ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকটি বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতার প্রতি জোটটির পছন্দের বিষয়টি তুলে ধরেছে, এমনকি সেই সময়েও, যখন ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন পূর্ণ ঐকমত্যে বাধা দিয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের রেশ তখনও কাটেনি, এ হেন পরিস্থিতিতে ১৪ ও ১৫ মে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিকসের নতুন দুই সদস্য — ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, যারা চলমান উত্তেজনার দুই বিপরীত দিকে অবস্থান করছে - তাদের উপস্থিতির কারণে বৈঠকটি নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। যদিও বৈঠকটি একটি যৌথ ঘোষণার পরিবর্তে সভাপতির বিবৃতির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়, তবে এর ফলাফল পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না। বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে এর সদস্য দেশগুলির সম্পৃক্ততার কারণে ফোরামটির উপর প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল। তবুও বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধকারী একটি ঐকমত্য-ভিত্তিক ফোরাম হিসেবে ব্রিকসের এমন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সামাল দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে, যা নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনাকে ম্লান করে দেয়।
বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য মূল শিক্ষা
অন্তর্নিহিত উত্তেজনা সত্ত্বেও বৈঠকে বেশির ভাগ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গিয়েছে। ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ব্রাজিল, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা মন্ত্রী-পর্যায়ের কর্মকর্তারা। অন্য দিকে চিনের প্রতিনিধিত্ব করেন ভারতে নিযুক্ত তার রাষ্ট্রদূত। অংশীদার দেশগুলির মধ্যে কিউবা, মালয়েশিয়া, তাইল্যান্ড এবং উগান্ডা মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেয় এবং বেলারুশ, বলিভিয়া, কাজাখস্তান, নাইজেরিয়া, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনামও এতে অংশগ্রহণ করে। আলোচ্যসূচিতে তিনটি অধিবেশন ছিল: বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহ; ব্রিকস@২০: স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও স্থায়িত্বের জন্য নির্মাণ; এবং বৈশ্বিক শাসন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার। ট্রাম্পের চিন সফরের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে মতবিনিময়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা একটি বিশদ সভাপতির বিবৃতি গ্রহণের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ব্রিকস এমন কোনও সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে পরিকল্পিত ছিল না, যার জন্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন হয়; এর অভিনবত্ব নিহিত রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার, প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ এবং কখনও কখনও সক্রিয় রাজনৈতিক উত্তেজনাসম্পন্ন দেশগুলির মধ্যে সম্পৃক্ততা বজায় রাখার ক্ষমতায়।
ব্রিকস-এর ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের নীতিসমূহ সমুন্নত রেখে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা সংস্কারের প্রতি ফোরামের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এতে উন্নয়ন অর্থায়ন, জলবায়ু অর্থায়ন, স্থিতিস্থাপক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) কেন্দ্র করে একটি নিয়ম-ভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। কোনও যৌথ ঘোষণা না থাকা সত্ত্বেও বিবৃতিতে শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে: মন্ত্রীরা রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের প্রতি তাঁদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন; রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন; মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা-সহ আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছেন; সকল প্রকার সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার নিন্দা করেছেন; এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপুঞ্জের পূর্ণ সদস্যপদ ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটের মাঝে অবস্থানগত ধারাবাহিকতা
সবচেয়ে দৃশ্যমান মতবিরোধটি ফোরামের দুই সদস্য অর্থাৎ ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে ‘যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের পাশে দাঁড়ানো’র জন্য অভিযুক্ত করেছেন। অন্য দিকে আমিরাশাহির প্রতিনিধি ‘ইরানের দাবি এবং এর বিরুদ্ধে হামলাকে ন্যায্যতা দেওয়ার প্রচেষ্টা’ প্রত্যাখ্যান করেছেন। সভাপতির বিবৃতিতে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে সদস্যদের মধ্যকার মতপার্থক্যকেও স্বীকার করা হয়েছে। নিজ নিজ জাতীয় অবস্থানের ভিত্তিতে সদস্যরা দ্রুত সংঘাত নিরসনের প্রয়োজনীয়তা, সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্ব, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার উপর জোর দিয়েছেন। মন্ত্রীরা আন্তর্জাতিক জলপথ — বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালী — দিয়ে নিরাপদ ও বাধাহীন সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সকল রাষ্ট্রের জাহাজের জন্য নৌচলাচলের অধিকার ও স্বাধীনতা প্রয়োগের উপরও জোর দিয়েছেন। তবে এই ধারাগুলির কিছু প্রেক্ষিত নিয়ে একজন সদস্যের উত্থাপিত আনুষ্ঠানিক আপত্তি শেষ পর্যন্ত একটি যৌথ ঘোষণা গৃহীত হতে বাধা দেয়।