Expert Speak Raisina Debates
Published on Jan 28, 2026 Updated 0 Hours ago

চিন অস্বস্তির চোখে দেখছে ভারত ও তাইওয়ানের মধ্যে গভীর হতে থাকা বাণিজ্য, শ্রম প্রযুক্তিগত সহযোগিতাযা নয়াদিল্লির সঙ্গে চিনের সম্পর্কের সতর্কতাপূর্ণ উন্নতির মধ্যে বেজিংয়ের লাল রেখাগুলিকে পরীক্ষা করছে। 

ভারত-তাইওয়ান সম্পর্ককে অস্বস্তির চোখে দেখছে চিন

২০২৫ সালের আগস্ট মাসে চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই ভারত সফর করেন এবং ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে ২৪তম বিশেষ প্রতিনিধি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই পক্ষ সীমান্ত সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটি ইতিবাচক গতি সঞ্চার করে।

তবে, আলোচনা ইতিবাচকভাবে শেষ হলেও, ‘তাইওয়ান’ ইস্যুতে চিন ও ভারতের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশ্য বিবাদ অপ্রত্যাশিতভাবে এই বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। চিনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয় ভারত স্পষ্টভাবে বলেছে যে, ‘তাইওয়ান চিনের একটি অংশ’। তবে, পরে ভারতীয় কর্মকর্তারা দ্রুত স্পষ্ট করে দেন যে তাইওয়ানের বিষয়ে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তাঁরা জোর দিয়ে বলেন যে ভারত তাইওয়ানের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত এবং সাংস্কৃতিক সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। এই ঘটনাটি চিনে জনরোষের সৃষ্টি করে। তা সত্ত্বেও, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ৭ বছরের মধ্যে চিনে প্রথম সফরকে সম্মান জানাতে এবং আসন্ন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য তখন  দ্রুত এই পরিস্থিতি শান্ত করা হয়।

চিনা কৌশলগত মহলের মধ্যে এই ধারণা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে যে, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সীমারেখা বজায় রেখেও গত কয়েক বছরে ভারত-তাইওয়ান সম্পর্কের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।



চিন-ভারত সম্পর্কের কথিত ‘সদ্ভাবের’ সময়ে চিনা পক্ষের তাইওয়ান ইস্যুটি উত্থাপন করা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চিনা কৌশলগত মহলের মধ্যে এই ধারণা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে যে, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সীমারেখা বজায় রেখেও গত কয়েক বছরে ভারত-তাইওয়ান সম্পর্কের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। চিনা গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে তুলে ধরা হচ্ছে যে, স্বার্থের অভিন্নতা কীভাবে ভারত ও তাইওয়ানকে একাধিক ক্ষেত্রে একত্রিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, গত দুই বছরে ভারত-তাইওয়ান বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে তা ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই বৃদ্ধির বেশিরভাগই ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ এবং ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল সরঞ্জামের মতো উচ্চ মূল্য-সংযোজিত পণ্যের ক্ষেত্রে হয়েছে, যার মধ্যে সেমিকন্ডাক্টরই প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তাইওয়ানি কোম্পানিগুলিও ভারতে তাদের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। চিনা পণ্ডিতরা যুক্তি দেন যে, ভারত-তাইওয়ান অর্থনৈতিক সহযোগিতা একদিকে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যকে ধীরে ধীরে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছে, অন্যদিকে তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি উন্নত করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার কার্যক্রমের পরিধি প্রসারিত করেছে।

বাণিজ্য ছাড়াও, দুই পক্ষ মানবসম্পদ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তৎপরতা শুরু করেছে। চলতি বছরের শুরুতে একটি শ্রম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার অধীনে প্রায় ৫,০০০ ভারতীয় শ্রমিক তাইওয়ানে কাজ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা সত্ত্বেও, উভয় পক্ষ এই চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে, কারণ এটি উভয়ের জন্যই উপকারী — একদিকে এটি তাইওয়ানের শ্রমিকের ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করবে এবং অন্যদিকে ভারতের জন্য রেমিট্যান্স নিয়ে আসবে।

গত এক বছরে ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ইতিবাচক প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও,  ভারত ও তাইওয়ানের মধ্যে উচ্চ-পর্যায়ের আদান-প্রদান যেভাবে অব্যাহত রয়েছে, তা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে-কে সরাসরি উত্তর দেন, যিনি এক্স সোশ্যাল মিডিয়া  প্ল্যাটফর্মে মোদীকে তাঁর টানা তৃতীয় নির্বাচনী বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। মোদী তাঁর তৃতীয় মেয়াদে ভারত ও তাইওয়ানের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। আবার, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারত-চিন সীমান্ত আলোচনার সময়ও ভারত ও তাইওয়ানের মধ্যে সিনিয়র পর্যায়ে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক মতবিনিময় অব্যাহত ছিল। কিছুকাল আগে, মে ২০২৫ সালের তীব্র ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের মধ্যে, চিনা সংবাদপত্রগুলি এই খবরে সরগরম ছিল যে ভারত ইলেকট্রনিক্স, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্ষেত্রে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করার জন্য তাইওয়ানে অন্তত চারটি ভারতীয় রাজ্যের (তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং কর্ণাটক ) সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ‘এযাবৎ কালের বৃহত্তম’ একটি সরকারি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে। এটি লক্ষ্য করা হয়েছে যে এটি একটি নতুন প্রবণতার সূচনা করেছে, যেখানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তুলনামূলকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে এবং স্থানীয় সরকারগুলি তাইওয়ানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। এই ‘রাজ্য-স্তরের মিথস্ক্রিয়া’ মডেলটি তাইওয়ান-সম্পর্কিত বিষয়গুলি পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারতের অতীতের প্রচলিত প্রথাগুলিকে ভেঙে দিয়েছে।


