Published on Nov 28, 2025 Updated 0 Hours ago

ঢাকা তার প্রতিরক্ষা নীতিমালা পুনর্গঠন করছে, যা অংশীদারদের বৈচিত্র্যকরণ, চিনের উপর নির্ভরতা হ্রাস এবং আমদানিকে স্বনির্ভরতার সঙ্গে সংমিশ্র করার কৌশল দ্বারা সংজ্ঞায়িত।

ঢাকার প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার এবং অংশীদারিত্ব বৈচিত্র্যকরণের ব্যাখ্যা

২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১২০ জন সামরিক সদস্যের একটি দল বাংলাদেশের চট্টগ্রামে পৌঁছয়আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আসন্ন যৌথ মহড়ার জল্পনা করলেও, বিষয়টি ওয়াশিংটন ডিসির সঙ্গে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ঢাকার উষ্ণ সম্পর্কেরই প্রমাণ দিয়েছিল, যা পূর্ববর্তী হাসিনা সরকারের সময়কার শীতল সম্পর্কের থেকে ভিন্ন চিত্রকেই দর্শায়২০২৫ সালের গস্ট মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ একটি দ্বিপাক্ষিক সামরিক মহড়া টাইগার শার্কসম্পন্ন করে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, আন্তঃকার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং উভয় দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ ১৫ বছরের পুরনো আওয়ামী লীগের ছাঁচ থেকে মুক্ত হয়ে একটি নতুন পরিচয় তৈরি করার জন্য নিজের বিদেশনীতিতে নতুন পথ তৈরি করছে। এ ভাবে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের বৈচিত্র্য আনা বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য একটি অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

২০০৯ সালে গৃহীত এবং ২০১৭ সালে পুনরুজ্জীবিত সামরিক আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা ফোর্সেস গোল ২০৩০ দ্বারা ঢাকা পরিচালিত হচ্ছে, যা উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে একবিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক মিলিশিয়া রূপান্তরিত করা প্রাক্তন আওয়ামী লীগ প্রশাসনের সময় এই পরিকল্পনা গৃহীত হলেও এটি কেবল উন্নয়নের জন্যই নয়, বরং দেশকে আসন্ন নিরাপত্তা হুমকির হাত থেকে রক্ষা করার জন্যও প্রাসঙ্গিক।  প্রকৃতপক্ষে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একাধিক নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যার ফলে ঢাকার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মায়ানমার সীমান্তে সংঘর্ষ, যেখানে রাখাইন এবং চিন স্টেটের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি সামরিক হুন্তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মি নাফ নদীর কাছে বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি কারণ বিদ্রোহী বাহিনীর প্রতি সহানুভূতিশীলদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এর ফলে দেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বেড়েছে এবং মায়ানমারের সেই নিরাপত্তা কর্মীরা ঢুকে পড়ছেন, যাঁরা  গ্রেফতারি ড়িয়ে যেতে চাইছেন।

২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ ১৫ বছরের পুরনো আওয়ামী লীগের ছাঁচ থেকে মুক্ত হয়ে একটি নতুন পরিচয় তৈরি করার জন্য নিজের বিদেশনীতিতে নতুন পথ তৈরি করছে। এ ভাবে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের বৈচিত্র্য আনা বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য একটি অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকেও এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে মেইতেই এবং কুকি জো সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। যদি এই সংঘাত চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের জো/চিন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়, তা হলে এটি কুকি-চিন জাতীয় সেনাবাহিনীর একটি পৃথক আঞ্চলিক রাষ্ট্রের দাবিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। ভারত, মায়ানমার, চিন এবং বাংলাদেশে এই গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে বলে জানা গিয়েছে এবং মণিপুরে সহিংসতার জন্য তারাই দায়ীজাতিগত সংঘাতের বিষয়টি বাদ দিলে ২০২৪ সালে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও টানাপড়েনের সম্মুখীন। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে এবং অবাঞ্ছিত ঘটনাপ্রবাহ প্রতিরোধ করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  বহিরাগত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রকোপ বাংলাদেশকে তার প্রতিরক্ষা জোরদার করতে বাধ্য করেছে।

