এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ওআরএফ মিডল ইস্ট-এ।
বিশেষ উল্লেখ্য
• এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা হরমুজ প্রণালীর সঙ্কটের মোকাবিলায় একটি সমন্বিত পদক্ষেপ করার সম্ভাবনাকে সীমিত করে রেখেছে।
• এশীয় রাষ্ট্রগুলি অতীতে বৃহত্তর বহুপাক্ষিক অভিযানের অংশ হিসেবে এই অঞ্চলে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে। তবে এশীয় দেশগুলির নিজস্ব বাহিনী মোতায়েনের দাবি আরও জোরালো হতে পারে।
• মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু আপাতত এর উপস্থিতি বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা এশীয় শক্তিগুলিকে সাময়িক আশ্বাস দেবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত - যা এখন ৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে - এমন একটি অচলাবস্থায় পৌঁছেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি এবং কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে ক্রমাগত অস্থিতিশীল করে চলেছে। এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ জলপথে দু’টি সামুদ্রিক অবরোধ — একটি ইরানের এবং অন্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (ইউএস) দ্বারা আরোপিত। এর অর্থনৈতিক প্রভাব এশীয় অর্থনীতিগুলির জন্য বিশেষ ভাবে তীব্র। কারণ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে আসা জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা তুলনামূলক ভাবে বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের এশীয় আমদানিকারকরা সম্মিলিত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন। কারণ চলমান সংঘাত এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের নীতিগত অস্থিরতা জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে হামলা চালানো এবং ২০২৬ সালে দেশটির সামরিক অবস্থান পর্যন্ত এই অভিযান সম্প্রসারণের মার্কিন ও ইজরায়েলি সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এই ধাক্কাটি আংশিক ভাবে ইরান নিজেও প্রত্যাশা করেছিল। কারণ দেশটি কৌশলগত ভাবে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, তার সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি যে কোনও অস্তিত্বের সঙ্কট সংঘাতকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি অঞ্চলব্যাপী অস্থিতিশীলতা উস্কে দেবে। বিশ্লেষকরা দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালীর অবরোধের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে বিতর্ক করেছেন এবং কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে, বাণিজ্যের জন্য, বিশেষ করে তেল রফতানির ক্ষেত্রে, এই জলপথের ওপর ইরানের নিজস্ব নির্ভরতার কারণে এমন পরিস্থিতি ঘটার সম্ভাবনা কম। তবে তেহরানের অবরোধ আরোপের পাশাপাশি নৌচলাচলের পথ পুনর্গঠন এবং জাহাজ চলাচলের জন্য টোল কাঠামো চালুর প্রচেষ্টা প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলির জন্য একটি নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করেছে। কিছু ক্ষেত্রে এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশেষ ভাবে গুরুতর হয়েছে; নানা সূত্র থেকে জানা গিয়েছে যে, কুয়েত - যেখানে রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল থেকে আসে - এপ্রিল মাসে কোনও তেল রফতানি করতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের এশীয় আমদানিকারকরা সম্মিলিত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। কারণ চলমান সংঘাত এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের নীতিগত অস্থিরতা জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জাপান স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই তার বিশাল কৌশলগত তেলের ভাণ্ডার ব্যবহার শুরু করেছে। টোকিয়ো আরও জানিয়েছে যে, যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলে প্রণালীটি মাইনমুক্ত করার জন্য তারা মাইন অপসারণ কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। এ দিকে, চিন ইরানের তেল আমদানির জন্য তেল শোধনাগারগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। গত কয়েক বছর ধরে বেজিং ইরানের অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে অন্য ক্রেতারা সরে যাওয়ায় তারা বড় ছাড়ের সুবিধা পেয়েছে।
ইরানের আকস্মিক পতন যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে নিজেদের ব্যাপকতর ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুরক্ষিত রাখাতেও বেজিংয়ের স্বার্থ রয়েছে। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সৌদি নেতৃত্বের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনায় জোর দিয়ে বলেন যে, হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা উচিত। একই ভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ারও শুধু এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর এর প্রভাবই নয়, বরং প্রণালীতে তেহরানের অপ্রত্যাশিত আচরণের মোকাবিলা করার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। সিওল এবং নয়াদিল্লি উভয়ই অতীতে পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের মতো অভিযোগে জাহাজ আটক করেছে, যেগুলিকে ব্যাপক ভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করা হত।