এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় টাইমস অফ ইন্ডিয়া-য়।
পাকিস্তানে আসিম মুনিরের ক্ষমতা দখল দক্ষিণ এশিয়াকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। পাক সামরিক বাহিনী আর একটি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ব্যবস্থা নয়, বরং খোদ এটি রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের পেশোয়ারে ফেডারেল কনস্ট্যাবুলারির সদর দফতরে হামলা - যেখানে তিনজন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হন - দেশটিতে চলমান বিশৃঙ্খলার উদাহরণ। কিন্তু পাকিস্তানি নেতৃত্ব এই আগুনেই ঘি ঢালতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের পার্লামেন্ট একটি সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করে, যা দেশের বেসামরিক-সামরিক সমীকরণ পুনর্গঠন করে একজন ব্যক্তিকেই অবাধ ক্ষমতা প্রদান করে: সেই ব্যক্তিটি হলেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। মাত্র ন’মিনিটের মধ্যে এবং কোনও প্রকার বিতর্ক ছাড়াই মুনিরকে সশস্ত্র বাহিনীর সকল শাখার উপর ব্যাপক কর্তৃত্ব প্রদান করা হয় এবং আজীবন আইনি দায়মুক্তি দেওয়া হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ কার্যকর ভাবে পাকিস্তানের প্রধান হিসেবে নিজেকে আরও পাঁচ বছরের মেয়াদের জন্য সিডিএফ-এর অর্থাৎ প্রতিরক্ষা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছেন।
সাংবিধানিক বিষয়ে বিদ্যমান সুপ্রিম কোর্টের চেয়ে উচ্চতর একটি নতুন ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত, নির্বাহী বা সামরিক বাহিনীর উপর নজরদারি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের ভূমিকাকে অকেজো করে দেয়।
২৭তম সংশোধনী এমনিতেই মুনিরকে বিচার বিভাগের উপর যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে। সাংবিধানিক বিষয়ে বিদ্যমান সুপ্রিম কোর্টের চেয়ে উচ্চতর একটি নতুন ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত, নির্বাহী বা সামরিক বাহিনীর উপর নজরদারি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের ভূমিকাকে অকেজো করে দেয়। এটি ২৬তম সংশোধনীরই পুনরাবৃত্তি করে, যা এক বছর আগে (১৬ মিনিটের মধ্যে) পার্লামেন্টে পাস করা হয়েছিল এবং যা সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব হ্রাস করেছিল, বিচার সংক্রান্ত নিয়োগে আইনসভাকে ক্ষমতায়িত করেছিল ও বর্ষীয়ান বিচারকদের ক্ষমতাকে দুর্বল করেছিল। এর পর পার্লামেন্ট ১৯৫২ সালের পাকিস্তান সেনাবাহিনী আইনও সংশোধন করেছে, সেনাপ্রধানকে পাঁচ বছরের মেয়াদ দিয়েছে এবং অবসরের বয়সসীমা বাতিল করেছে। এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব স্পষ্ট: পাকিস্তানের বিচারিক স্বাধীনতাকে কাঠামোগত ভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে, দেশের সেনাবাহিনীকে আইনত শাসক ক্ষমতায় বসানো হয়েছে এবং মুনিরকে কার্যকর ভাবে স্বৈরশাসকের পদ দেওয়া হয়েছে।
মুনির তিন বছর ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন, যে মেয়াদ আইনত গত বছরই শেষ হওয়া উচিত ছিল। তিনি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিজের প্রভাবকে প্রসারিত করেছেন। তিনি পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ইমরান খানকে জেলে বন্দি করেছেন; সেনাবাহিনীর মধ্যে ইমরান খানের প্রতি সহানুভূতিশীলদের নির্মূল করেছেন; শরিফের নেতৃত্বাধীন পিএমএল-এনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য নির্বাচনে কারচুপি করেছেন; এবং ২০২৩ সালের মে ও ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের রাজপথে চলতে থাকা দু’টি বড় অস্থিরতাকে দমন করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে ইরান, ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন এবং ওয়াশিংটন, বেজিং ও রিয়াধের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করেছেন, বিদেশে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। গত গ্রীষ্মে ভারতের সঙ্গে হওয়া সীমিত সংঘাতের নেপথ্যেও তিনিই ছিলেন, যেখানে তিনি বিজয়ের দাবি করেছিলেন। এটি এমন একটি অভ্যুত্থান, যা সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সামরিক আধিপত্যকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর একটি পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি এমনকি তাঁর পোর্টফোলিওতে রাষ্ট্রপতির পদও যুক্ত করতে পারেন!
