কৃষি তথ্য এবং সম্প্রসারণ পরিষেবাগুলিতে উন্নত প্রবেশাধিকার ভারতের নারী কৃষকদের ক্ষমতায়ন করতে পারে, যা লিঙ্গ সমতা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা উভয়কেই শক্তিশালী করবে।
বিশ্বব্যাপী নারী কর্মসংস্থান অংশগ্রহণের হারের দিক থেকে ভারত অন্যতম সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। ভারতে কর্মশক্তির মাত্র ২৯ শতাংশ নারী। গবেষকরা এই কম নারী অংশগ্রহণের হারের পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। শ্রমের কঠোর লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের কারণে নারীদের উপর পরিচর্যার বেশির ভাগ দায়িত্ব বর্তায় (যেমন শিশু ও বয়স্কদের যত্ন, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, রান্নাঘরের বাগান পরিচর্যা এবং সেলাইয়ের কাজ), ফলে বাড়ির বাইরে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করার জন্য তাঁদের হাতে খুব কম সময় থাকে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিনীতিও নারীদের বাড়ির বাইরে কাজ খোঁজা থেকে বিরত রাখে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষা বা কর্মসংস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নারী ও মেয়েদের প্রায়শই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়, কিছু কাজ নারীদের জন্য অনুপযুক্ত বলে মনে করা হয় এবং তাঁরা বাড়ির বাইরে কতটা সময় কাটাতে পারবেন, তার উপরও বিধিনিষেধ থাকে। উপরন্তু, অর্থনীতিতে সামগ্রিক ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কম হওয়ায় নারীদের জন্য শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
শ্রমের কঠোর লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের কারণে নারীদের উপর পরিচর্যার বেশির ভাগ দায়িত্ব বর্তায়। ফলে বাড়ির বাইরে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করার জন্য তাঁদের হাতে খুব কম সময় থাকে।
চিত্র ১: ভারতে কৃষি, শিল্প এবং পরিষেবা খাতে নারী কর্মসংস্থানের বণ্টন (১৯৯১-২০২৩)

উৎস: বিশ্বব্যাঙ্ক তথ্যভাণ্ডার
তবে এমন একটি খাত রয়েছে যেখানে নারীরাই প্রধান, আর তা হল কৃষি। ভারতের কৃষি খাত নারী শ্রমশক্তির উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল। ২০২৩-২৪ সালে কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের অংশ ছিল প্রায় ৬৪.৪ শতাংশ, যা পুরুষদের অংশগ্রহণের ৩৬.৩ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি। কৃষিক্ষেত্রে নারীদের এই আধিপত্যকে প্রায়শই গবেষণাপত্রে ‘ভারতীয় কৃষির নারীমুখীকরণ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। চিত্র ১ থেকে দেখা যায় যে, ভারতে কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্ত নারীর শতাংশ ১৯৯১ সালের ৭৮ শতাংশ থেকে ২০১৯ সালে ৫৪ শতাংশে ধারাবাহিক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবে ২০১৯ সালের পর এই শতাংশে একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে। অনেক অর্থনৈতিক গবেষণা কৃষিক্ষেত্রে নারী কর্মসংস্থানের এই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে কোভিড-১৯ অতিমারি থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্য ও আর্থিক সঙ্কটকে দায়ী করেছে। নন্দা, এম. এবং ঘোষ, এস. (২০২৫) এবং লেডার, এস.-এর (২০২২) মতো গবেষণাগুলি কৃষির নারীমুখীকরণকে পুরুষদের অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, চিরাচরিত লিঙ্গগত প্রথাগুলি এখনও নারীদের অবস্থানকে সীমিত করে রেখেছে। কৃষি কাজে পুরুষ ও নারীরা সাধারণত ভিন্ন ভিন্ন কাজ করে থাকে। নারীরা প্রধানত বীজ বপন, চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, খামার পরিষ্কার, ফসল কাটা, সেচ, উৎপাদিত ফসল পরিষ্কার এবং সংরক্ষণের সঙ্গে জড়িত। এই কাজগুলি জটিল ও সময়সাপেক্ষ এবং চাষাবাদ ও ফসল তোলার পরবর্তী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ধরনের কাজগুলো সাধারণত হাতেই করা হয়।
কৃষিকাজে নিয়োজিত গ্রামীণ নারীদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশের নামে জমির মালিকানার দলিল রয়েছে।