চিরাচরিত সম্পর্কের সমস্যা

তবে এমনটা করার জন্য বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে বৈচিত্র্যময় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিশেষ করে অস্ত্র সরবরাহের জন্য চিনের উপর প্রকাশ্য নির্ভরতা কমাতে চাইছেহাসিনার আমলে চিন বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ২০০২ সালে বাংলাদেশ-চিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে বাংলাদেশের প্রায় ৭২ শতাংশ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক করভেট, স্বল্প পাল্লার সারফেস টু এয়ার মিসাইল, ভিটি৫ হালকা ট্যাঙ্ক, মিং-ক্লাস সাবমেরিন, হালকা অস্ত্র, ইন্টারসেপ্টর জেট, রাডার এবং ফ্রিগেট। বেজিং ২০২৩ সালে বিএনএস শেখ হাসিনা নামে একটি ছয় স্লটবিশিষ্ট সাবমেরিন ঘাঁটিও তৈরি করে। বাংলাদেশের আর্টিলারির বেশির ভাগ সামরিক সরঞ্জাম চিনে তৈরি হয়, যার মধ্যে রয়েছে কে৮-ডব্লিউ, জেট প্রশিক্ষক, টাইপ ৫৯ডি যুদ্ধ ট্যাঙ্ক এবং আক্রমণাত্মক সাবমেরিন, যার নাম নবযাত্রা

বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে বৈচিত্র্যময় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিশেষ করে অস্ত্র সরবরাহের জন্য চিনের উপর প্রকাশ্য নির্ভরতা কমাতে চাইছে

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বেজিং থেকে সরবরাহ করা অস্ত্রের মান নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সালের শেষের দিকে যশোরের অক্সবো লেকে চিনের তৈরি একটি বিএএফ কে৮-ডব্লিউ প্রশিক্ষক বিমান বিধ্বস্ত হয়, যার ফলে দুই পাইলট নিহত হন। ২০২২ সালে বাংলাদেশ চায়না নর্থ ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের ট্যাঙ্ক গোলাবারুদ সরবরাহ প্রত্যাখ্যান করে কারণ অভিযোগ করা হয় যে, সরবরাহের আগে সেগুলির গুণমান পরীক্ষা করা হয়নি। সম্প্রতি ২০২৫ সালের জুন মাসে চিনা এফ-৭বিজিআই ঢাকার মাইলস্টোন স্কুলে ভেঙে পড়ে, যার ফলে কমপক্ষে ২০ জন নিহত এবং ২০০ জন আহত হবাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিবহণ যানবাহন সম্পর্কে বেশ কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ইঞ্জিন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইনফ্রারেড নির্দেশিকা ডিভাইস। তা ছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনী জানিয়েছে যে, চায়না শিপবিল্ডিং অ্যান্ড অফশোর ইন্টারন্যাশনাল  কর্তৃক প্রদত্ত রাডারগুলি গুণমান সন্তোষজনক ছিল না চিনাদের দুর্বল মানের বিক্রয়োত্তর সহায়তা - যা যন্ত্রপাতির কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করেছে বাংলাদেশের আস্থা নষ্ট করেছে।

বেজিংয়ের উপর নির্ভরতা কমাতে এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করেছিলেন। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও শান্তি চুক্তি (মূলত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি) স্বাক্ষর করার পর থেকে বাংলাদেশকে ভারতের সামরিক সহায়তা প্রদান শুরু হয়। ১৯৭৫ সালে মুজিব হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সরকারগুলির বাংলাদেশকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার অগ্রাধিকারের দরুন ১৯৯৭ সালে এই চুক্তি ভেঙে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পুনর্নবীকরণ করা হয়, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বাংলাদেশে নিজেদের আশ্রয়স্থল থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অশান্তকারী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান আধুনিক ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে, যার সমাপ্তি ঘটে সম্প্রীতিমহড়ায়। নয়াদিল্লি ২০১৭ সালে একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব চুক্তির প্রস্তাব করেছিল কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উপর পাঁচটি সমঝোতাপত্র (মউ) স্বাক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে চিনা অস্ত্রের প্রতি ঢাকার ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ, প্রতিবেশী দেশগুলিতে অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ এবং সামরিক আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে ২০২৪ সালেই প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব আবার গতিশীল হয়। সেই অনুযায়ী উভয় দেশ তাদের ভবিষ্যতের জন্য অভিন্ন সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি’- তে প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা বিষয়টি তুলে ধরে।

বেজিংয়ের উপর নির্ভরতা কমাতে এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করেছিলেন।

তবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পর সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হওয়ায় এই অংশীদারিত্ব স্বল্পস্থায়ী ছিল। যদিও ২০২৫ সালের মার্চ মাসে সহযোগিতামূলক নৌ-মহড়া বঙ্গসাগরঅনুষ্ঠিত হয়েছিল, তবুও আস্থা হ্রাসের লক্ষণ রয়েছে। ঢাকা সম্প্রতি একটি ভারতীয় জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করেছে। এ ছাড়াও, দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠকে বাংলাদেশ অন্যায্য সীমান্ত চুক্তি পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহার করার চেষ্টা করেছে। ঢাকা যখন তার পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে, তখন এটি ঐতিহ্যবাহী অংশীদারিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে সকলের কাছে পৌঁছতে চাইছে

প্রতিরক্ষা সংগ্রহের বৈচিত্র্যকরণ

২০২৫ সালের জুন মাসে ইউনূস দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করার জন্য ঢাকায় তুর্কিয়ের প্রতিরক্ষা শিল্পের সচিব হালুক গর্গুনের সঙ্গে দেখা করেন। এই বছরের শুরুতে একটি বাংলাদেশি সামরিক প্রতিনিধিদল তুরস্কের বিদেশমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য আঙ্কারা ভ্রমণ করে। দুমাস পর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিআইডিএ) প্রতিনিধিরা সহ-উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার জন্য তুর্কিয়েতে পাঁচ দিনের সফর করেন। সেগুলির মধ্য আনাতোলিয়ার কিরিক্কালে অবস্থিত তুর্কিয়ের রাষ্ট্রীয়  মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মাকিনে ভে কিমিয়া এন্ডুস্ট্রিসিকে একচেটিয়া প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছিল। জানা গিয়েছে, বিআইডিএ তুর্কি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির সঙ্গে অংশীদারিত্বে চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জে প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ কেবল ১৮টি বোরান ১০৫ মিমি হাউইটজার বন্দুক, টি-২৩০ এবং টিআরজি-৩০০ রকেট সিস্টেম অর্জন করেনি - যা উচ্চ-গতি এবং দীর্ঘ-পাল্লার ধ্বংসের জন্য তৈরি করা হয়েছে - বরং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনাও অর্জন করেছে। বাগদাদ ছাড়াও ইউনূস সরকার ইসলামাবাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতেও আগ্রহী।

বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে এই প্রথম বারের মতো পাকিস্তানের সঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রতিরক্ষা বিনিময় হয়েছে। উভয় পক্ষ আঞ্চলিক নিরাপত্তা গতিশীলতা, যৌথ সামরিক মহড়ার সুযোগ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং প্রতিরক্ষা বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেছে। পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাহিদ আমির আফসারের নেতৃত্বে একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বাংলাদেশি প্রতিপক্ষের সঙ্গে দেখা করে, যা আইএসআই এবং বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার জন্য প্রথম উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার সূচনা করে। ঢাকার যুদ্ধজাহাজ বিএনএস সমুদ্র জয় ইসলামাবাদে আয়োজিত একটি নৌ মহড়া আমন-২৫’-ও অংশগ্রহণ করে। দুই দেশ অতীতের ব্যবধানের সম্পর্ককে পুনরুদ্ধার করছে, বিশেষ করে ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে যাদের বহিরাগত প্রভাবের বিরুদ্ধে স্থিতিস্থাপক থাকতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি এবং তাদের কাছ থেকে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান অর্জনে ঢাকার আগ্রহের বিষয়েও আলোচনা চলছে। বেজিং এবং ইসলামাবাদের যৌথ ভাবে তৈরি এই বিমানগুলি পাকিস্তান, বাংলাদেশ চিনের মধ্যে একটি সম্ভাব্য ত্রিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ইঙ্গিত দেয় কারণ বেজিং তাদের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা অংশীদার।

বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে এই প্রথম বারের মতো পাকিস্তানের সঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রতিরক্ষা বিনিময় হয়েছে। উভয় পক্ষ আঞ্চলিক নিরাপত্তা গতিশীলতা, যৌথ সামরিক মহড়ার সুযোগ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং প্রতিরক্ষা বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেছে।

