-
CENTRES
Progammes & Centres
Location
প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা থেকে শুরু করে বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত… বাংলাদেশের চিনের সঙ্গে বিকশিত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠনে একটি নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সুবিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তিস্তা নদীর জলের ‘ন্যায্য বণ্টন’ নিশ্চিত করার জন্য চিনের তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। এই আন্দোলনটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন উত্তর বাংলাদেশের রংপুর বিভাগ জুড়ে এ ধরনের বিক্ষোভের ঢেউ উঠেছে এবং ভারতের সঙ্গে গঙ্গা জল বণ্টন চুক্তি ২০২৬ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলেছে। নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন চুক্তিটি পুনর্নবীকরণের শর্তাবলি নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করেছে। তিস্তা নদীর জল বণ্টন নিয়ে বিরোধ ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে দীর্ঘতম অমীমাংসিত বিষয়। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনার একটি কারণ ছিল। কারণ চিন সঙ্কটটি সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন এবং ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যাটি সমাধানের উপর জোর দিয়েছিলেন। এটিই ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির অন্যতম কারণ ছিল। এই অনিশ্চয়তার আবহে ঢাকার নতুন নেতৃত্ব তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলিকে নতুন ভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
উন্নয়নশীল অর্থনীতি ও ক্রমবর্ধমান তরুণ জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ কেবল চিনা পণ্যের একটি বড় বাজারই নয়, এটি বেজিংয়ের জন্য কৌশলগত সম্ভাবনাও ধারণ করে।
তা সত্ত্বেও শাসন পরিবর্তনের এক বছর পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পূর্ববর্তী ‘ভারসাম্যের কূটনীতি’র পরিবর্তে চিনের দিকে একটি সুস্পষ্ট ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর প্রথম সরকারি সফরের গন্তব্য হিসেবে চিনকে বেছে নেন। এই সফরটি কৌশলগত ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার কেবল দেশের উন্নয়নের জন্যই নয়, বরং রাজনৈতিক ভাবে উত্তাল পরিবেশে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্যও চিনা বিনিয়োগের উপর যথেষ্ট নির্ভরশীল। ২০২৫ সালের মার্চ মাসের এই সফরের - যা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় - ফলস্বরূপ বাংলাদেশ চিন থেকে ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের বিনিয়োগ ও অনুদান লাভ করে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের মধ্যে বাংলাদেশে মোট চিনা বিনিয়োগকে প্রায় ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করে। ইউনূস চিনা ঋণের সুদের হার কমানো এবং চিন-অর্থায়িত প্রকল্পগুলিতে প্রতিশ্রুতি ফি মকুবের জন্য অনুরোধ করেন। অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং চিনের সবুজ রূপান্তরের জন্য তিনি বেজিংকে চিনা উৎপাদন শিল্পগুলি বাংলাদেশে স্থানান্তরে সহায়তা করারও অনুরোধ করেন।
বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক আহ্বানে চিন দ্রুত সাড়া দেয়। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজে প্রধান উপদেষ্টাকে অভ্যর্থনা জানান এবং বেজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপলে একটি উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার আয়োজন করেন। তবে বেজিংয়ের বর্ধিত সম্পৃক্ততার প্রচেষ্টা কেবল অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, যা কিনা একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। তারা দেশের ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী বেশ কয়েকটি ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল জামাত-ই-ইসলামী (জেআই)। এটি এমন একটি রাজনৈতিক দল যাদের সম্বন্ধে বলা হয় যে, দলটি ‘উগ্র ভারত-বিরোধী’, ‘কট্টর পাকিস্তানপন্থী’ এবং দলটি উইঘুরদের প্রতি চিনের আচরণের জন্য কখনও চিনের সমালোচনা করেনি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জামাতের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন, যা ২০১০ সালের পর দলটির ঢাকা কার্যালয়ে কোনও বিদেশি কূটনীতিকের প্রথম সফর। তিনি প্রকাশ্যে এই দলটিকে একটি ‘সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর কিছুদিন পরেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জামাতের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলির ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল চিন সফর করে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় অবস্থিত চিনা দূতাবাস জামাত-ই-ইসলামীর (জেআই) একটি প্রতিনিধিদলের জন্য একটি সংবর্ধনার আয়োজন করে। দু’মাস পর সেপ্টেম্বরে চাইনিজ পিপলস ইনস্টিটিউট অফ ফরেন অ্যাফেয়ার্সের একটি উচ্চ-পর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় জেআই নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।
এই ঘন ঘন যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, বাংলাদেশের একটি বড় অংশের যুবকরা চিনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন, বিশেষ করে যেহেতু জামাত-ই-ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-সহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। প্রাক্তন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতার কারণে সৃষ্ট ভারত-বিরোধী তীব্র অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারতের কৌশলগত সংবেদনশীলতাকে উপেক্ষা করার পাশাপাশি চিনের তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভগুলি বেজিংয়ের কূটনৈতিক কৌশলের সাফল্যকেই তুলে ধরে।
