Expert Speak Raisina Debates
Published on Feb 23, 2026 Updated 0 Hours ago

প্রযুক্তি যেমন ভূ-রাজনীতির রূপরেখা বদলে দিচ্ছেতেমন দেশগুলিকে ক্রমবর্ধমান ভাবে আদর্শগত প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্থিতিস্থাপকতা সংক্রান্ত বাস্তবসম্মত বিবেচনার মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

প্রসঙ্গ চিপস এবং চিন: দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রনীতির দোদুল্যমান অবস্থা

এমন এক যুগে যেখানে প্রযুক্তিগত শক্তি ক্রমবর্ধমান ভাবে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নির্ধারণ করেসেখানে দক্ষিণ আফ্রিকায় সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী পণ্যের পর তাইওয়ানের স্বল্পকালীন রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতাকে একটি কূটনৈতিক সাধনী হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে

প্রিটোরিয়ার পক্ষ থেকে তাইওয়ানের কার্যালয়ের নাম পরিবর্তন এবং সেটিকে প্রিটোরিয়া থেকে জোহানেসবার্গে স্থানান্তরের একতরফা পদক্ষেপের ফলে সৃষ্ট এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের আধিপত্যকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ইচ্ছাকে প্রকাশ্যে এনেছে। এই নিষেধাজ্ঞা দ্রুত প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও তাইওয়ানের বার্তাটি ছিল দ্ব্যর্থহীন: তাইওয়ান তার নিজস্ব কৌশলগত প্রভাব প্রয়োগ না করে কূটনৈতিক জবরদস্তি কোনও মতেই নীরবে মেনে নেবে না।

দক্ষিণ আফ্রিকায় চিপ রফতানি সীমিত করার তাইওয়ানের পদক্ষেপটি একটি দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অসন্তোষের মূলে নিহিত ছিল। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার একটি উচ্চ-পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের চিন সফরের পর প্রিটোরিয়া ঘোষণা করে যে, প্রিটোরিয়া এবং কেপ টাউনে অবস্থিত তাইওয়ানের লিয়াজোঁ অফিসগুলোর নাম পরিবর্তন করে তাইপেই কমার্শিয়াল অফিস রাখা হবে এবং সেগুলিকে রাজধানী থেকে জোহানেসবার্গে স্থানান্তরিত করতে হবে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী পণ্যের পর তাইওয়ানের স্বল্পকালীন রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতাকে একটি কূটনৈতিক সাধনী হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে

দক্ষিণ আফ্রিকার ‘এক-চিন’ (ওয়ান চায়না) নীতি মেনে চলার অংশ হিসেবে উপস্থাপিত এই পদক্ষেপকে বেজিংয়ের প্রতি একটি কূটনৈতিক ছাড় হিসেবে ব্যাপক ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় তাইওয়ানের অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় (মিনিস্ট্রি অফ ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স) জাতীয় নিরাপত্তার কারণ উল্লেখ করেই, দক্ষিণ আফ্রিকায় রফতানির আগে ৪৭টি শ্রেণিবিন্যাসের অধীনে থাকা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি)চিপ এবং মেমোরি-সহ বিস্তৃত পণ্যের জন্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা করে।

কয়েক দিনের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞাটি তুলে নেওয়া হয়। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা যখন কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়তখন এই ঘটনাটি তাইওয়ানের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন ও দৃঢ় দিকনির্দেশনাকেই তুলে ধরে। এটি তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও সুরক্ষার জন্য কৌশলগত শিল্প সুবিধাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তাইওয়ানের প্রস্তুতিকে সশক্ত করে। এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে উন্নত অর্ধপরিবাহী উৎপাদনে তাইওয়ানের প্রায় একচেটিয়া আধিপত্যযা প্রধানত তার প্রধান সংস্থা তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি-র (টিএসএমসি) মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং যা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য অপরিহার্য।

তাইওয়ানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই পদক্ষেপের নেপথ্যে বেশ কয়েকটি উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমতএটি প্রিটোরিয়াকে তাইপেইকে কূটনৈতিক ভাবে দুর্বল করে তোলার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে চেয়েছিলবিশেষ করে যেহেতু তাদের স্বয়ংচালিত  ইলেকট্রনিক্স শিল্প তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পণ্যের উপর নির্ভরশীল। তাইওয়ান থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার চিপ আমদানির পরিমাণ সীমিত হওয়ায় চিপ রফতানি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার স্বল্পমেয়াদি প্রভাব হয়তো নগণ্য ছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি হুমকিটি নিঃসন্দেহে আরও গভীর বলে প্রমাণিত হয়েছিল। তাইওয়ানের এই পদক্ষেপটি আসলে দুই দেশের (তাইওয়ান ও দক্ষিণ আফ্রিকা) মধ্যকার সম্পর্ক আরও খারাপ হলে দক্ষিণ আফ্রিকার শিল্পগুলিতে সম্ভাব্য ব্যাঘাত সম্পর্কে সচেতনতাও বৃদ্ধি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার উৎপাদন অর্থনীতির একটি প্রধান স্তম্ভ হল স্বয়ংচালিত খাতযা চিপ সরবরাহের ওঠানামার প্রতি বিশেষ ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং যা কোভিড-১৯ অতিমারির পরে বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত হয়েছে।

আফ্রিকার একটি প্রতীকী ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে লক্ষ্য করে তাইওয়ান তার অর্থনৈতিক কূটনীতির সীমা পরীক্ষা করেছে।

