২০২৬ সালের বাজেট থেকে জানা যায় যে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ভারতের বৃহত্তর উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষাকে কিছুটা সংযত করলেও, দেশটির ত্রাণ কূটনীতি এখনও প্রতিবেশ প্রথম নীতির প্রতিশ্রুতির উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন যখন তাঁর টানা নবম কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেন, তখন স্বাভাবিক ভাবেই সকলের মনোযোগ ছিল বাজেটের নতুন পদক্ষেপগুলির উপর, যার মধ্যে ছিল কর প্রশাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে ব্যয় এবং সরকারের অবকাঠামোগত পরিকল্পনা। তিনটি মূল কর্তব্যের ওপর ভিত্তি করে অর্থমন্ত্রী সীতারামন জোর দিয়ে বলেন যে, বাজেটটি তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে: ক) উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়িয়ে এবং অস্থির বৈশ্বিক গতিশীলতার সামনে স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত ও স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা; খ) জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা এবং তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে ভারতের সমৃদ্ধির পথে তাদের শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলা; এবং গ) ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি পরিবার, সম্প্রদায়, অঞ্চল এবং খাতের জন্য অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণের জন্য সম্পদ, সুযোগ-সুবিধা এবং সুযোগের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা।
তবে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির জন্য ভারতের অভ্যন্তরীণ আকাঙ্ক্ষাগুলি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার অবস্থানের সঙ্গে নিবিড় ভাবে জড়িত। একটি নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নয়াদিল্লির বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মূলত তার নিজস্ব উন্নয়নমূলক আখ্যান দ্বারা চালিত হয়। কিন্তু ভারত যখন ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে, তখন গত বছরের মতো এই বছরের বাজেটেও উন্নয়ন কূটনীতি — বেশির ভাগই অবশ্য ত্রাণের মাধ্যমে — মোটামুটি অপরিবর্তিতই রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উদ্ঘাটিত উত্তাল ভূ-অর্থনৈতিক উত্তেজনার পরিপ্রেক্ষিতে এটি একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
সহায়তার বরাদ্দ নিয়ে পর্যালোচনা করলে ভারতের ‘প্রতিবেশ প্রথম’ (নেবারহুড ফার্স্ট) নীতির উপর ধারাবাহিক গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ক্রমবর্ধমান চিনা প্রভাব এবং ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব জোরদার করা যে এই সময়ের জন্য অপরিহার্য, তা সহজেই অনুমেয়।
বিদেশ মন্ত্রণালয় (এমইএ) বছরের পর বছর ধরে সবচেয়ে কম অর্থায়নপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলির অন্যতম হলেও গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন অংশীদারিত্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতের ‘বিকশিত ভারত’ দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এটি একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিবৃতির ২৯ নম্বর চাহিদা অনুযায়ী, এই মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ গত বছরের ২১,৭৪২.৭৪ কোটি টাকা থেকে সামান্য বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ২২,১১৮.৯৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সহায়তার বরাদ্দ নিয়ে পর্যালোচনা করলে ভারতের ‘প্রতিবেশ প্রথম’ (নেবারহুড ফার্স্ট) নীতির উপর ধারাবাহিক গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ক্রমবর্ধমান চিনা প্রভাব এবং ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব জোরদার করা যে এই সময়ের জন্য অপরিহার্য, তা সহজেই অনুমেয়।
ভুটান সাহায্যের একটি বড় অংশ অর্থাৎ ২,২৮৮.৫৬ কোটি টাকা পেলেও, নেপাল (৮০০ কোটি টাকা), শ্রীলঙ্কা (৪০০ কোটি টাকা) এবং মায়ানমারের (৩০০ কোটি টাকা) জন্য সহায়তার পরিমাণ গত বছরের বাজেটের তুলনায় একই স্তরে রয়েছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর ভারতের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই সহায়তা বরাদ্দগুলিকে এমন সাধনী হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে নয়াদিল্লি তার প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক বৃদ্ধি ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে চায় এবং যা বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জনকল্যাণে অবদান রাখে। এই উদ্যোগগুলির মধ্যে রয়েছে উচ্চ স্তরের অবকাঠামো প্রকল্প, মানবিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক অংশীদারিত্ব এবং জলবিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, টিকা বিতরণ ও জনগণের মধ্যে সংযোগ জোরদার করার মতো স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প।
