একবিংশ শতাব্দীর সামুদ্রিক শহরগুলি কেবল শিল্প যুগের উত্তরাধিকার নয়; বরং সেগুলি এখন বৈশ্বিক সংযোগের মঞ্চ এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। যেহেতু বৈশ্বিক বাণিজ্য ডিজিটাল মঞ্চ এবং বহুমুখী লজিস্টিকসের দিকে ঝুঁকছে, তাই চিরাচরিত বন্দরগুলি ‘ব্লু সিটি’-তে রূপান্তরিত হচ্ছে। ব্লু সিটি আসলে এমন এক ধরনের আধুনিক উপকূলীয় কেন্দ্র, যাকে বাণিজ্য অর্থায়ন, পরিষেবা শিল্প এবং দক্ষ শ্রমিকদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই রূপান্তরটি বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে উপকূলীয় শহরগুলির সমগ্র অঞ্চলটির জন্য অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাদের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও অনেক শহরই বাণিজ্য অর্থায়ন এবং বিমা ব্যবস্থার কাঠামোগত অদক্ষতার জালে আটকা পড়েছে, যা তাদের মূলধনের ব্যয়কে উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়ে তোলে এবং উচ্চ-মূল্যের বাণিজ্য পরিষেবাগুলিতে তাদের একীভূতকরণে বাধা দেয়।
পরিষেবা কেন্দ্র হিসেবে সামুদ্রিক শহরসমূহ
বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৮০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্রপথে পরিচালিত হওয়ায় বন্দরগুলি আর কেবল সামুদ্রিক অবকাঠামোগত প্রবেশদ্বার নয়; এগুলি অত্যন্ত সংবেদনশীল কেন্দ্রও বটে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিসরকে আকার দেয়। আধুনিক সামুদ্রিক শহরগুলি ব্লকচেন-ভিত্তিক বাণিজ্য মঞ্চ, পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম এবং ডেটা-চালিত লজিস্টিকস ব্যবহার করে মসৃণ, দ্রুত ও আরও স্বচ্ছ বাণিজ্যকে সহজতর করে।
এই নতুন ব্যবস্থায় মূল্য সৃষ্টি কেবল পণ্য পরিবহণের পরিবর্তে ডিজিটাল কাস্টমস ব্রোকারেজ, লজিস্টিকস বিশ্লেষণ, ইনশিওরেন্স আন্ডাররাইটিং এবং আর্থিক মধ্যস্থতার মতো পরিষেবা প্রদানে স্থানান্তরিত হয়। এইগুলি আসলে সেই সব খাত, যেখানে গ্লোবাল সাউথকে অবশ্যই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। কিন্তু এমনটা করার জন্য মূলধনের ব্যয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক পরিষেবাগুলির বিষয়ে গুরুতর পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
বাণিজ্য অর্থায়ন এবং বিমা সংক্রান্ত বিষয়ে কাঠামোগত পক্ষপাত
আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক (এএফডিবি) অনুসারে, আনুমানিক ১.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য অর্থায়নের ঘাটতি উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলিকে (এসএমই) অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে প্রভাবিত করে। উচ্চ হারে বন্ধক রাখার প্রয়োজনীয়তা, সীমিত ঋণ সুবিধা এবং অনুন্নত নিয়ন্ত্রক কাঠামো ঝুঁকিমূলক প্রিমিয়ামের দিকে চালিত করে, যা আসলে ঋণের খরচই বাড়িয়ে দেয়।
একই ভাবে কয়েকটি বৈশ্বিক ক্ষমতাধর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক বিমা বাজারগুলি পুরনো বা পশ্চিম-কেন্দ্রিক অনুমানের উপর ভিত্তি করে ঝুঁকি মডেল ব্যবহার করে, যা আফ্রিকা, এশীয় এবং লাতিন আমেরিকান বন্দরগুলির উপর উচ্চ প্রিমিয়াম জারি করে শাস্তি দেয়। এই কাঠামোগত পক্ষপাত গ্লোবাল সাউথের সামুদ্রিক শহরগুলির জন্য ব্যবসা করার খরচ বাড়িয়ে দেয়, তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস করে এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগে বাধা দেয়।