দ্বিতীয়ততাইওয়ানের এই পদক্ষেপটি দক্ষিণ আফ্রিকা  বেজিংয়ের প্রসঙ্গে অনুরূপ কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের কথা ভাবছে এমন অন্যান্য দেশের জন্য একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে কাজ করেছে। আফ্রিকার একটি প্রতীকী ভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে লক্ষ্য করে তাইওয়ান তার অর্থনৈতিক কূটনীতির সীমা পরীক্ষা করেছে। অন্তর্নিহিত সতর্কতাটি ছিল স্পষ্ট: তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা তা অবনমিত করার ফলে উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার হ্রাস-সহ বাস্তবসম্মত মূল্য চোকাতে হতে পারে।

তৃতীয়তএই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে - বিশেষ করে কূটনৈতিক স্বীকৃতি কমে আসার প্রেক্ষিতে – স্বাধীন ভাবে কাজ করার জন্য তাইওয়ানের ক্রমবর্ধমান ইচ্ছাকেও দর্শিয়েছে। মাত্র ১২টি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক মিত্র অবশিষ্ট থাকায় এবং আফ্রিকার একমাত্র অংশীদার হিসেবে ক্ষুদ্র রাজতন্ত্র এসওয়াতিনি থাকায়, চিরাচরিত কূটনীতিতে তাইওয়ানের কৌশলের সুযোগ সঙ্কুচিত হচ্ছে। অর্ধপরিবাহী সংক্রান্ত আধিপত্যের কৌশলগত ব্যবহার প্রতিরক্ষামূলক থেকে আক্রমণাত্মক কূটনীতির দিকে একটি পরিবর্তনকেই দর্শায়, যা প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দ্বারা ক্রমবর্ধমান ভাবে প্রভাবিত একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থায় তাইওয়ানের প্রাসঙ্গিকতাকে শক্তিশালী করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এই ঘটনাটি একটি কূটনৈতিক ভুল হিসেব-নিকেশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বেজিংয়ের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে আরও নিবিড় ভাবে নিজেদের যুক্ত করার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা তাইওয়ানের সঙ্গে একটি মূল্যবান প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি নিয়েছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এমনটা ঘটেছে, যখন বৈশ্বিক চিপ সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠিত হচ্ছে এবং আঞ্চলিক প্রযুক্তিগত জোটগুলির গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বোপরি, দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিচালিত তাইওয়ানের মালিকানাধীন ৪৫০টি কারখানা - যেখানে ৪০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ কর্মরত - অর্থনৈতিক নির্ভরতার আর কটি স্তরকে দর্শায়, যা সম্পর্কের অবনতির ফলে প্রভাবিত হতে পারে।

অর্ধপরিবাহী ক্ষেত্রে আধিপত্যের কৌশলগত ব্যবহারটি রক্ষণাত্মক থেকে আক্রমণাত্মক কূটনীতির দিকে একটি পরিবর্তনকে দর্শায়।

দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক অর্ধপরিবাহী সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করার অভিযোগ এনেছে। কিন্তু এই সমালোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের অসামঞ্জস্যতাকে মূলত উপেক্ষা করা হয়েছে। চিপ শিল্পে তাইওয়ানের অবস্থান সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য নয় এবং এই সত্যকে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের আপাত অবমূল্যায়ন তাদের প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব  শিল্প প্রতিযোগিতার জন্য পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সর্বোপরি, জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোতে চিনের বাড়তে থাকা কেন্দ্রীয় অবস্থানের কারণেপ্রিটোরিয়ার এই কূটনৈতিক পদক্ষেপকে তাইওয়ানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে আসলে বেজিংকে সন্তুষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এই ঘটনার বৃহত্তর প্রভাব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে বিস্তৃত। এটি গ্লোবাল সাউথের জন্যবিশেষ করে যে সব দেশ তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বিসর্জন না দিয়ে চিন ও তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। তাইওয়ান যখন অর্থনৈতিক উপায়ে তার আন্তর্জাতিক অবস্থান রক্ষায় আরও বেশি সরব হচ্ছেতখন অন্যান্য দেশকে তাইপেইয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক অবনমনের পরিণাম পুনরায় মূল্যায়ন করতে হতে পারে। এই ধারণাটি এখন এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে যে, কেবল বৈশ্বিক শক্তিধর দেশগুলিই অর্থনৈতিক জবরদস্তি প্রয়োগ করে। কিন্তু তাইওয়ানের মতো ছোট অথচ প্রযুক্তিগত ভাবে অপরিহার্য পক্ষগুলিও নির্বাচিত পারস্পরিক নির্ভরতার মাধ্যমে কূটনৈতিক ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জন্যঘটনাটি আসলে  সতর্কবার্তা প্রদান করা উচিত যেছোট কিন্তু কৌশলগত ভাবে মূল্যবান অংশীদারদের উপেক্ষা করে বৃহৎ শক্তিগুলির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ঝুঁকি ঠিক কী হতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, তাইওয়ানের তার অর্ধপরিবাহী শিল্পকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে সংক্ষিপ্ত অথচ কৌশলগত ব্যবহার তার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য বিবর্তনকে দর্শায়। এটি আর কেবল নৈতিক যুক্তি বা গণতান্ত্রিক সংহতির আবেদনের উপর নির্ভর করে নাবরং এখন তার স্বার্থ প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করতে প্রস্তুত। দক্ষিণ আফ্রিকার জন্যঘটনাটি আসলে  সতর্কবার্তা প্রদান করা উচিত যেছোট কিন্তু কৌশলগত ভাবে মূল্যবান অংশীদারদের উপেক্ষা করে বৃহৎ শক্তিগুলির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ঝুঁকি ঠিক কী হতে পারে।

 


সমীর ভট্টাচার্য অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.

Author

Samir Bhattacharya

Samir Bhattacharya

Dr. Samir Bhattacharya is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), where he works on geopolitics with particular reference to Africa in the changing ...

Read More +