চিনের অনেকেই বিশ্বাস করেন যে ভারত ও তাইওয়ানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হওয়াটা শুধুই সময়ের ব্যাপার।



এই প্রবণতাগুলির পরিপ্রেক্ষিতে, চিনের অনেকেই বিশ্বাস করেন যে ভারত ও তাইওয়ানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হওয়াটা শুধুই সময়ের ব্যাপার। চিনের কৌশলগত মহল বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন যে ভারতীয় কৌশলবিদরা কীভাবে তাইওয়ান প্রণালীর ঘটনাবলিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে শুরু করেছেন। চিন লক্ষ্য করেছে যে ভারতীয় কৌশলবিদদের দৃষ্টিতে, তাইওয়ান প্রণালী ইস্যুটি একটি ‘দূরবর্তী বিষয়’ থেকে সরে এসে এমন একটি বাস্তব কারণ হয়ে উঠেছে, যা ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। চিন এও স্বীকার করে যে ভারতে এমন একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে যারা বিশ্বাস করে যে বেজিংয়ের পাকিস্তানকে সমর্থনের ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে নয়াদিল্লির উচিত তাইওয়ানকে ‘পারস্পরিকভাবে সমর্থন’ করা এবং তার প্রতিরক্ষা জোরদার করা। কিছু চিনা পণ্ডিত যুক্তি দেন যে তাইওয়ানের প্রতি ভারতের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা তেমনই, যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক সময় তার ‘তাইওয়ান কার্ড’ ব্যবহার করেছিল — প্রথমে পরিস্থিতি বোঝার জন্য নিম্ন-স্তরের কর্মকর্তাদের সফরের মাধ্যমে শুরু করে, তারপর অনানুষ্ঠানিক আদান-প্রদান এবং অবশেষে অস্ত্র বিক্রি ও প্রতিরক্ষা সহায়তার দিকে অগ্রসর হওয়া।

চিনাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তাইওয়ান ইস্যুতে ভারতের কৌশল হল একটি অস্পষ্ট কূটনৈতিক বাগধারা — যা একদিকে ‘এক-চিন নীতি’কে স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ করে না, আবার অন্যদিকে তাইপের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেও অস্বীকার করে না — বজায় রাখার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা সর্বোচ্চ করা এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে একটি ধূসর অঞ্চলে ‘নমনীয়ভাবে’ পথ চলার চেষ্টা। তবে চিনের জন্য চ্যালেঞ্জ হল, যতক্ষণ পর্যন্ত ‘আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি’ এবং ‘সামরিক জোট’-এর মতো সীমাগুলি অতিক্রম না-‌করা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের কৌশলের প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, সীমান্ত সমস্যা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি সহ ভারতের বিরুদ্ধে চিনের প্রভাব বিস্তারের বেশ কিছু  সুযোগ রয়েছে। তবে, একটি জটিল বাহ্যিক পরিস্থিতির মুখে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন এবং চলতি চিন-মার্কিন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে, চিনে অনেকেই মনে করেন যে, চিন-ভারত সম্পর্কের ইতিবাচক গতিকে তাঁদের ভাষায় ‘‌সীমা পার হয়ে যাওয়া উস্কানি’‌ দিয়ে ব্যাহত করা উচিত নয়।


চিনাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তাইওয়ান ইস্যুতে ভারতের কৌশল হল একটি অস্পষ্ট কূটনৈতিক বাগধারা — যা একদিকে ‘এক-চিন নীতি’কে স্পষ্টভাবে চ্যালেঞ্জ করে না, আবার অন্যদিকে তাইপের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেও অস্বীকার করে না — বজায় রাখার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা সর্বোচ্চ করার এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে একটি ধূসর অঞ্চলে ‘নমনীয়ভাবে’ পথ চলার চেষ্টা।


সুতরাং, চিনা কৌশল হল মূলত প্রচারণার ক্ষেত্রে তাইওয়ানকে লক্ষ্যবস্তু করা। বেজিং এই ধারণা প্রচার করে যে ভারতে বিনিয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, এবং তারা বোঝাতে চায় যে ভারতের পরিকাঠামো দুর্বল এবং বিনিয়োগের পরিবেশ অনুপযুক্ত। তারা চিনের মূল ভূখণ্ডে শক্তিশালী উপস্থিতি থাকা তাইওয়ানি কোম্পানিগুলিকেও হুমকি দেয় এবং ভারতে বড় ধরনের পদক্ষেপ না করার জন্য সতর্ক করে বলে যে, অন্যথায় পরিণতির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

সামগ্রিকভাবে, কূটনৈতিক সীমারেখার মধ্যেই নয়াদিল্লি এবং তাইপের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা চিনে তার দুই-ফ্রন্ট সংকট নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে — যা চিনা সামরিক চিন্তাভাবনায় প্রায়শই একটি নিষিদ্ধ বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়। এই দুই-ফ্রন্ট চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে না তোলার জন্য চিনকে ভিন্নভাবে কী করতে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সর্বোপরি, ২০১০ সালে অরুণাচল প্রদেশের ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য চিনের 'স্টেপলড ভিসা' জারির ঘটনাই ভারতকে 'এক চিন' নীতিটি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছিল, এবং তারপর থেকে ভারত চিন-ভারত যৌথ বিবৃতিতে এই নীতির পুনরাবৃত্তি করেনি।


অন্তরা ঘোষাল সিং অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের একজন ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Author

Antara Ghosal Singh

Antara Ghosal Singh

Antara Ghosal Singh is a Fellow at the Strategic Studies Programme at Observer Research Foundation, New Delhi. Her area of research includes China-India relations, China-India-US ...

Read More +