Published on Dec 24, 2025 Updated 0 Hours ago

চিনের সাম্প্রতিকবৈশ্বিক উদ্যোগ’-এর ঢেউ বহুমুখী সহযোগিতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে আকৃষ্ট করে, এবং বেজিংকে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্থপতি হিসেবে তুলে ধরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছে।

চিনের ‘বৈশ্বিক উদ্যোগ’ এবং বিশ্বব্যবস্থা পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা

ভূমিকা

চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-‌ শীর্ষ সম্মেলনে একটি নতুন ‘‌বৈশ্বিক উদ্যোগ’‌ উন্মোচন করেছেন, যাকে দেশগুলোকে একটি ‘‌আরও ন্যায়সঙ্গত সমতাপূর্ণ বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার’‌ জন্য একত্রিত হওয়ার আহ্বান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মূল বক্তৃতায় শি বর্তমান সময়কে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং একটিনতুন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তিনি ঠান্ডা যুদ্ধের মানসিকতা, আধিপত্যবাদ এবং সংরক্ষণবাদকে বৈশ্বিক সম্পর্কের সহযোগিতামূলক প্রকৃতিকে দুর্বলকারী শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে চিন নিজেকে শান্তি, নিরাপত্তা এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থা গঠনে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। বর্তমান মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা যেভাবে বৃহৎ শক্তিগুলির নিরাপত্তাহীনতায় পর্যবসিত হয়েছে, তার সরাসরি সমালোচনা করে চিন নিজেকে একটি দায়িত্বশীল পক্ষ হিসেবে তুলে ধরছে, যারা রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ মেনে চলার পাশাপাশি বহুপাক্ষিকতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে ইচ্ছুক। এর মাধ্যমে বেজিং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রতি হতাশ দেশগুলোর কাছেও আবেদন জানাতে চাইছে এবং মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক শাসনের বিকল্প উপস্থাপন করছে।

গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ কী?

বর্তমান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেতিনটি ঘাটতি   সম্মুখীন হচ্ছে, সেগুলির কথা উল্লেখ করে একটি সমাধান হিসেবে গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ চালু করা হয়েছে। এই ঘাটতিগুলো হল, বিশেষত, গ্লোবাল সাউথের অপ্রতুল প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা পরিষদের মতো রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্থাগুলোরকর্তৃত্বেরঅবক্ষয়, এবং সবশেষে, বহুপাক্ষিক উদ্যোগগুলির কার্যকারিতা বৃদ্ধির জরুরি প্রয়োজন। আনুষ্ঠানিক ধারণাপত্রে জলবায়ু পরিবর্তন এবং ডিজিটাল বিভাজনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলির উল্লেখ ছিল, যেগুলোর প্রতি জরুরি মনোযোগ প্রয়োজন। রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ এবং বৈশ্বিক শাসন কাঠামো সংস্কারের বৃহত্তর লক্ষ্যকে সমুন্নত রাখার দাবি করে চিন গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ-‌এর মূল ধারণাগুলি প্রস্তাব করে। সামগ্রিকভাবে, এগুলি হল পরস্পর সংযুক্ত কিছু নীতি যা রাষ্ট্রপুঞ্জের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হয়: সার্বভৌম সমতা, আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্য, ‘বৈশ্বিক শাসনের মৌলিক পথহিসেবে বহুপাক্ষিকতা, এবং সবশেষে, জন-কেন্দ্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে শাসন।

এই বৈশ্বিক উদ্যোগগুলি চিনের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রাধান্য অর্জন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনশীল চাহিদা পূরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।



এটি ২০২১ সালে বোয়াও ফোরামেপরিবর্তনের এক বিশ্বপ্রতিপাদ্যে শি জিনপিং-এর বক্তৃতার সঙ্গে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়, যেখানে তিনি মানবজাতি যেচারটি ঘাটতিরসম্মুখীন হচ্ছে, তা চিহ্নিত করেছিলেন, যথা: শাসন ঘাটতি, আস্থার ঘাটতি, উন্নয়ন ঘাটতি এবং শান্তি ঘাটতি। এই প্রেক্ষাপটে, তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যখন শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল, তখন পশ্চিমী-নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। চার বছর পর, শি-এর চতুর্থ বৈশ্বিক উদ্যোগটি একটি বৈশ্বিক বিকল্পের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য চিনের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দেয়। তবে, ধারণাপত্রটি এই স্পষ্টীকরণের মাধ্যমে শেষ হয়েছে যে, জিজিআই হল চিনের পূর্ববর্তী কাঠামো, যেমন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই) এবং গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই)-এরই একটি সম্প্রসারণ মাত্র।

ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানো

বেজিং এই ‘‌বৈশ্বিক উদ্যোগগুলিকে’‌ এমন ‘‌গণপণ্য’‌ হিসেবে উপস্থাপন করে, যা মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপন করতে চায়। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই জিএসআই চালু করা হয়েছিল, যা রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের নীতিগুলোকে প্রতিফলিত করার পাশাপাশি নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর জোর দেয়। বাস্তবে, জিএসআই শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং স্বৈরাচারী সরকারগুলিকে বাহ্যিক নজরদারি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। ২০২১ সালে চালু হওয়া এবং জিএসআই-এর যমজ হিসেবে পরিচিত জিডিআই ছিল মূলত বৈশ্বিক উন্নয়ন অ্যাজেন্ডার আলোচনাকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে পরিণত করার এবং এটিকে চিনা অভিভাবকত্বের অধীনে নিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে চালু হওয়া জিসিআই আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়, যা চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) মূল্যবোধকে প্রচার করার একটি প্রচেষ্টা ছিল, এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার আলোচনার মূল নীতি থেকে গণতন্ত্র মানবাধিকারের মতো ধারণাগুলোকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে। এর উদ্দেশ্য হল শেষ পর্যন্ত এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য চাপ সৃষ্টি করা, যা স্বৈরাচারী সরকারগুলোকে বন্ধু এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার চেয়ে উন্নত বিকল্প হিসেবে দেখবে, যে ব্যবস্থাটি প্রায়শই ব্যর্থ বলে মনে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে, এই বৈশ্বিক উদ্যোগগুলি চিনের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রাধান্য অর্জন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনশীল চাহিদা পূরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ২০১৩ সালে ঘোষিত শি জিনপিংয়ের প্রধান প্রকল্প, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বেশ কয়েকটি দেশে বাধার সম্মুখীন হয়েছিল, কিন্তু তারপর থেকে এটিকে জিডিআই-এর আওতায় নতুন করে সাজানো হয়েছে। পূর্ববর্তী উদ্যোগগুলোর মতোই, এটিও মূলতজনকেন্দ্রিক’, ‘উদ্ভাবন-চালিতএবংফল-ভিত্তিকউন্নয়নের পুনরাবৃত্তিমূলক বিষয়গুলির উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে বলে মনে হয়। এই পুনরাবৃত্তিগুলো একটি চিরাচরিত চিনা কৌশলকে তুলে ধরে, যা হল নতুন মোড়কে পরিচিত ধারণাগুলোকে বাজারজাত করা এবং একই সঙ্গে এই বৃহত্তর দাবি করা যে বর্তমান মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাঅন্যায্য অগণতান্ত্রিক’, এবং চিনইস্থিতিশীলতার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎস


নিজেকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচয় দিয়ে চিন গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে ব্যাপক সংহতি গড়ে তুলতে এবং চিনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়।



কৌশলগত তাৎপর্য

তার সমস্ত ‘‌বৈশ্বিক উদ্যোগে’‌ চিন রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এর সংস্থাগুলির কেন্দ্রীয় ভূমিকার সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি একাধিকবার পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, সংস্থাটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তারা দীর্ঘদিন ধরে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে উপকৃত হয়েছে। তবে, বেজিং এই কাঠামোর মধ্যে পশ্চিমী আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে এবং প্রায়শই একটি সংস্কারকৃত বৈশ্বিক ব্যবস্থার আহ্বান জানায়। তাই এই উদ্যোগগুলিকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের জন্য প্রতিযোগিতা করার বৃহত্তর চিনা কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। নিজেকে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচয় দিয়ে চিন গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে ব্যাপক সংহতি গড়ে তুলতে এবং চিনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ২০০৪ সাল থেকে, যখন সিসিপি- তরফে রাষ্ট্র-পরিচালিত, নমনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতির বিপরীতেবেজিং কনসেনসাসশব্দটি তৈরি করা হয়েছিল, তখন থেকেই চিনকে পশ্চিম-সমর্থিত ওয়াশিংটন কনসেনসাসের একটি উন্নত বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা চলছে। ২০১৭ সালে ১৯তম পার্টি কংগ্রেসে ভাষণ দেওয়ার সময় শি জিনপিং বলেছিলেন যে, চিন ২০২০ সালের মধ্যে একটি আধুনিক সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, এবং পরামর্শ দিয়েছিলেন যে অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলিরও চিনের মতো একই বৃদ্ধির মডেল গ্রহণ করা উচিত। যদিও ২০২৫ সালে চিনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কোনও সমৃদ্ধির লক্ষণ দেখাচ্ছে না, তবুও চিনকে একটি শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে চিত্রিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, তা শাসনব্যবস্থা, গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব বা বিশ্বের নেতৃত্বযে ক্ষেত্রেই হোক না কেন। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব গ্রহণের আকাঙ্ক্ষার যথেষ্ট ইঙ্গিত চিন দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক সংক্রান্ত খামখেয়ালিপনার মধ্যে, যেখানে তিনি বন্ধু শত্রু উভয়কেই অবজ্ঞার চোখে দেখেন, এটা আশা করা যায় যে চিনেরবৈশ্বিক উদ্যোগগুলিনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং প্রতিপক্ষ উভয়কেই নিজেদের পক্ষে টানার জন্য আরও প্রসারিত হবে, যদি না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নেতৃত্ব অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে।



ডঃ শ্রীপর্ণা পাঠক পি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির চিন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর নর্থইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।

উপমন্যু বসু মানব রচনা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন সহকারী অধ্যাপক।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.