ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিবাদ ভারত মহাসাগরের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক পরীক্ষা হয়ে উঠছে।
দিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাজ্য-মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ভবিষ্যতের চেয়েও চাগোস দ্বীপপুঞ্জ বিরোধের আঞ্চলিক প্রভাব অনেক বেশি। বিতর্কিত দ্বীপগুলির সার্বভৌমত্ব নিয়ে একটি চুক্তির জন্য মরিশাস যুক্তরাজ্যের সমর্থন আদায় করেছে – কিন্তু জটিলতা বিস্তৃত মলদ্বীপের স্বার্থ পর্যন্ত, যারা এখন ওই দ্বীপপুঞ্জগুলির উপর নিজেদের অধিকতর বৈধ অধিকার দাবি করছে। এই পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে সৃষ্ট আঞ্চলিক জটিলতায় ভারতও জড়িয়ে পড়েছে, যা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় দিল্লির বিশ্বাসযোগ্যতার একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে চাগোস। ভারত চাইবে তার প্রতিবেশীরা যেন নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্য দূর করে।
যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের জন্য যে চুক্তি করা হয়েছে, মলদ্বীপ তাতে আপত্তি জানিয়েছে। এই চুক্তির ফলে দিয়েগো গার্সিয়ায় যুক্তরাজ্য-মার্কিন ঘাঁটির কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে। মলদ্বীপ জোর দিয়ে বলছে যে, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং মলদ্বীপের রাজাদের দ্বারা এই দ্বীপপুঞ্জ (স্থানীয়ভাবে ফোয়ালহাভাহি নামে পরিচিত) শাসনের ইতিহাস বিবেচনা করে চাগোস শাসনের উপর তাদের একটি বৈধ দাবি রয়েছে। এটি দিয়েগো গার্সিয়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর নেতৃত্বাধীন মলদ্বীপের জন্য এটি মনোভাবের একটি পরিবর্তন। মলদ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জকে ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাজ্য মরিশাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে, এবং দিয়েগো গার্সিয়াতে একটি যৌথ ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিসহ লন্ডন থেকে এটি শাসিত হয়ে আসছে। যখন মরিশাস চাগোসের উপর যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটি দীর্ঘ প্রচার শুরু করে, তখন মলদ্বীপ এই দুই দাবিদারের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ কিন্তু অসামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি বজায় রেখেছিল, এবং কোনও পক্ষের সঙ্গেই তার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড)-এর বিস্তৃতি নির্ধারণ করতে পারেনি।
শুধু ২০২২ সালে যুক্তরাজ্য ও মরিশাস যখন চাগোসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু করে, তখন তৎকালীন মলদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সোলিহ দ্বীপপুঞ্জটির উপর মরিশাসের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেন, এবং একটি ইইজেড নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ট্রাইব্যুনালের (আইটিএলওএস) সিদ্ধান্তে সম্মতি জানান।
কিন্তু জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক কারণে, ক্ষমতায় আসার পর মুইজ্জু চাগোসের ওপর মরিশাসের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেন এবং আইটিএলওএস-এর নির্ধারিত সীমানাকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন। এরপর মুইজ্জু বিতর্কিত জলসীমায় একটি বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করেন। এর জবাবে, মরিশাস মলদ্বীপের সঙ্গে সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করে।
ভারতের জন্য এই উত্তেজনা নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে, ভারত মলদ্বীপ ও মরিশাসকে তার আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে আসছে, বিশেষ করে যেহেতু দেশটি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে তার প্রতিবেশীদের নিজের সমতুল্য বলেই মনে করত। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির ফলে ক্ষমতার পরিবর্তিত ভারসাম্য দিল্লিতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। উভয় দেশের সঙ্গেই চিনের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, এবং সম্প্রতি দেশটি মলদ্বীপের ঋণ পুনর্গঠন করেছে।
দিল্লি তার প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজস্ব মূল্যবোধ ও স্বার্থের ভিত্তিতে আঞ্চলিক শৃঙ্খলা গঠন করে "ভারত মহাসাগরকে ভারতের মহাসাগর" হিসেবে বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এটি সামুদ্রিক সীমানা সচেতনতার পাশাপাশি উভয় দেশের সঙ্গে তার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। ভারত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উপহার দিয়েছে, সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ঋণ সুবিধা দিয়েছে, এবং এমনকি মলদ্বীপে একটি নৌ-বন্দর ও মরিশাসে একটি বিমানঘাঁটি নির্মাণ করছে। সেইসঙ্গেই ভারত তার ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতি’ এবং ‘মিউচুয়াল অ্যান্ড হোলিস্টিক অ্যাডভান্সমেন্ট ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রোথ অ্যাক্রস রিজিয়নস’ (মহাসাগর) রূপকল্পের মাধ্যমে প্রথম সাড়াদানকারী এবং পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদারের ভূমিকাও পালন করে।