কৃষিক্ষেত্রে নারীদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আয়ের ক্ষেত্রে নারীরা খুব কমই স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেন। কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরাও তাঁদের পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় কম মজুরি পান। অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষ বলেন, কৃষিক্ষেত্রে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও, তাঁদের কৃষক হিসেবে খুব কমই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কৃষিকাজে নিয়োজিত গ্রামীণ নারীদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশের নামে জমির মালিকানার দলিল রয়েছে। এমনকি জমির মালিকানার যৌথ নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও ঘোষ মনে করেন যে, প্রকৃত জমির ওপর নারীদের নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই বললেই চলে। নারী কৃষকরা কৃষকদের জন্য তৈরি সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধা পুরোপুরি পেতেও ব্যর্থ হন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে রবি (শীতকালীন) ফসলের জন্য প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনায় নারীদের অংশ ছিল মাত্র ১৬ শতাংশ। যোগ্যতার অন্যতম একটি শর্ত হল একটি বৈধ ও অনুমোদিত জমির মালিকানার সনদ বা একটি বৈধ ভূমি ইজারা চুক্তি থাকা। এই শর্তটি ফসল বিমার আওতায় নারীদের অধিকারের সুযোগকে সীমিত করে দেয়।
নারী কৃষকদের শক্তিশালী করা একটি দ্বৈত উদ্দেশ্য সাধন করে। কারণ কৃষিখাতই কর্মজীবী নারীদের সবচেয়ে বড় অংশকে (চিত্র ১) কর্মসংস্থান দেয় এবং নারী শ্রমশক্তির উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল। প্রথমত, লিঙ্গ বৈষম্য কমানোর উদ্যোগগুলি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। দ্বিতীয়ত, এটি কৃষি খাতকে শক্তিশালী করে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
নারী কৃষকদের শক্তিশালী করা একটি দ্বৈত উদ্দেশ্য সাধন করে। কারণ কৃষিখাতই কর্মজীবী নারীদের সবচেয়ে বড় অংশকে (চিত্র ১) কর্মসংস্থান দেয় এবং নারী শ্রমশক্তির উপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল।
নারী কৃষকদের মধ্যে বিমার কভারেজ বাড়ানোর জন্য যোগ্যতার মানদণ্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যেমন জমির মালিকানার দলিল নির্বিশেষে কৃষককে বিমা কভারেজের আওতাভুক্ত করা। একটি প্রাথমিক সমীক্ষা নারী কৃষকদের জন্য বিমা কভারেজের সঙ্গে সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জগুলি সম্পর্কে গভীরতর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করতে পারে। বিকল্প ভাবে, নারীদের জন্য জমির মালিকানা সুরক্ষিত করার জন্য আরও বেশি প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে, ভারত রুয়ান্ডার পদ্ধতিগত ভূমি নিবন্ধন কর্মসূচি (২০০৯-২০১৩) থেকে শিক্ষা নিতে পারে, যা দেশটির প্রায় ১৯ শতাংশ কৃষি জমি নারীদের নামে একক ভাবে এবং ৪৯ শতাংশ যৌথ ভাবে নিবন্ধন করেছিল। এই কর্মসূচি জমির মালিকানা নিয়মিতকরণের মাধ্যমে নারীদের ভূমি স্বত্ব সুরক্ষিত করেছিল। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি উন্মুক্ত কোর্সে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কর্মসূচিটির মূল্যায়নের জন্য সাক্ষাৎকার এবং লক্ষ্যনির্দিষ্ট গ্রুপে আলোচনার সময় নারীরা জানিয়েছেন যে, তাঁরা নিজেদেরকে আরও বেশি ক্ষমতায়িত মনে করছেন, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের প্রভাব বেড়েছে এবং ব্যাঙ্ক ঋণ চাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী বোধ করছেন।
ভূমি মালিকানাধীন পরিবারগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, শ্রম বিভাজন এবং বাজার সম্পৃক্ততা সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক কাঠামো দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত হয়। এই স্তরগুলিতে হস্তক্ষেপের জন্য একটি গভীর, দীর্ঘমেয়াদী এবং আরও পদ্ধতিগত পদ্ধতির প্রয়োজন। তবে ছোট পদক্ষেপগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং কৃষিক্ষেত্রে নারীদের শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অবদান রাখার সম্ভাবনা রাখে। একটি ছোট পদক্ষেপ হল নারী কৃষকদের জন্য তথ্য প্রাপ্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যার জন্য একটি বহুমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন। যেমন:
১. ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে কৃষি-সম্পর্কিত তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং বোঝার জন্য নারীদের শিক্ষিত করা: কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাস পরিষেবার মতো তথ্য পরিষেবাগুলি মোবাইল ফোন এবং ওয়েবসাইটের মতো ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে উপলব্ধ। নারী কৃষকদের পড়ার ক্ষমতা এবং মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার সিস্টেমে তাঁদের প্রবেশাধিকার একটি উদ্বেগের বিষয়। কৃষি-সম্পর্কিত তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং বোঝার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নারী কৃষকদেরকে জ্ঞাত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে ক্ষমতায়িত করে।
২. নারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের জড়িত করা: প্রাথমিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটি সমীক্ষা ইঙ্গিত দেয় যে সরকারের কৃষি পরিষেবাগুলিতে পুরুষ কর্মীর প্রাধান্য রয়েছে। প্রচলিত লিঙ্গগত রীতিনীতির কারণে এটি প্রায়শই নারী কৃষক এবং সম্প্রসারণ কর্মীদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া হ্রাস করে। নারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীরা নারী কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য আরও ভাল অবস্থানে থাকতে পারেন।
৩. নারী কৃষকদের একটি যোগাযোগের তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা: যদি জনসাধারণের সভার মাধ্যমে কৃষি তথ্য ভাগ করা হয়, তবে চলাচলের সীমাবদ্ধতা নারী কৃষকদের জন্য একটি বাধা হতে পারে। এই তথ্যভাণ্ডারটি সম্প্রসারণ কর্মীদের নারী কৃষকদের ছোট ছোট গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সহায়তা করবে।
৪. বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স: কৃষকদের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণ কোর্স এবং সভার ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই রয়েছে, যা সাধারণত রাজ্য কৃষি বিভাগ, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র (কেভিকে) এবং রাজ্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি দ্বারা পরিচালিত হয়। নারী কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কোর্স ও সভাগুলোকে সাজানো এবং তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ উদ্যোগের উদাহরণও রয়েছে। যেমন, বেটার লাইফ ফার্মিং অ্যালায়েন্স (বিএলএফএ) প্রশিক্ষিত নারী ক্ষুদ্র কৃষক দ্বারা পরিচালিত ১২টি কমিউনিটি সেন্টার পরিচালনা করে, যা সহকর্মী ক্ষুদ্র কৃষকদের সম্প্রসারণ পরিষেবা এবং উপকরণ সরবরাহ করে।
ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষিখাতের অবদান হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৫-২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট এই খাতের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন করে আশা জাগিয়েছে। এই আশার মধ্যেই নিহিত রয়েছে কৃষিক্ষেত্রে প্রধান কর্মশক্তি নারীদের ক্ষমতায়ন। সামনের পথ হল কৃষিসংক্রান্ত তথ্য সকল নারী কৃষকের কাছে পৌঁছানো এবং তাঁরা যেন তা কার্যকর ভাবে বুঝতে পারেন, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করা। তথ্যপ্রাপ্ত নারী কৃষকরা যেন নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে এবং আরও ভাল সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন।
মঞ্জুশ্রী ব্যানার্জি ২০০২ সাল থেকে শক্তি রূপান্তর, কৃষি অর্থনীতি এবং স্থিতিশীল উন্নয়ন ক্ষেত্রে একজন অনুশীলনকারী ও গবেষক হিসেবে কাজ করছেন।
নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখক(দের) ব্যক্তিগত।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Manjushree Banerjee was associated with the Social Transformation Division of The Energy and Resources Institute (TERI) for ten years. In total she possesses about fifteen ...
Read More +