চিন ও বাংলাদেশের সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারিত্ব
উন্নয়নশীল অর্থনীতি ও ক্রমবর্ধমান তরুণ জনসংখ্যার কারণে বাংলাদেশ কেবল চিনা পণ্যের একটি বড় বাজারই নয়, এটি বেজিংয়ের জন্য কৌশলগত সম্ভাবনাও ধারণ করে। বঙ্গোপসাগরের শীর্ষে অবস্থিত এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও হিমালয়ের দেশ নেপাল ও ভুটানকে পশ্চাৎভূমি হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশ চিনের স্থলবেষ্টিত পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলির জন্য সমুদ্রপথে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে আদর্শ অবস্থানে রয়েছে। উপরন্তু, এটি বঙ্গোপসাগরে একটি ভিত্তি স্থাপন করে চিনের অর্থনীতির জন্য অত্যাবশ্যকীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে, বিশেষ করে যখন বেজিং ‘মালাক্কা সংক্রান্ত দ্বিধা’য় জর্জরিত। দক্ষিণ এশিয়ায় — বিশেষ করে বাংলাদেশে — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে আগ্রহ, উন্নয়ন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার জন্য জাপানের প্রচেষ্টা এবং প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে দেশটির স্বাভাবিক অংশীদারিত্ব চিনকে বাংলাদেশে তার প্রভাব বাড়াতে আরও উৎসাহিত করেছে। সুতরাং, চিন ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পশ্চিম পাকিস্তানকে সমর্থন করা এবং রাষ্ট্রপুঞ্জে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভে ভেটো দেওয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী নানা সময়ে চিন দেশটির প্রতি উষ্ণ মনোভাব দেখিয়েছে এবং ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এই অংশীদারিত্ব মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতার দ্বারা চালিত হয়েছে এবং ২০০৬ সালে চিন ভারতকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনটি ছিল বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ ভারত ও বাংলাদেশ পঞ্চম বৃহত্তম সীমান্ত ভাগ করে নেয় এবং আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় মাধ্যমেই বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ২০২৪ সালের অগস্ট থেকে ২০২৫ সালের অগস্ট মাস পর্যন্ত অর্থাৎ শাসন পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশে চিনা পণ্যের আমদানি ১.৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১.৯২ বিলিয়ন ডলারে (২৫ শতাংশ) দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে চিনে বাংলাদেশের রফতানি ৯০.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে ১৩০ মিলিয়ন ডলারে (৪৪.১ শতাংশ) পৌঁছেছে। চিন তার ৯৯ শতাংশ পণ্যের জন্য বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করে।
বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক বাণিজ্য চুক্তির অধীনে চিনা বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করে। তবে আগামী বছর এটি স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত সহায়তা ব্যবস্থা হারাতে চলেছে। তা সত্ত্বেও চিন ২০২৮ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত নীতিটি বাড়াতে সম্মত হয়েছে।
এ ছাড়াও চিন বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার। ২০১৬ সাল থেকে যখন ঢাকা বেজিংয়ের ফ্ল্যাগশিপ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যোগ দেয়, তখন থেকে এটি বাংলাদেশে ১২টি সড়ক, ২১টি সেতু এবং ২৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে (২০২৩ সাল পর্যন্ত)। এটি চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দরের কিছু অংশ নির্মাণে সহায়তা করেছে। চিন পদ্মা সেতু নির্মাণেও সহায়তা করেছে, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১.২ শতাংশ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং এটি অর্থনীতিতে ৫৫০,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে বলে জানা গিয়েছে। উন্নয়নশীল চিনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলে (সিআইইজেড) চিনা সংস্থাগুলির ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি চিনা অর্থনীতির প্রতি ঢাকার আস্থা বাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার শুধু সিআইইজেড-এর উন্নয়নকে দ্রুততরই করেনি, বরং তারা চিনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একচেটিয়া ভাবে আরও দু’টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
বাণিজ্য ও উন্নয়নের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশ ২০০২ সালে চিনের সঙ্গে একটি যুগান্তকারী প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষর করে, যা ছিল যে কোনও দেশের সঙ্গে তার প্রথম প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি। তখন থেকে বাংলাদেশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, দু’টি মিং-শ্রেণির ডুবোজাহাজ এবং বেশ কয়েকটি অস্ত্র ব্যবস্থা ক্রয় করেছে, যা চিনকে বাংলাদেশের বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চিন বাংলাদেশের ৭২ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করেছে। বেজিং ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম ডুবোজাহাজ ঘাঁটি, বিএনএস শেখ হাসিনা নির্মাণ করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রণীত