অন্যান্য অংশীদারিত্বের মধ্যে বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে অগ্রিম প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ক্রয়ের বিষয়ে প্রত্যাশী, যা তার মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি) পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকার সঙ্গে সামরিক রফতানি সংযোগ জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করছে। জাপানের প্রস্তাবে রয়েছে মোগামি-শ্রেণির স্টিলথ ফ্রিগেট (১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের) সোরিউ-শ্রেণির সাবমেরিন, যার আকাশ-স্বাধীন চালনা ক্ষমতা রয়েছে এবং এটি বাংলাদেশের নৌ ও আকাশ সক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পারে। ২০২৫ সালের মে মাসে ইউনূসের জাপান সফরের সময় টোকিয়ো বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে পাঁচটি টহল নৌকা সরবরাহের প্রতিশ্রুতিও দেয়। ২০২৫ সালের জুন মাসে একটি বাংলাদেশি সামরিক প্রতিনিধিদল লন্ডনে একটি উচ্চ-প্রোফাইল আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করে। এই আলোচনায় সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, আন্তঃকার্যক্ষমতা এবং হুমকি আরও কার্যকরভাবে দূর করার জন্য আধুনিক, সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এক মাস পরে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দোহায় আর্দানা শীর্ষ সম্মেলনে ইউনূস কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আব্দুল রহমান আল থানির সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দক্ষ সহযোগিতার জন্য কাতারের সশস্ত্র বাহিনীতে ৭২৫ জন বাংলাদেশি সশস্ত্র কর্মী গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

বাস্তববাদ এবং আত্মনির্ভরতা

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব একটি বৃহত্তর কৌশলগত পুনর্গঠনকে দর্শায়ঢাকা চিনে সঙ্গে তার সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী থাকলেও ইউনূস ২০২৫ সালের মার্চ মাসে বেজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে অত্যন্ত কার্যকর যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং তা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে বৈচিত্র্যময় করার জন্যও আগ্রহী। এটি একটি বাস্তবসম্মত পরিবর্তন কারণ চিনা অস্ত্রশস্ত্রের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক উদ্বেগে পরিপূর্ণ। নিরাপত্তা উদ্বেগ দূর করার ক্ষেত্রে নতুন অংশীদারিত্বের কার্যকারিতা কেবল সময়ের হাত ধরেই প্রমাণিত হবে। এ দিকে, ঢাকা স্থানীয় ভাবে অস্ত্র তৈরি করে স্বনির্ভরতার উপরও জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি অরুনিমা ইউটিলিটি ট্রাকের মতো হালকা যানবাহন তৈরি করে। বাংলাদেশ অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি দেশীয় ভাবে ছোট অস্ত্র, বিডি-০৮ রাইফেল এবং ম্যান-পোর্টেবল এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম (ম্যানপ্যাড) তৈরি করে। খুলনা শিপইয়ার্ড অফশোর টহল জাহাজ তৈরি করেছে এবং তুরস্ক ও চিনের সহায়তায় ফ্রিগেট করভেট তৈরির পরিকল্পনা করেছে।

ঢাকার কূটনৈতিক দক্ষতা তখন পরীক্ষিত হবে, যখন দেশটি এক দিকে তার চিরাচরিত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যাদের উপর বাংলাদেশ যথেষ্ট বিনিয়োগের জন্য নির্ভরশীল এবং অন্য দিকে তার উদীয়মান মিত্রদের সঙ্গেও সম্পর্ক ভাল রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, যারা সম্ভাব্য ভাবে যে কোন একক শক্তির উপর তার অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশ যখন একটি নতুন পরিচয় তৈরি এবং নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তখন দেশটি অজানা পরিসরেই প্রবেশ করছে। ঢাকার কূটনৈতিক দক্ষতা তখন পরীক্ষিত হবে, যখন দেশটি এক দিকে তার চিরাচরিত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যাদের উপর বাংলাদেশ যথেষ্ট বিনিয়োগের জন্য নির্ভরশীল এবং অন্য দিকে তার উদীয়মান মিত্রদের সঙ্গেও সম্পর্ক ভাল রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, যারা সম্ভাব্য ভাবে যে কোন একক শক্তির উপর তার অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। নতুন আমদানি স্থানীয় প্রচেষ্টার মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উচ্চাকাঙ্ক্ষা চূড়ান্ত ভাবে বিচার করা হবে যে, তারা কতটা কার্যকর ভাবে জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলাফল কেবল দেশের  ভবিষ্য পথ নয়, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের কৌশলগত ভূপরিসরকেও আকার দেবে।


 

সোহিনী বোস অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।

সৃজিতা মুখোপাধ্যায় অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের রিসার্চ ইন্টার্ন ছিলেন।

 


নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখক(দের) ব্যক্তিগত।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.