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি যৌথ ঘোষণা প্রদানের জন্য ফোরামটির উপর যথেষ্ট চাপ ছিল। এর অনুপস্থিতি সমালোচনার জন্ম দিলেও এই ফলাফলটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ব্রিকস এমন কোনও সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে পরিকল্পিত ছিল না, যার জন্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন হয়; এর অভিনবত্ব নিহিত রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার, প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ এবং কখনও কখনও সক্রিয় রাজনৈতিক উত্তেজনাসম্পন্ন দেশগুলির মধ্যে সম্পৃক্ততা বজায় রাখার ক্ষমতায়। ভারত ও চিনের মধ্যে ২০২০ সালের গলওয়ান সংঘর্ষ — দু’টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সরাসরি সামরিক সংঘাত — এর একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। তা সত্ত্বেও ফোরামের মধ্যে সম্পৃক্ততা অব্যাহত ছিল। ভারত ২০২০ সালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এবং নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিল, যেখান থেকে একটি গণমাধ্যম বিবৃতি দেওয়া হয় এবং পরবর্তী কালে ২০২১, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বৈঠকগুলিতে যৌথ বিবৃতি প্রদান করা হয়। এই পুরো সময় জুড়ে নয়াদিল্লি পৃথক পথে তার দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলি অনুসরণ করার পাশাপাশি ব্রিকসের মধ্যে গঠনমূলক ভাবে সম্পৃক্ত ছিল।
এখন পরিধি ও সদস্যপদ উভয় দিক থেকেই বিস্তৃত এই জোটটি বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতা এবং স্থিতিশীল কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থা ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ জটিলতার মধ্য দিয়ে পথ চলছে বলে মনে হচ্ছে।
যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ২০২২ সালের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন এর ফলস্বরূপ বিবৃতিতে রাষ্ট্রপুঞ্জে ব্যক্ত সদস্য দেশগুলির জাতীয় অবস্থানকে স্মরণ করা হয় এবং একই সঙ্গে মানবিক উদ্বেগ, সংলাপ ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে ঐকমত্য বজায় রাখা হয়। এই ধারাটিই নয়াদিল্লিতেও পুনরাবৃত্ত হয়েছিল। এমনকি ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকও একটি যৌথ ঘোষণার পরিবর্তে সভাপতির বিবৃতির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছিল। এর আগের ব্রিকস উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ঐকমত্যের অভাবও একই ভাবে এই ধারার পূর্বাভাস দিয়েছিল। যদিও একটি যৌথ ঘোষণার প্রত্যাশা — এবং সংঘাত নিরসনে একটি সম্ভাব্য ভূমিকা — উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে পারে, তবে ব্রিকসকে মূলত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলির জন্য একটি ঐকমত্য-ভিত্তিক মঞ্চ হিসেবেই কল্পনা করা হয়েছিল। এখন পরিধি ও সদস্যপদ উভয় দিক থেকেই বিস্তৃত এই জোটটি বিষয়ভিত্তিক সহযোগিতা এবং স্থিতিশীল কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থা ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ জটিলতার মধ্য দিয়ে পথ চলছে বলে মনে হচ্ছে।
সঙ্কেত প্রদান
ভারতের জাতীয় বিবৃতি প্রদানকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ‘ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় ব্রিকস দেশগুলির মধ্যে আরও শক্তিশালী সহযোগিতা’র আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বিশ্ব এমন একাধিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যা বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্থিতিস্থাপকতাকে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। পশ্চিম এশিয়ার সঙ্কট নিয়ে মতবিরোধ জোটের অভ্যন্তরীণ বিভেদ প্রকাশ করলেও সদস্য দেশগুলি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি সম্মান, শান্তিপূর্ণ ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি, সন্ত্রাসবাদ, উন্নয়ন অর্থায়ন, স্থিতিশীল উন্নয়ন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো বিষয়গুলিতে ব্যাপক ভাবে একমত হয়েছে।
বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য শীর্ষ সম্মেলনের জন্য ভারত যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিতে সংলাপ ও ঐকমত্য গঠনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিসর বজায় রাখাই এই জোটের অগ্রাধিকার বলে মনে হচ্ছে। একটি খণ্ডিত বৈশ্বিক ব্যবস্থায় ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক গোষ্ঠীগুলি তাদের পরিধি প্রসারিত করতে এবং বাস্তব ফলাফল প্রদান করতে ক্রমবর্ধমান চাপের সম্মুখীন হচ্ছে — বিশেষ করে যখন নতুন সদস্য যোগ দিচ্ছে, সংঘাত তীব্র হচ্ছে এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো অচলাবস্থার সম্মুখীন হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন রেখাগুলি গভীরতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিকস অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার মাধ্যমে একটি অধিকতর প্রতিনিধিত্বমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গঠনে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
হিনা মাখিজা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
সান্দ্রা থাচিরিকাল প্রতাপ অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Dr. Makhija is an Associate Fellow at ORF and specializes in the study of Multilateralism, International Organizations, Global Norms, India at UN, Multilateral Negotiations, and ...
Read More +
Sandra Thachirickal Prathap is a Research Assistant with the Observer Research Foundation’s (ORF) Strategic Studies Programme (SSP). Her research examines the geopolitical dynamics of the Global ...
Read More +