একটি সংক্ষিপ্ত তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে, যেখানে চিন বিদেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শাসন পরিবর্তনের পর পাকিস্তান বাংলাদেশকে চিন থেকে ১২টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কিনতে বাধ্য করার জন্য তাদের প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে। তবে চিনা অস্ত্রের গুণমান নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার কারণে ঢাকা তার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের চিনের প্রতি ঝুঁকে পড়ার কারণে নয়াদিল্লির সঙ্গে ইতিমধ্যেই টানাপড়েনের সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে, বিশেষ করে যদি ঢাকা ভারতের কৌশলগত সংবেদনশীলতা উপেক্ষা করে, যা এই অঞ্চলে বেজিংয়ের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত।
সরকার ও জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার চিনা পদ্ধতির মতোই সাংস্কৃতিক সম্পর্ক চিন-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেশির ভাগ চিনা ব্যবসায়ী বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বাণিজ্যে জড়িত হওয়ার আগে সাবলীল ভাবে কথ্য বাংলা বলতে শেখেন। পারস্পরিক সৌজন্যের নিদর্শন হিসেবে এবং ভবিষ্যতে উদ্ভূত হতে পারে এমন যে কোনও চাকরির সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশে চিনা ভাষার প্রসারে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক-কে (সিজিটিএন) ইউনূসের সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর থেকে ম্যান্ডারিন ভাষা শেখার বিষয়টি নতুন করে মনোযোগ পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে দু’টি কনফুসিয়াস সেন্টার রয়েছে, একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অন্যটি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে। ইউনূস এ ধরনের আরও কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে চিনাদের সাফল্যের একটি বড় কারণ হল এই জনপ্রিয় ধারণাই যে, বেজিং তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে, যাকে ভারতের আরও দৃশ্যমান সম্পৃক্ততার সঙ্গেই প্রায়শই একটি বৈপরীত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
হাসিনার প্রস্থানের পর বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সকলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন’-এর একটি নতুন দিক গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে চিনের প্রতি তার সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার দেশটির প্রতিবেশ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ভারত ছিল বাংলাদেশের সর্বকালীন বন্ধু, যা ছিল সুবিধার চেয়েও বেশি একটি অপরিহার্য বিষয়। কারণ দু’টি দেশ কেবল স্থল ও সামুদ্রিক সীমাই ভাগ করে না, বরং সাধারণ সম্পদ এবং এমন মানুষও ভাগ করে নেয়, যাঁদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন, অভিন্ন সাধারণ ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য রয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই, নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে একটি পারস্পরিক ও স্বাভাবিক নির্ভরশীলতা ছিল, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ, উন্নয়ন অংশীদারিত্ব, চিকিৎসা পর্যটন এবং সংযোগ স্থাপন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের চিনের প্রতি ঝুঁকে পড়ার কারণে নয়াদিল্লির সঙ্গে ইতিমধ্যেই টানাপড়েনের সম্পর্ক আরও খারাপ হতে পারে, বিশেষ করে যদি ঢাকা ভারতের কৌশলগত সংবেদনশীলতা উপেক্ষা করে, যা এই অঞ্চলে বেজিংয়ের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। এই কারণেই হাসিনা ভারতের সঙ্গে তিস্তা সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। কারণ চিনা প্রস্তাব গ্রহণ করলে বেজিং ভারতীয় সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে আসত। এটা অসম্ভাব্য যে, অন্তর্বর্তী সরকার একই সিদ্ধান্ত নেবে, বিশেষ করে যেহেতু তারা ইতিমধ্যেই তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য প্রায় ৪৭.৬ বিলিয়ন ভারতীয় রুপির চিনা ঋণ চেয়েছে। তা সত্ত্বেও তাদের এই সিদ্ধান্তটি সত্যিই বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে না কি কেবল কয়েকটি গোষ্ঠীর ইচ্ছাকেই চরিতার্থ করবে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গিয়েছে। কারণ কিছু জনপ্রিয় সমর্থন থাকা সত্ত্বেও এটি নিতান্তই একটি অনির্বাচিত সরকার। বাংলাদেশ যখন পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন পথ তৈরি করছে, তখন ঋণফাঁদ এড়াতে এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে কোনও একক শক্তির উপর প্রকাশ্য নির্ভরশীলতা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং নীতি ও অনুশীলনে ‘সকলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন’-এর নীতিবাক্য মেনে চলতে হবে।
সোহিনী বোস অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
আয়ুষ ভরদ্বাজ অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের রিসার্চ ইন্টার্ন।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Sohini Bose is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), Kolkata with the Strategic Studies Programme. Her area of research is India’s eastern maritime ...
Read More +
Ayush Bhardwaj is a research intern at ORF Kolkata. They have a a particular interest in Bangladesh, political epistemology, the moral responsibility of artificial agents ...
Read More +