভিত্তির ক্ষয় থেকে শুরু করে আধুনিক উৎপাদনের সুযোগ হাতছাড়া হওয়া পর্যন্ত। আজ রাজ্যের মোট উৎপাদনের মাত্র এক-চতুর্থাংশ আসে শিল্প থেকে, যা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। কিন্তু সম্ভাবনা রয়েছে: ২০২৪-২৫ সালে শিল্প খাতে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গিয়েছে, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে সামান্য বেশি। এগিয়ে যাওয়ার পথ হল গুচ্ছ-ভিত্তিক শিল্পায়ন (ক্লাস্টার-বেসড ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন), যা বিভিন্ন খাতের শক্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। যেমন পশ্চিমাঞ্চলে ধাতু ও ভারী শিল্প, হলদিয়ায় পেট্রোকেমিক্যাল ও লজিস্টিকস এবং কলকাতা, দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়া-সহ অন্যান্য অঞ্চলে এমএসএমই-চালিত উৎপাদন। একে সমর্থন জোগাবে প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে শিল্প পরিকাঠামো, সুবিন্যস্ত ছাড়পত্র প্রক্রিয়া এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে শ্রমের নমনীয়তার ভারসাম্য। এ ছাড়াও, সরকারকে এমএসএমইগুলির জন্য উৎপাদন-সংযুক্ত এবং রফতানি-সংযুক্ত প্রণোদনা কাঠামো তৈরি করতে হবে। ওআরএফ-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে সেই পথটির কথা বিস্তারে বলা হয়েছে। ভূমি রাজনীতির অর্থনীতি থেকে ভূমি উৎপাদনশীলতার অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
সমন্বিত কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্লাস্টার তৈরি, কোল্ড-চেন পরিকাঠামো সম্প্রসারণ এবং রফতানিমুখী কৃষিকে উৎসাহিত করার বিষয়টিই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
তৃতীয়ত, কৃষিকে কেবল জীবনধারণের খাত হিসেবে না দেখে, কৃষি-শিল্প মূল্যশৃঙ্খলের ভিত্তি হিসেবে নতুন করে কল্পনা করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম প্রধান কৃষিপ্রধান রাজ্য: ধান ও আনাজপাতির বৃহত্তম উৎপাদক এবং মাছ ও আলুর শীর্ষ উৎপাদকদের মধ্যে অন্যতম। তবে জাতীয় উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সত্ত্বেও, খণ্ডিত মূল্যশৃঙ্খল এবং সীমিত প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতার কারণে কৃষি থেকে তুলনামূলক ভাবে কম আয় হয়। সর্বোপরি, কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল ল্যান্ড রিফর্ম অ্যাক্ট বা পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন ১৯৫৫-এর অধীনে (যা ১৯৬০-৭০-এর দশকের শেষের দিকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছিল) জোতের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের বিধানের দরুন উদ্বৃত্ত জমিকে ছোট ছোট মালিকানার এককে পুনর্বণ্টন করে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র জোতের ভিত্তি প্রসারিত করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি পরবর্তী কালে উত্তরাধিকার সূত্রে জমি বিভাজন, জনসংখ্যার চাপ এবং দুর্বল ভূমি-লিজ বাজারের কারণে কার্যক্রমের খণ্ডকরণ ও পরিধির অভাব দেখা দেয়। এটি সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর প্রতিকার হিসেবে কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নিরাপদ ভূমি ইজারা সক্ষম করা, সমন্বিতকরণের জন্য কৃষক উৎপাদনকারী সংগঠনগুলিকে (ফার্মার প্রোডিউসার অর্গানাইজেশন বা এফপিও) শক্তিশালী করা এবং সাধনী ব্যাঙ্ক (মেশিনারি ব্যাঙ্ক) ও সেচ ব্যবস্থার মতো যৌথ পরিষেবা সম্প্রসারণ করা। সমন্বিত কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্লাস্টার তৈরি, কোল্ড-চেন পরিকাঠামো সম্প্রসারণ এবং রফতানিমুখী কৃষিকে উৎসাহিত করার বিষয়টিই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মৎস্য ও জলজ চাষ - যার উৎপাদন বছরে ২০ লক্ষ টনের বেশি - একটি বিশেষ রকমের উচ্চ মূল্যের পথ খুলে দেয়। এখনও পর্যন্ত মূল্যশৃঙ্খলের চরম অদক্ষতা বাংলার কৃষি খাতকে পিছিয়ে রেখেছে; এর প্রতিকার করাই হল মূল কাজ।