এই সীমাবদ্ধতাগুলি কাটিয়ে উঠতে বহুপাক্ষিক উন্নয়নমূলক ব্যাঙ্ক (মাল্টিল্যাটেরাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক বা এমডিবি) এবং ইউএনসিটিএডি, বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং ওইসিডি-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে গ্লোবাল সাউথের সামুদ্রিক শহরগুলির জন্য আর্থিক পরিস্থিতি পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এর মধ্যে মিশ্র অর্থায়ন মডেলের মাধ্যমে বন্দর অবকাঠামো বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো অন্তর্ভুক্ত, যা সরকারি ও বেসরকারি দুই ধরনের পুঁজিই আকর্ষণ করে। এর পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ীদের সমর্থন করার জন্য আঞ্চলিক ঋণ গ্যারান্টি প্রকল্পগুলিকে শক্তিশালী করা জরুরি, যাঁরা প্রায়শই মূলধারার বাণিজ্য অর্থায়ন থেকে বাদ পড়ে যান। সার্বভৌম সমর্থনপুষ্ট বাণিজ্য অর্থায়ন সুবিধা চালু করলে তা উদীয়মান বাজারগুলিতে তারল্য (লিকুইডিটি) ও বিশ্বাসের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। একই রকম গুরুত্বপূর্ণ হল স্থানীয় ভাবে প্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহার করে বিমার বিধি এবং আক্ষরিক মূল্যায়নকে মানসম্মত করা, যা নিশ্চিত করবে যে, ঝুঁকির মূল্য যেন ন্যায্য ভাবে নির্ধারণ করা হয় এবং পুরনো বা পক্ষপাতদুষ্ট মডেল দ্বারা তা আর বিকৃত না হয়।
নীল অর্থনীতির জন্য মানব পুঁজির বিকাশ
অর্থায়ন ও পরিষেবার জন্য ভৌত পুঁজিই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানব দক্ষতাও। ডিজিটাল লজিস্টিকস, ফিনটেক, পরিবেশগত সম্মতি এবং বন্দর বিশ্লেষণের মতো সামুদ্রিক পরিষেবাগুলি আগামী দশকে দ্রুততম বর্ধনশীল কর্মসংস্থান খাতগুলির মধ্যে অন্যতম হবে। তবুও দক্ষতার ক্ষেত্রে এই ব্যবধানটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
সামুদ্রিক শহরগুলিকে অবশ্যই বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও লজিস্টিকস সংস্থাগুলির সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে পরিষেবা প্রদানকারী পেশাদারদের এক নতুন প্রজন্মকে এ বিষয়ে প্রস্তুত করা যায়। শিক্ষা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোতে ন্যায়সঙ্গত প্রবেশাধিকার, বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাঁরা প্রায়শই এই খাতগুলি থেকে বাদ পড়ে যান।
কেস স্টাডি: মরক্কো এবং ট্যাঞ্জিয়ার মেড মডেল
মরক্কো ব্লু সিটিজ মডেলের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ট্যাঞ্জিয়ার মেড হল আফ্রিকার বৃহত্তম বন্দর এবং ২০২৪ সালে ৯ মিলিয়ন টিইইউ কন্টেনার ধারণক্ষমতা-সহ বিশ্বের ১৯তম বন্দর। এটি কেবল একটি লজিস্টিকস কেন্দ্রই নয়, বরং শিল্প সংহতকরণের একটি মঞ্চও বটে। এটি সরাসরি একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এসইজেড) সঙ্গে সংযুক্ত, যেখানে লজিস্টিকস, স্বয়ংচালিত, বিমান চলাচল এবং অর্থায়ন খাতের ১,৪০০টিরও বেশি সংস্থা রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব, কৌশলগত অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের উপর মনোযোগের মাধ্যমে মরক্কো তার বাণিজ্য অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাগুলি উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস করেছে এবং নিজেকে ইউরোপ ও আফ্রিকার মধ্যে একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এ হেন অগ্রগতি বন্দরটিকে রেকর্ড গতিতে পণ্য প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম করেছে, যা এটিকে মেরস্ক এবং এমএসসি-র মতো বৈশ্বিক শিপিং সংস্থাগুলির জন্য একটি পছন্দের ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এই প্রসঙ্গে বলা জরুরি, ড্যানিশ শিপিং সংস্থা মেরস্ক ২০২৫ সালের শুরুতে ঘোষণা করেছে যে, তারা তাদের এমইসিএল পরিষেবা পথ — যা ভারত, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের সঙ্গে সংযুক্ত করে — স্পেনের আলজেসিরাস বন্দর থেকে সরিয়ে মরক্কোর ট্যাঞ্জিয়ার মেড বন্দরে সংযুক্ত করবে। ভূমধ্যসাগরীয় সামুদ্রিক লজিস্টিকসে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় পরিবর্তন, যা ট্রানজিট সময়কে উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস করবে এবং মেরস্কের মতে, এ ক্ষেত্রে শিপিং সময় পাঁচ দিন কমানো সম্ভব।