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ারও শুধু এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর এর প্রভাবই নয়, বরং প্রণালীতে তেহরানের অপ্রত্যাশিত আচরণের মোকাবিলা করার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে তেল পরিশোধ আটকে যাওয়ার মতো বিষয়গুলিতে চাপ সৃষ্টি করতে ইরান এই কৌশলগুলি ব্যবহার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের কাছে ভারতের ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি ঋণ ছিল। নিষেধাজ্ঞার কারণে আর্থিক লেনদেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ইরানের প্রস্তাবিত বিকল্প পদ্ধতি - যেমন চিনা ইউয়ানে বা মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে অর্থ প্রদানের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। কারণ নয়াদিল্লি একাধিক বহুপাক্ষিক আর্থিক স্বচ্ছতা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। অন্যান্য প্রস্তাবকেও - যেমন আর্থিক রাজধানী মুম্বইতে ইরানি ব্যাঙ্কের শাখা খোলা – একই ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ, তেহরান সুবিধা আদায়ের চেষ্টায় জাহাজ বাজেয়াপ্ত করার মতো জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যদিও এই প্রচেষ্টাগুলি শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়।
এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা হরমুজ প্রণালীর সঙ্কটের একটি সমন্বিত প্রতিক্রিয়া গঠনের সম্ভাবনাকে সীমিত করে। যদিও প্রণালীটির আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে মর্যাদা - যা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ - একই ধরনের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা উদ্বেগযুক্ত দেশগুলিকে একসঙ্গে মিলে কাজ করার জন্য যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতা প্রদান করে। তবে বাস্তবে, জাপান ও ভারতের মতো দেশগুলি - যাদের মধ্যে চলমান সঙ্কটের বাইরেও কৌশলগত মিল রয়েছে এবং যারা অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইন্দো-প্যাসিফিকের কোয়াড গোষ্ঠীরও অংশ - তারাও একটি ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে পৌঁছতে পারেনি, যা একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনাকে সীমিত করেছে।
একটি ব্যাপক এশিয়া-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সম্ভাবনা বিদ্যমান ভারত-চিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে আরও সঙ্কুচিত হয়েছে। বেজিংয়ের একমেরু এশিয়ার ধারণা ভারতের কৌশলগত লক্ষ্যের সরাসরি বিরোধী, যা চিনের উত্থানকে প্রতিহত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্য পশ্চিমি অংশীদারদের সঙ্গে মিলে নয়াদিল্লির জোটবদ্ধতাকে আরও শক্তিশালী করে। ২০২০ সালে হিমালয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে সামরিক সংঘাত তাদের দ্বিপাক্ষিক গতিশীলতায় একটি পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান থাকলেও এই ঘটনাটি পাকিস্তানকে সরিয়ে দিয়ে ভারতীয় জনপরিসরে চিনকে প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরে। যদিও বর্তমানে সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল, তবে বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দু’টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী এই দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব অব্যাহত রয়েছে, যা জ্বালানি নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশাধিকারের মতো অভিন্ন উদ্বেগের বিষয়ে ঐকমত্যের সম্ভাবনাকে সীমিত করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কিন্তু আপাতত এর উপস্থিতি বজায় থাকবে বলেই আশা করা হচ্ছে, যা বর্তমান সঙ্কটের আংশিক কারণ মার্কিন কর্মকাণ্ড হওয়া সত্ত্বেও এশীয় শক্তিগুলিকে সাময়িক ভাবে আশ্বস্ত করবে।
ভবিষ্যতে এশীয় অর্থনীতিগুলি মধ্যপ্রাচ্যে আরও জোরালো ও কৌশলগত উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হতে পারে। এই রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি অতীতে বিভিন্ন কারণে ও ভিন্ন ভিন্ন সক্ষমতায় আঞ্চলিক সংঘাতের ভেতরে ও আশপাশে বাহিনী মোতায়েন করেছে। ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও মার্কিন শক্তি অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একচ্ছত্র আধিপত্যকারী শক্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কিন্তু আপাতত এর উপস্থিতি বজায় থাকবে বলেই আশা করা হচ্ছে, যা বর্তমান সঙ্কটের আংশিক কারণ মার্কিন কর্মকাণ্ড হওয়া সত্ত্বেও এশীয় শক্তিগুলিকে সাময়িক ভাবে আশ্বস্ত করবে। দীর্ঘমেয়াদে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরতা স্থিতিশীল না-ও হতে পারে, যা বর্তমান সংঘাতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। এই পরিস্থিতি একটি ‘এশীয় ঐকমত্য’ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে একাধারে একটি চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন হল, কোন রাষ্ট্রগুলি এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দেবে এবং এশিয়া সম্মিলিত ভাবে এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চাহিদা মেটাতে পারবে কি না।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ওআরএফ মিডল ইস্ট-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.