চিনের ইউএলবি ঋণ সঙ্কট দর্শায় যে, ভারতীয় শহরগুলিকে অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে গেলে কী কী এড়িয়ে চলতে হবে।
চিনের অসাধারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি মূল উপাদান ছিল দেশটির স্থানীয় সরকারগুলির - প্রাদেশিক সরকার এবং আরবান লোকাল বডিজ বা স্থানীয় নগর-সংস্থা (ইউএলবি) - বিশাল অবকাঠামোগত প্রচেষ্টা। এমনটা সম্ভব হয়েছে চিনা সরকারের রাজস্ব নীতি সমর্থন ও বিনিয়োগ পরিবেশের মাধ্যমে, যা স্থানীয় সরকারগুলিকে (এলজি) অবকাঠামোগত অর্থায়ন এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ঋণ উপকরণ ব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়।
যাই হোক, ঋণ-চালিত কৌশলটি অসামঞ্জস্যতাকেই দর্শায়: অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল স্থানীয় সরকারগুলি কম মোট দেশজ উৎপাদনসম্পন্ন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির অঞ্চলগুলিতে প্রায়শই তুলনামূলক ভাবে সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলির তুলনায় বেশি ঋণ নেয়। তবুও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে বেশির ভাগ স্থানীয় সরকার উদার ভাবে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে যায়।
ঋণ-চালিত কৌশলটি অসামঞ্জস্যতাকেই দর্শায়: অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল স্থানীয় সরকারগুলি কম মোট দেশজ উৎপাদনসম্পন্ন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির অঞ্চলগুলিতে প্রায়শই তুলনামূলক ভাবে সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলির তুলনায় বেশি ঋণ নেয়। তবুও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে বেশির ভাগ স্থানীয় সরকার উদার ভাবে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে যায়।
তারা যে প্রাথমিক ঋণ সরঞ্জামটি ব্যবহার করত, তা ছিল স্থানীয় সরকার অর্থায়ন ব্যবস্থা (এলজিএফভি)। বাজার-ভিত্তিক, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থাগুলিকে স্থানীয় সরকারগুলির পক্ষে ঋণ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হত। স্থানীয় সরকারগুলির লিকুইডিটির সীমা ছিল এবং তাদের নিজস্ব ব্যালান্স শিটে ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা খুব কম ছিল। এমনটা হত মূলত বেজিংয়ের ১৯৯৪ সালের আর্থিক সংস্কারের কারণে, যা কর রাজস্বে তাদের অংশ প্রায় ৭৮ শতাংশ থেকে প্রায় ৫০ শতাংশে হ্রাস করেছিল। পরিবর্তে তারা সরকারি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য তহবিল সংগ্রহে এলজিএফভি-র দিকে ঝুঁকেছিল। এই আর্থিক ব্যবস্থা আর্থিক সঞ্চালনকে উৎসাহিত করলেও ইউএলবি তাদের দুর্বল ব্যালান্স শিটে ঋণ নিতে পারত না এবং ফলস্বরূপ তাদের বাইরে থেকে ঋণ নিতে হত। এর ফলে ঋণ অস্বচ্ছতার দরুন গুরুতর, নেতিবাচক আর্থিক পরিণতি অবশ্যম্ভাবী ছিল।
কার্যকৌশল খানিক ছিল এই রকম: স্থানীয় সরকারগুলি এলজিএফভি-কে তাদের জমি বিনামূল্যে প্রদান করত। এলজিএফভি তখন এগুলি ডেভেলপারদের কাছে বিক্রি করত অথবা বন্ড জারি করার মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহের জন্য জামানত হিসেবে ব্যবহার করত। সংগৃহীত অর্থ অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হত, যা স্থানীয় জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখত। তবে অনেক অবকাঠামো প্রকল্প যথাযথ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বা সম্ভাব্যতার অভাবে অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, চিনের দরিদ্রতম প্রদেশগুলির মধ্যে অন্যতম গুইঝোউ ১,০০০টিরও বেশি নতুন সেতু নির্মাণ করেছে, যার মধ্যে অনেকগুলিই ছিল প্রকৌশলগত বিস্ময়। দুর্ভাগ্যবশত, এই সেতুগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি অপ্রয়োজনীয় ছিল এবং স্থানীয় জিডিপিতে অবদান রাখতে বা কোনও অর্থনৈতিক মুনাফা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
বেজিংয়ের ক্রমবর্ধমান রিয়েল এস্টেট বাজার এবং আকর্ষণীয় জমির মূল্যের সঙ্গে সঙ্গে ঋণও বৃদ্ধি পেয়েছে। জমি লিজ বিক্রি থেকে স্থানীয় সরকারগুলির রাজস্ব ২০১৬ সালে ৩.৮৪ ট্রিলিয়ন ইয়েন থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৮.৭১ ট্রিলিয়ন ইয়েনে উন্নীত হয়েছে। তবে রিয়েল এস্টেট বাজার ধসে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২১ সালের পরে চাহিদা হ্রাস পায় ও স্থানীয় সরকারগুলির জন্য রাজস্ব প্রবাহ তীব্র ভাবে হ্রাস পায়। ২০২২ সালে এলজি রাজস্ব ৬.৬৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন এবং ২০২৩ সালে ৫.৫৪ ট্রিলিয়ন ইয়েনে নেমে আসে। এর পাশাপাশিই এলজিএফভি দ্বারা জারি করা বন্ডগুলি ম্যাচিওর হতে শুরু করে, যার ফলে পরিশোধের বোঝা ২০১৪ সালে ৩.৩ বিলিয়ন ইয়েন থেকে ২০২৪ সালে ৪.৭ ট্রিলিয়ন ইয়েনে উন্নীত হয়। স্থানীয় সরকারগুলি স্পষ্টতই অস্থিতিশীল ঋণ নিয়েছিল এবং তাদের পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আর পূরণ করতে পারেনি।
এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও চিনা সরকার দেশের আর্থিক কাঠামোর উপর একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ঋণ পুনর্গঠন, বন্ড রোলওভার এবং অবশেষে তাদের পরিশোধ করে সঙ্কট পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ‘লুকোনো ঋণ প্রতিরোধ ও সমাধানের জন্য প্রাদেশিক স্তরের সরকারগুলির দায়িত্ব সুসংহত করা, বকেয়া ঋণ নিষ্পত্তির প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করা… এবং লুকোনো ঋণের বৃদ্ধি দৃঢ় ভাবে রোধ করা প্রয়োজন।’ চিন ইতিমধ্যেই এই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। স্থানীয় ঋণের এই পাহাড়প্রমাণ চাপের ফলে তাদের জাতীয় অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও অমূলক নয়।
এলজি-দের মোট এলজি ঋণের বোঝার সরকারি হিসাব নিরূপণ করা কঠিন। কারণ বেশির ভাগই সরকারি ব্যালান্স শিটে প্রতিফলিত হয়নি। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ৮.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার; আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আনুমানিক পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অস্থিতিশীল ঋণের পরিণতি এখন দৃশ্যমান। চিনের দশ লক্ষেরও বেশি জনসংখ্যাসম্পন্ন প্রিফেকচার শহর হেগাং-এ অভ্যন্তরীণ চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে, সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা চাকরি হারাচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত কর্মীরা বেতন পাচ্ছেন না। হেইলংজিয়াং, হেনান, হুবেই, গুইঝো এবং গুয়াংডং-এ একই রকম দুর্দশা দেখা যাচ্ছে এবং প্রাদেশিক সরকার ও ইউএলবি-সহ সকলেই ঋণের দুর্দশার পরিণতি ভোগ করছে।
এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও চিনা সরকার দেশের আর্থিক কাঠামোর উপর একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ ঋণ পুনর্গঠন, বন্ড রোলওভার এবং অবশেষে তাদের পরিশোধ করে সঙ্কট পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ‘লুকোনো ঋণ প্রতিরোধ ও সমাধানের জন্য প্রাদেশিক স্তরের সরকারগুলির দায়িত্ব সুসংহত করা, বকেয়া ঋণ নিষ্পত্তির প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করা… এবং লুকোনো ঋণের বৃদ্ধি দৃঢ় ভাবে রোধ করা প্রয়োজন।’ চিন ইতিমধ্যেই এই লক্ষ্যে পদক্ষেপ করেছে। স্থানীয় ঋণের এই পাহাড়প্রমাণ চাপের ফলে তাদের জাতীয় অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও অমূলক নয়।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ভারতীয় ইউএলবিগুলির অনেক কিছু শেখার আছে।
প্রথমত, ভারতীয় ইউএলবিগুলি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং নগরায়ণের শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। জাতীয় জিডিপিতে তাদের অবদান প্রায় ৬০ শতাংশেই আটকা পড়েছে। জাতীয় ও রাজ্য সরকারগুলি ইউএলবিগুলিকে প্রয়োজনীয় আর্থিক উপকরণ ও বাজারে অর্থ সংগ্রহের জন্য তাদের সম্পদ ব্যবহার করার স্বাধীনতা প্রদান করলে এটি তীব্র ভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে এটি তাদের ব্যালান্স শিটের শক্তির উপর ভিত্তি করে করা উচিত, শুধু মাত্র তাদের উপর নির্ভর করে নয়। এই পরিবর্তনটি ঘটানোর জন্য ভারত সরকারকে ইউএলবিগুলির আর্থিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। এ কথা স্পষ্ট যে, বাজারগুলি দুর্বল ক্রেডিট রেটিং এবং কম পরিশোধ ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থার প্রতি সাড়া দেয় না।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক অবদান মূল্যায়ন না করলে অবকাঠামো নির্মাণ বিপরীতমুখী ও মুদ্রাস্ফীতিমূলক হবে। ভারতীয় শহরগুলিতে প্রচুর অবকাঠামোগত সুযোগ থাকলেও অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের ফলে অপচয় ও মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায়, যার ফলে গুরুতর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয়।
তৃতীয়ত, ঋণের সীমা অপরিহার্য। ঋণ গ্রহণ অবশ্যই স্থিতিশীল সীমার মধ্যে রাখতে হবে এবং একটি ইউএলবি কত পরিমাণে ও কোন শর্তে ঋণ নিতে পারবে, তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য স্পষ্ট ভাবে সংজ্ঞায়িত নিয়ম থাকতে হবে।
তবুও উপরে উল্লিখিত এই সতর্কতাগুলি এখনও এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারে না যে, চিন বিশ্বমানের অবকাঠামো তৈরিতে এবং নগরায়ণে বিশাল গতি প্রদানে স্থানীয় সরকারগুলিকে চমৎকার ভাবে সমন্বিত করেছে। এই প্রক্রিয়ার ত্রুটিগুলি একটি যত্নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দর্শালেও এ কথাও স্বীকার করে নিতে হবে যে, দেশ গঠনে ইউএলবিগুলির সুবিশাল ভূমিকা রয়েছে। ভারত সরকার এবং রাজ্য সরকারগুলিকে তাদের ইউএলবিগুলিকে সশক্ত করতে হবে এবং এই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তাদের সঙ্গে শক্তিশালী ও সর্বাত্মক অংশীদারিত্বে সম্পৃক্ত হতে হবে।
রমানাথ ঝা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr. Ramanath Jha is Distinguished Fellow at Observer Research Foundation, Mumbai. He works on urbanisation — urban sustainability, urban governance and urban planning. Dr. Jha belongs ...
Read More +