এই সংশোধনীগুলি এমন একটি পাকিস্তানকে প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলে, যেখানে বেসামরিক তত্ত্বাবধান কার্যকর ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। সংবিধানে সেনাপ্রধানকে অন্তর্ভুক্ত করে, সেনাবাহিনী ভবিষ্যতের জেনারেলদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে। অনানুষ্ঠানিক আধিপত্য এখন আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি নিতান্তই অলঙ্কারে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তানের ইতিহাস প্রায়শই এই বিষয়গুলিতে পরিবর্তিত হয়েছে যে, তার সেনাপ্রধানরা তাদের নির্ধারিত তিন বছরের মেয়াদ শেষে চুপচাপ চলে যান নাকি ছ’বছর ক্ষমতায় বসে থাকার জন্য ষড়যন্ত্র করেন নাকি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরাসরি আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেন। মুনির এই ধরনটিকেই একেবারে উল্টে দিয়েছেন। তিনি তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংবিধানকে খাপ খাইয়ে আট বছরের মেয়াদ নিশ্চিত করেছেন। এক দিকে যখন পাকিস্তান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিছকই ক্ষমতাহীন করে দিয়েছে, তখন অন্য দিকে ভারতে ভোটাররা বিহারে এনডিএ সরকারকে একটি নির্ণায়ক মতাদেশ প্রদান করেছেন, যা নির্বাচনী বেসামরিক রাজনীতিতে বিশ্বাসকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। ভারতের গণতান্ত্রিক সংহতকরণ পাকিস্তানের কর্তৃত্ববাদী পরিবর্তনের জন্য তীব্র স্বস্তির কারণ। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ভাবে লড়াই করার ভারতের নতুন স্বাভাবিকতাকে ক্রমশ পাকিস্তানের নতুন অস্বাভাবিক অর্থাৎ দে জুর গ্যারিসন রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়তে হবে।
পাকিস্তানের ইতিহাস প্রায়শই এই বিষয়গুলিতে পরিবর্তিত হয়েছে যে, তার সেনাপ্রধানরা তাদের নির্ধারিত তিন বছরের মেয়াদ শেষে চুপচাপ চলে যান নাকি ছ’বছর ক্ষমতায় বসে থাকার জন্য ষড়যন্ত্র করেন নাকি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরাসরি আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেন। মুনির এই ধরনটিকেই একেবারে উল্টে দিয়েছেন।
মুনিরের একত্রীকরণ নভেম্বরে ঘটে যাওয়া এক বিরক্তিকর ঘটনার ধারাবাহিকতার সঙ্গেও মিলে যায়: ১০ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে জইশ-ই-মহম্মদের এক সন্দেহভাজন যোগসূত্রের সঙ্গে বিস্ফোরণ, তার পরে ইসলামাবাদে একটি বিস্ফোরণ, যার জন্য তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ভারতের উপর দোষ চাপানো হয়। প্রমাণিত হোক বা না হোক, উভয় ঘটনাই আরও শক্তিশালী পাকিস্তানি নিরাপত্তা রাষ্ট্রের বিষয়টিকেই প্রকট করে দিয়েছে।
পাকিস্তানের পরিবর্তন প্রায়শই সীমান্ত পেরিয়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয়। এই গ্রীষ্মে পহেলগাম হামলা মুনিরের অভ্যন্তরীণ মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এ ভাবে সন্ত্রাসের জন্য একটি বিকৃত প্রণোদনা আবির্ভূত হয়েছে: সন্ত্রাসবাদের কর্মকাণ্ড ভারতের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে, যা সেনাবাহিনীর দাবি করা অপরিহার্যতাকে আরও শক্তিশালী করে।
ভারত ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জন্য পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অস্থির। এখন বেসামরিক তত্ত্বাবধান দ্বারা অস্থির সামরিক নেতৃত্ব থেকে কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলি চালিত হবে। এমনকি প্রতীকী নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই একটি কেন্দ্রীভূত কম্যান্ড কাঠামো ভুল গণনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। সঙ্কট বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক পরিসরও সঙ্কুচিত হতে পারে।
ভারত, আফগানিস্তান এবং বৃহত্তর অঞ্চলের জন্য এর প্রভাব উদ্বেগজনক। দুর্বল বেসামরিক সরকার এবং দৃঢ় সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে পাকিস্তানের দোদুল্যমানতা কয়েক দশক ধরে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। সেই দোদুল্যমানতা এখন শেষ হয়ে গিয়েছে। এর পরিবর্তে পাকিস্তান একটি সামরিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে খুব কম সীমাবদ্ধতা, গভীর কাঠামোগত ভিত্তি এবং উচ্চ ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে যে কোনও বিরোধে প্রত্যাশিত কূটনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে মুনিরের ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছা বৃদ্ধি পেয়েছে। চিন আবারও একটি চক্রান্তকারী সামরিক অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পারে। অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব সম্ভবত দ্রুত হস্তক্ষেপ করবে, যা ইসলামাবাদকে আরও উৎসাহিত করবে।
দক্ষিণ এশিয়া আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। পাশের সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র এমন একটি অঞ্চলকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা সাম্প্রতিক স্মৃতিতে যে কোনও সময়ের চেয়ে আরও ভঙ্গুর, বারুদে ঠাসা এবং ভুল হিসেব-নিকেশে ভরা। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আর একটি রাষ্ট্রের মধ্যে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়, বরং নিজেই একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় টাইমস অফ ইন্ডিয়া-য়।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Ajay Bisaria is a Distinguished Fellow at ORF. He is also a strategic consultant and commentator on international affairs. He has had a distinguished diplomatic ...
Read More +