চতুর্থত, নগরায়ণকে — বিশেষ করে কলকাতা মহানগর অঞ্চলের — রাজ্যের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিষেবা খাত ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রাধান্য বিস্তার করলেও কলকাতা একটি বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক নগর অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারেনি। তবুও এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সুস্পষ্ট: দুর্গাপুজোর মতো একটিমাত্র সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক উৎসবই বছরে আনুমানিক ৬৫,০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করে, যার প্রায় ৭০ শতাংশের অবদানই কলকাতার। কলকাতাকে একটি আর্থিক, জ্ঞান ও পরিষেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োজন, যা মিউনিসিপ্যাল বন্ড এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মতো নগর পরিকাঠামো অর্থায়ন ব্যবস্থার দ্বারা সমর্থিত হবে। বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক স্তরের কলকাতা ছাড়া বাংলা জাতীয় ভাবে প্রতিযোগিতামূলক স্তরের রাজ্য অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারবে না। অন্তর্নিহিত সংঘাতপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে কলকাতা কয়েক দশক ধরে মূলত উপেক্ষিতই থেকেছে এবং এখন সময় এসেছে কেন্দ্র ও রাজ্যকে একসঙ্গে কাজ করে বিমস্টেক অঞ্চলে কলকাতাকে একটি প্রবৃদ্ধির শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি নতুন কমিটি গঠন করার। এটি অনেকটা মুম্বইকে একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটির (হাই পাওয়ারড এক্সপার্ট কমিটি বা এইচপিইসি) অনুরূপ হবে।
কলকাতাকে একটি আর্থিক, জ্ঞান ও পরিষেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রয়োজন, যা মিউনিসিপ্যাল বন্ড এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মতো নগর পরিকাঠামো অর্থায়ন ব্যবস্থার দ্বারা সমর্থিত হবে। বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক স্তরের কলকাতা ছাড়া বাংলা জাতীয় ভাবে প্রতিযোগিতামূলক স্তরের রাজ্য অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারবে না।
পঞ্চমত, রাজ্যকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে তার ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে হবে। বার্ষিক ১.০৯ লক্ষ কোটি টাকার বেশি রফতানি এবং বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নৈকট্যের কারণে, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস-চালিত প্রবৃদ্ধির কৌশলকে ভিত্তি দেওয়ার জন্য বাংলা এক অনন্য অবস্থানে রয়েছে। হলদিয়া ও কলকাতায় বন্দর-ভিত্তিক উন্নয়নকে শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ জলপথ সম্প্রসারণ এবং মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস করিডোর নির্মাণ রাজ্যটিকে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে পারে। বাংলাকে প্রবেশদ্বার অর্থনীতি হিসেবে তার ঐতিহাসিক পরিচয় পুনরায় আবিষ্কার করতে হবে।
ষষ্ঠত, এই কাঠামোগত রূপান্তরের ভিত্তি হতে হবে মানবসম্পদ উন্নয়ন। রাজ্যের প্রায় ১০ কোটি জনসংখ্যা একাধারে একটি সুযোগ এবং একটি সীমাবদ্ধতাও বটে। শ্রমের সহজলভ্যতা বেশি হলেও দক্ষতার ভিত্তি উদীয়মান অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিল্প ক্লাস্টারের সঙ্গে যুক্ত দক্ষতা সংক্রান্ত বাস্তুতন্ত্র (স্কিল ইকোসিস্টেম) তৈরি, জাতীয় ও বৈশ্বিক শ্রম বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থানযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতার বিনিয়োগ হিসেবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য একটি লক্ষ্যভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োজন। মানবসম্পদই বাংলার সবচেয়ে কম ব্যবহৃত সম্পদ। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য সংস্কার প্রয়োজন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবস্থা ও নিয়ন্ত্রক তদারকির বিষয়টিকে আরও গভীর ভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। একটি সতর্কবাণীও প্রয়োজন: সরকারি হস্তান্তর - বিশেষত যেগুলি উৎপাদনশীল শ্রমের সঙ্গে যুক্ত নয় - আংশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। অনেক অর্থনীতির ক্ষেত্রেই এটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে বেকার ভাতার ফলে শ্রম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অতএব, হস্তান্তর প্রকল্পগুলি এমন ভাবে বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে আংশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়; বরং এই ধরনের ভর্তুকি মানব পুঁজি গঠনে পরিচালিত হওয়া উচিত। বাংলার চিরস্থায়ী সমস্যা হল সুযোগের অভাবে মানব পুঁজির দেশত্যাগ। এটি এমন একটি ব্যাধি, যার সমাধান কেবল শিল্পায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবা খাতের বিকাশের মাধ্যমেই সম্ভব।
সপ্তমত, সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান উন্নয়নের দিকে রাজস্ব কৌশলকে অবশ্যই চালিত করতে হবে। যদিও কর রাজস্বে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে — উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে জিএসটি সংগ্রহ দুই অঙ্কের হারে বৃদ্ধি পেয়েছে — তবে ব্যয়ের বিন্যাসকে পরিকাঠামো এবং মূলধন গঠনের দিকে পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের রাজস্ব সঙ্কট - যা গত ১৫ বছরে আরও গভীর হয়েছে - তা একটি কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতাকে প্রতিফলিত করে — অর্থাৎ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ঋণের ফাঁদ। এটি ক্রমাগত রাজস্ব ঘাটতি, রাজস্বের দুর্বল স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন জনতুষ্টিমূলক কল্যাণমূলক প্রকল্পের অধীনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও হস্তান্তরমূলক অর্থ প্রদানের দিকে ব্যয়ের স্থানান্তরের কারণে আরও জটিল হয়েছে এবং এর ফলে প্রবৃদ্ধিবর্ধক বিনিয়োগ ব্যাহত হয়েছে। ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ এবং সেগুলিকে উৎপাদনশীলতা-বর্ধক ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার মাধ্যমে এই ধরনের বিনিয়োগের জন্য রাজস্ব পরিসর তৈরি করা যেতে পারে।
বাংলার চিরস্থায়ী সমস্যা হল সুযোগের অভাবে মানব পুঁজির দেশত্যাগ। এটি এমন একটি ব্যাধি, যার সমাধান কেবল শিল্পায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবা খাতের বিকাশের মাধ্যমেই সম্ভব।
সর্বোপরি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে জনতুষ্টিবাদ থেকে নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার পথে হাঁটতে হবে। একক-জানালা ছাড়পত্র ব্যবস্থাকে (সিঙ্গল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম) শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও কার্যকর হতে হবে। শাসনব্যবস্থাকে হতে হবে তথ্য-নির্ভর, স্বচ্ছ এবং দায়বদ্ধ। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী আস্থা তৈরির জন্য স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে, বিশ্বাসযোগ্যতাই একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়। নতুন প্রশাসনের সামনে সুযোগটি ব্যাপক এবং তা শাসনব্যবস্থার গতানুগতিক পরিবর্তনের চেয়ে অনেক গভীর। এটি পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নমূলক শাসনের দৃষ্টান্তকে নতুন করে সাজানোর একটি সুযোগ প্রদান করে। অর্থাৎ স্থবিরতা থেকে গতিশীলতায়, খণ্ডবিখণ্ডতা থেকে সমন্বিতকরণে এবং ধারণা-চালিত পতন থেকে কর্ম-চালিত প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটার সুযোগ এখন স্পষ্ট।
নীলাঞ্জন ঘোষ অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr Nilanjan Ghosh heads Development Studies at the Observer Research Foundation (ORF) and serves as the operational and executive head of ORF’s Kolkata Centre. He ...
Read More +