তবে বাংলাদেশের জন্য সহায়তা অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ সালের ১২০ কোটি টাকা থেকে এ বছর ৬০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এটি ঢাকার প্রতি ভারতের উন্নয়ন সহায়তার পদ্ধতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে। ভারতের পূর্বাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমাগত উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সৌহার্দ্য নয়াদিল্লিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ ছাড়াও, ভারত সরকার বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের বিষয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্য দিকে, আফগান ফরেন মিনিস্টার আমির খান মুত্তাকির ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের সফর থেকে বোঝা যায় যে, ভারত ধীরে ধীরে আফগান তালিবান প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে। বাজেটে আফগানিস্তানের জন্য ১৫০ কোটি ভারতীয় টাকা সহায়তা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা কাবুলের প্রতি ভারতের কৌশলগত অবস্থানে একটি সুচিন্তিত সমন্বয়ের প্রতিফলন।
বাংলাদেশের জন্য সহায়তা অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ সালের ১২০ কোটি টাকা থেকে এ বছর ৬০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এটি ঢাকার প্রতি ভারতের উন্নয়ন সহায়তার পদ্ধতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে। ভারতের পূর্বাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমাগত উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সৌহার্দ্য নয়াদিল্লিতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক বিবেচনাগুলি আবারও উন্নয়ন প্রকল্পগুলিকে প্রভাবিত করছে, যার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হল চাবাহার প্রকল্প। ভারত ও ইরান দশ বছরের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও, এই বছর চাবাহার বন্দরের জন্য কোনও বাজেট বরাদ্দ করা হয়নি, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সৃষ্ট উত্তেজনার ফলে উদ্ভূত সীমাবদ্ধতাগুলিকেই দর্শায়। ফলস্বরূপ, ভারত সতর্কতার সঙ্গেই অগ্রসর হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক তেহরানের উপর আরোপিত জটিল বাণিজ্য চাপ ও নিষেধাজ্ঞাগুলি সাবধানে সামাল দেবে।
সারণি ১: ২০২৬ সালের বাজেটে ভারতের ত্রাণ বরাদ্দ
|
যে দেশগুলির জন্য ত্রাণ বরাদ্দ করা হয়েছে |
২০২৫-২০২৬ সালের বাজেট (কোটি ভারতীয় টাকায়) |
সংশোধিত ২০২৫-২০২৬ (কোটি ভারতীয় টাকায়) |
বাজেট ২০২৬-২০২৭ (কোটি ভারতীয় টাকায়) |
|
ভুটান |
২১৫০ |
১৯৫০ |
২২৮৮.৫৬ |
|
আফগানিস্তান |
১০০ |
১০০ |
১৫০ |
|
বাংলাদেশ |
১২০ |
৩৪.৪৮ |
৬০ |
|
নেপাল |
৭০০ |
৮৩০ |
৮০০ |
|
শ্রীলঙ্কা |
৩০০ |
৩০০ |
৪০০ |
|
মলদ্বীপ |
৬০০ |
৬২৫ |
৫৫০ |
|
মায়ানমার |
৩৫০ |
২০০ |
৩০০ |
|
মোঙ্গোলিয়া |
৫ |
২৫ |
২৫ |
|
আফ্রিকান দেশসমূহ |
২২৫ |
২১১.৯২ |
২২৫ |
|
ইউরেশীয় দেশসমূহ |
৪০ |
১৩.৩২ |
৩৮ |
|
লাতিন আমেরিকার দেশসমূহ |
৬০ |
৯৬.৬৮ |
১২০ |
|
অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ |
১৫০ |
৮০ |
৮০ |
|
দুর্যোগ ত্রাণ |
৬৪ |
৮০ |
৮০ |
|
চাবাহার বন্দর |
১০০ |
৪০০ |
- |
|
মরিশাস |
৫০০ |
৮২৪ |
৫৫০ |
|
সেশেলস |
১৯ |
১৫ |
১৯ |
|
দেশগুলির প্রতি মোট ত্রাণের পরিমাণ |
৫৪৮৩ |
৫৭৮৪.৪০ |
৫৬৮৫.৫৬ |
উৎস: ভারতের বাজেট ২০২৬
উন্নয়নের প্রেক্ষাপট ক্রমবর্ধমান চাপের সম্মুখীন হওয়ায় গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলে ভারত একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন: অর্থাৎ নিরাপত্তা হুমকি এবং উন্নয়নমূলক লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। বছরের শুরুতে একটি ত্রাণ বাজেট দিয়ে শুরু করাটা নিঃসন্দেহে সঠিক পথ, কিন্তু বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নয়াদিল্লি তার ত্রাণ কূটনীতি কতটা কার্যকর ভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তা দেখার বিষয়।
স্বাতী প্রভু অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সেন্টার ফর নিউ ইকোনমিক ডিপ্লোমেসির (সিএনইডি) ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr Swati Prabhu is a Fellow with the Centre for New Economic Diplomacy at Observer Research Foundation. Her research explores the idea of aid, role of ...
Read More +