ট্যাঞ্জিয়ার মেড মডেলটি দর্শিয়েছে যে, সঠিক নীতির মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলিও আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বৈশ্বিক সামুদ্রিক শৃঙ্খলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
ভবিষ্যতের পথ: নীতি এবং অংশীদারিত্ব
ট্যাঞ্জিয়ার মেড মডেলের সাফল্য অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং মানব পুঁজির মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়ের গুরুত্বকেই তুলে ধরে। অন্য উদীয়মান অর্থনীতিগুলি কী ভাবে স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্লু সিটির লক্ষ্যে নিজেদের পথ তৈরি করতে পারে, সে সম্পর্কে এই মডেলটি মূল্যবান শিক্ষা প্রদান করে। ব্লু সিটিগুলির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা প্রধান কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলি মোকাবিলা করবে। প্রথমত, বাণিজ্য অর্থায়নের কাঠামো সংস্কার করা অপরিহার্য। এর মধ্যে রয়েছে ক্রেডিট স্কোরিং উন্নত করার জন্য উন্মুক্ত ডেটা শেয়ারিংকে উৎসাহিত করা, আঞ্চলিক ক্রেডিট রেজিস্ট্রি স্থাপন করা এবং আর্থিক পরিষেবাগুলিকে আরও সহজলভ্য ও কার্যকর করার জন্য বাণিজ্য সংক্রান্ত পেপারওয়ার্ক সহজ করা। একই সঙ্গে সামুদ্রিক বিমার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে স্থানীয় সমাধানগুলিকে চালিত করলে তা যে কোনও ঝুঁকিকে আরও নির্ভুল ও ন্যায্য ভাবে মূল্যায়ন করতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের বন্দরগুলির জন্য।
একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হল সহায়ক নগর-বন্দর শাসন মডেলের মাধ্যমে বন্দর উন্নয়নকে বৃহত্তর নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। এটি নিশ্চিত করবে যে, সামুদ্রিক প্রবৃদ্ধির সুবিধা আশপাশের সম্প্রদায়গুলিতেও যেন প্রসারিত হয় এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পায়। পরিশেষে বলা জরুরি, মানব সম্পদ কৌশলগুলিতে অবশ্যই সামুদ্রিক পরিষেবা দক্ষতাকে জাতীয় কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় একীভূত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে ডিজিটাল এবং পরিষেবা-ভিত্তিক বন্দর অর্থনীতিতে উন্নতি করতে সক্ষম একটি কর্মীবাহিনী তৈরি হয়। এই রূপান্তরগুলিকে সমর্থন করার জন্য আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন বা আইএমও), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন বা ডব্লিউটিও) এবং আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া (এএফসিএফটিএ) অফিসের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সুসংহত নীতি কাঠামো, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আর্থিক সমর্থন প্রদান করতে হবে।
মাহমুদ আরবুচ পলিসি সেন্টার ফর দ্য নিউ সাউথের সিনিয়র ইকোনমিস্ট।
নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখক(দের) ব্যক্তিগত।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Mahmoud Arbouch is an Senior Economist at the Policy Center for the New South. ...
Read More +