‘সেপ্টেম্বর বিপ্লব’ এবং নেপালের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে একটি নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর, আগামী মাসগুলিতে নেপাল কোন পথে অগ্রসর হবে এবং ২০২৬ সালের মার্চ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সফলভাবে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও এই বিষয়গুলি অভ্যন্তরীণভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তবুও দেশের শাসনব্যবস্থার এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশটির বিদেশনীতি কীভাবে নতুন রূপ নেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নেপালের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চিনের ক্ষেত্রে এই পুনর্গঠনের প্রশ্নটি আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।
১৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এই ফোনালাপটি ১৬ সেপ্টেম্বর নেপালে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এবং সুশীলা কার্কির মধ্যে বৈঠক এবং ১২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ভারতের পক্ষ থেকে দেওয়া সমর্থনের বিবৃতির পর অনুষ্ঠিত হয়। ফোনালাপের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী বিক্ষোভে নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশ করেন, এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টায় ভারতের সমর্থনের কথা জানান। একই দিনে নেপালে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত চেন সংও নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি নেপালের জনগণের বেছে নেওয়া উন্নয়ন ও রাজনৈতিক পথের প্রতি সমর্থন জানান এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেন। বেজিং কিছুটা দেরিতে হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে, এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতির ভিত্তিতে নেপালের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
চিন নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নেপালকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে, কারণ দেশটি তিব্বতের সীমান্তবর্তী এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে চিনের সংযোগ স্থাপনের একটি প্রবেশদ্বার হিসেবেও কাজ করে।
ঐতিহাসিকভাবে নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান অন্য দেশগুলির সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ভারত ও চিন উভয়ের জন্যই নেপালের নৈকট্য এই সম্পর্ককে অপরিহার্য করে তুলেছে। নেপালের রাজনৈতিক দলগুলির জন্যও ভারত ও চিনের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের অভ্যন্তরীণ ভোটারদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চিন নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নেপালকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে, কারণ দেশটি তিব্বতের সীমান্তবর্তী এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে চিনের সংযোগ স্থাপনের একটি প্রবেশদ্বার হিসেবেও কাজ করে। তাই বেজিং ঐতিহাসিকভাবে নেপালের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এর একটি বহিঃপ্রকাশ ছিল ২০১৭ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর, যার উদ্দেশ্য ছিল দুই পক্ষের মধ্যে সংযোগ আরও জোরদার করা এবং নেপালের পরিকাঠামোগত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা। চিন নেপালের অভিজাত শ্রেণির, বিশেষ করে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতেও বিনিয়োগ করেছে, কারণ তাদের আদর্শগত ভিত্তি একই রকম। এই সম্পর্কগুলির উপর নির্ভর করেই চিন সহযোগিতা আরও প্রসারিত করেছে। এই সম্পর্কে এবং নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চিনের বিশাল স্বার্থ জড়িত থাকার কারণেই সাম্প্রতিক বিক্ষোভের প্রতি চিনের প্রতিক্রিয়াকে 'সতর্ক' এবং 'সংযত' হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার একদিন পর চিনের মুখপাত্র একটি বিবৃতি প্রকাশ করে আশা প্রকাশ করেন যে, সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা শীঘ্রই পুনরুদ্ধার হবে। তাদের প্রতিক্রিয়াটি ছিল অপেক্ষা করো এবং দেখো নীতির প্রতিফলন, যা আগামী দিন ও সপ্তাহগুলিতে পরিস্থিতি কীভাবে মোড় নেয়, তা দেখার প্রত্যাশায় ছিল।
অন্যদিকে, ভারত ও নেপালের মধ্যে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে, যা পারস্পরিক অভিন্ন স্বার্থের উপর ভিত্তি করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়েছে, এবং উভয় পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য ও সংযোগ সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কাজ করছে। কাঠমান্ডু এবং নয়াদিল্লি সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলির উপর বেশি জোর দেওয়ার চেষ্টা করলেও, সীমান্ত সমস্যা এবং নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের আপাত ‘হস্তক্ষেপ’ সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলি বারবার সামনে এসেছে এবং সম্পর্ককে নাড়া দিয়েছে। এই অভিযোগগুলোকে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার জন্য ব্যবহার করেছে।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সেপ্টেম্বরে ভারত সফরের কথা ছিল, যা তাঁর সর্বশেষ মেয়াদে ভারতে প্রথম সফর হত। গত এক বছরে উভয় পক্ষের সিনিয়র নেতাদের সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় থাকলেও, সিপিএন (ইউএমএল) নেতাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি। যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদী এপ্রিল মাসে বিমস্টেক সম্মেলনের ফাঁকে ওলির সঙ্গে দেখা করেছিলেন, কিন্তু দুজনের মধ্যে সম্পর্ক শীতল ছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সিপিএন-ইউএমএল এবং নেপালি কংগ্রেস জোটের ঝোঁক চিনের দিকে ছিল। ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরের মধ্যে ওলির ভারত সফর না করার কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছিল। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে চিন সফর করেন এবং বিআরআই সংক্রান্ত আরেকটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে এর বাস্তবায়নের জন্য চাপ দেন। বিক্ষোভ শুরু হওয়ার একদিন আগে, দুই পক্ষ 'সাগরমাথা মৈত্রী ২০২৫' নামে একটি যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। সুতরাং, বেজিংয়ের জন্য ওলির নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী প্রশাসন অনুকূল ছিল। ভারতের জন্য ওলির নেতৃত্বাধীন এ বারের এবং পূর্ববর্তী উভয় প্রশাসনই সীমান্তসহ দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের বিষয়গুলি নিয়ে ভারত-বিরোধী মনোভাব উস্কে দিয়ে সমর্থন আদায়ের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়েছে। যদিও বিক্ষোভ এবং তার পরবর্তী হিংসা বৃদ্ধি নয়াদিল্লির জন্য নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছিল, তবুও নেতাদের ফোনে কথা বলার সিদ্ধান্ত এবং নেপালি প্রধানমন্ত্রীর ভারতীয় প্রতিপক্ষের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব এটাই প্রমাণ করে যে, উভয় পক্ষই প্রথম যোগাযোগ স্থাপনে কোনও সময় নষ্ট করতে চায়নি।
কয়েক সপ্তাহ আগে যখন কে পি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী জোট সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল, তখন তিনি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার ২৫তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে তিয়ানজিনে ছিলেন, যে সংস্থার নেপাল একটি সংলাপ অংশীদার। তাঁর এই সফরের সময় তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চিনের বিজয় দিবসের উদযাপনেও অংশ নেন। তাঁর এই সফর তিনটি কারণে সমালোচিত হয়েছিল— বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নিয়ে পরোক্ষভাবে একটি শক্তিশালী জাপান-বিরোধী অবস্থান নেওয়ার জন্য, লিপুলেখ গিরিপথ খোলার বিষয়ে নেপালের উদ্বেগ নিরসনে ব্যর্থ হওয়ার জন্য, এবং বেজিংকে গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই) ও গ্লোবাল সিভিলাইজেশনাল ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই)-এর অধীনে নেপালকে মিথ্যাভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিরস্কার না করার কারণে, যে দুটি উদ্যোগে নেপাল যোগ দিতে অস্বীকার করেছে। বিরোধী দলগুলি এবং তাঁর নিজের জোটের সদস্যেরাও ওলিকে বেজিংয়ের খেয়ালখুশির কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য সমালোচনা করেছিল।
এই অঞ্চলে, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং তারপর নেপালে গণবিদ্রোহের মাধ্যমে সরকারে ধারাবাহিক পরিবর্তন অনেক উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
এখন যেহেতু নেপালের জেন জি প্রজন্ম দেশটির গেড়ে বসা অভিজাতদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে এবং তাদের বিদায়ের পথ দেখিয়ে দিয়েছে, তাই বেজিং ও নয়াদিল্লি কীভাবে তাদের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাবে তা দেখার বিষয়। এই অঞ্চলে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং তারপর নেপালে গণবিদ্রোহের মাধ্যমে সরকারে ধারাবাহিক পরিবর্তন অনেক উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। নেপালের তরুণ প্রজন্ম চিনের পরিকাঠামো বিনিয়োগকে কীভাবে দেখে তা এখনও স্পষ্ট নয়, কারণ এই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ দুর্নীতির অভিযোগে কলঙ্কিত হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ঘটনা, জিএসআই এবং জিসিআই নিয়ে বেজিংয়ের দাবিতে নেপালকে রাজি করানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা—যেসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত রীতির কারণে চিন পার পেয়ে যেত—সেগুলি এখন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
নেপালের সঙ্গে বেজিংয়ের সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতাসীন অভিজাত গোষ্ঠীর উপস্থিতির উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল; তাদের অনুপস্থিতিতে নতুন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা যায়, তা দেখার জন্য চিনকে অপেক্ষা করতে হবে। নয়াদিল্লির জন্যও তার প্রতিবেশী দেশের এই বিক্ষোভগুলি নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ করা এবং পরিস্থিতি মূল্যায়ন করার পাশাপাশি একই সঙ্গে সকল অংশীদারকে লক্ষ্য করে একটি নীতি তৈরির দিকে নজর দেওয়ার একটি জরুরি প্রয়োজন রয়েছে—যেমনটি অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়। সরকার পরিবর্তনে ভারতের দ্রুত প্রতিক্রিয়া যেমন ইঙ্গিত দেয়, সেই অনুযায়ী তার জোর দেওয়া উচিত পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার উপর ভিত্তি করে একটি বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার উপর, এবং উদীয়মান তরুণ নেতাদের প্রজন্ম দুই দেশের সম্পর্ককে কীভাবে বিকশিত করতে চায় তা বোঝার চেষ্টা করা।
এই ভাষ্যটি প্রথম ওপেন-এ প্রকাশিত হয়েছিল।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +
Shivam Shekhawat is a Junior Fellow with ORF’s Strategic Studies Programme. Her research focuses primarily on India’s neighbourhood- particularly tracking the security, political and economic ...
Read More +