দিল্লি তার প্রভাব বিস্তার করে এবং নিজস্ব মূল্যবোধ ও স্বার্থের ভিত্তিতে আঞ্চলিক শৃঙ্খলা গঠন করে "ভারত মহাসাগরকে ভারতের মহাসাগর" হিসেবে বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
ভারত এই সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপও দিচ্ছে। সামুদ্রিক এবং অপ্রচলিত নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের জন্য একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠীর — কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভ (সিএসসি) — সক্রিয়তা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই ভাবে, ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টার – ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়ন (আইএফসি-আইওআর) সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার পর্যবেক্ষণ এবং প্রচার অব্যাহত রেখেছে। এটি যৌথ নজরদারি, জলদস্যুতা, অবৈধ মাছ ধরা, এবং পাচারের বিষয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তাও প্রচার করে। এই উদ্যোগগুলিতে মরিশাস এবং মলদ্বীপ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিন্তু চাগোস ইস্যুটিকে মলদ্বীপ সীমান্ত বিরোধ থেকে ভূখণ্ডগত বিরোধে পরিণত করায় ভারত এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে, বিশেষ করে তার আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে। ঐতিহাসিকভাবে ভারত মরিশাসকে সমর্থন করে এসেছে, যার প্রধান কারণ হল পশ্চিমী বিশ্বের প্রতি তার সংশয় এবং উপনিবেশ-মুক্তির প্রতি তার সমর্থন। কিন্তু এই বিরোধে মলদ্বীপের সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকায় দিল্লি এক উভয়সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। এমন এক সময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যখন দিল্লি চাগোসের চারপাশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পর্যবেক্ষণ ও নজরদারিতে মরিশাসকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে আরও জোরালো ভূমিকা পালনে আগ্রহী, বিশেষ করে যেহেতু এই দ্বীপপুঞ্জটি মরিশাস থেকে ২,২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
মুইজ্জুর দাবিগুলি এই অঞ্চলের সামরিকীকরণের ঝুঁকিও তৈরি করছে। মলদ্বীপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য উভয় দেশ ২০২৩ সালের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার পর তুরস্কের সমর্থনে মলদ্বীপ আরও উৎসাহিত হয়েছে। স্পেশাল অপারেশনে ব্যবহৃত জাহাজ ও ড্রোনগুলি তুরস্ক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, যা আঙ্কারাকে একজন অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও মুইজ্জুর কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাজ্য দাবি করে আসছে যে, চাগোস ইস্যুটি যুক্তরাজ্য ও মরিশাসের মধ্যকার একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মুইজ্জুর দাবিগুলো খারিজ করে দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, যদি কেউ ইজারা চুক্তিটির জন্য হুমকি দেয় বা যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমকে বিপন্ন করে তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ব্যবস্থা নেবে। পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দিয়েগো গার্সিয়ার গুরুত্বকে আরও জোরদার করেছে, যা মলদ্বীপের জন্য আরও আলোচনার সুযোগকে সংকুচিত করেছে।
মলদ্বীপের যে কোনও ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বহিরাগত শক্তিগুলিকে টেনে আনার ঝুঁকি তৈরি করবে – যা ভারতের সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে। অমীমাংসিত চাগোস প্রশ্নটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করার সম্ভাবনা রাখে। ভারতকে হস্তক্ষেপ করতে হবে এবং সক্রিয়ভাবে সংলাপে মধ্যস্থতা করতে হবে। এই বিরোধটি সামলানোর ক্ষমতাই কিন্তু আঞ্চলিক শৃঙ্খলা নির্ধারণে তার সক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করবে।
এই ভাষ্যটি প্রথম লোয়ি ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত হয়েছিল।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Aditya Gowdara Shivamurthy is an Associate Fellow with the Strategic Studies Programme’s Neighbourhood Studies Initiative. He focuses on strategic and security-related developments in the South Asian ...
Read More +