বিএনপি-র জয় গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা পুনরুদ্ধার করলেও আওয়ামী লীগ বাদ থাকায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ আসলে সংস্কার, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলা করার ক্ষমতার উপর নির্ভর করছে।
বাংলাদেশে নতুন যুগের সূচনা করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি) ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। বিএনপি জামাত-এ-ইসলামীর (জেইআই) নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটকে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে পিছনে ফেলে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচনটি ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক অস্থির যাত্রার সমাপ্তি। ২৯৯টি নির্বাচনী এলাকা জুড়ে এবং ৫০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। এতে মতদানকারী ভোটারদের অংশগ্রহণ ৬০ শতাংশের বেশি ছিল বলে জানা গিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত গত নির্বাচনে রেকর্ড ৪২ শতাংশের তুলনায় এটি একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। সেই নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঞ্চম মেয়াদে বিজয়ী হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে গণবিক্ষোভের পর তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি বাংলাদেশে প্রায় স্থায়ী দল আওয়ামী লীগ প্রশাসনের মিথ ভেঙে দেয়। তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে সাধারণ সমালোচনার মধ্যে অন্যতম ছিল দেশে গণতন্ত্রের ক্ষয়, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য উৎসাহকে উস্কে দিয়েছিল।
একটি যুগান্তকারী নির্বাচন
তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের অনন্যতা ঢাকায় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের প্রতীকী রূপের ঊর্ধ্বে উঠে বিস্তৃত। প্রথম বারের মতো জুলাই সনদের নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন (ন্যাশনাল কনসেনসাস কমিশন) কর্তৃক প্রণীত সাংবিধানিক সংস্কারের একটি রূপ হল জুলাই চার্টার বা জুলাই সনদ। সেই জুলাই সনদে যা যা প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা হল: নির্বাচনের জন্য একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিষ্ঠা, সংসদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার পুনর্গঠন, নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচারগত স্বাধীনতা জোরদার করা এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই দফার মেয়াদের সীমার প্রবর্তন। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিএনপি ও জামাত-এ-ইসলামী-সহ ২০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের দ্বারা স্বাক্ষরিত এই সনদটি বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যুগে উত্তরণের জন্য একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করে। তবে জুলাই সনদ আওয়ামী লীগের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে না, যে দলটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, এই নির্বাচন তিন দশকের মধ্যে প্রথম বারের মতো আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-র ‘যুদ্ধরত বেগম’কে – অর্থাৎ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া - ছাড়াই পরিচালিত হয়েছিল, যাঁরা ১৯৯৬ সাল থেকে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে, এই নির্বাচন তিন দশকের মধ্যে প্রথম বারের মতো আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-র ‘যুদ্ধরত বেগম’দের – অর্থাৎ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া - ছাড়াই পরিচালিত হয়েছিল, যাঁরা ১৯৯৬ সাল থেকে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। হাসিনা ভারতে স্ব-নির্বাসিত। আর অন্য দিকে খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর মারা যান। তাঁর ছেলে এবং ভারপ্রাপ্ত বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসার পরপরই খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। পরিস্থিতিগত সহানুভূতি এবং বিএনপি-র পুনরুজ্জীবনের জন্য জনগণের আকাঙ্ক্ষার দ্বারা যথেষ্ট রকমের উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনটিতে মূলত সরাসরি প্রতিযোগিতা ছিল তারেক রহমান এবং জামাত-এ-ইসলামীর প্রধান শফিকুর রহমানের মধ্যে।
জনমত সংক্রান্ত সমীক্ষাগুলি (ওপিনিয়ন পোল) তারেকের পক্ষে থাকলেও - যেহেতু শাসনব্যবস্থায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দু’টি প্রধান রাজনৈতিক পছন্দের মধ্যে বিএনপি বেশি প্রচলিত - জামাতও খুব বেশি পিছিয়ে ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের নির্বাচনের আগে দলটির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর ও রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ফিরে আসার পর থেকে জামাত সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী বক্তব্যের পটভূমি তৈরির দরুন যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তার পর থেকে জামাত ঢাকা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-সহ দেশের চারটি প্রধান সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ছাত্র নেতাদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির সঙ্গে জামাতের জোট তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দলটিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে বলে আশা করা হয়েছিল। কারণ বাংলাদেশের তরুণ ভোটার দেশের মোট ভোটারদের প্রায় ৪৪ শতাংশ। গত দেড় বছরে জামাত বাংলাদেশের কিছু নেতৃস্থানীয় অংশীদার দেশ থেকেও বহিরাগত সমর্থন পেয়েছে।
বিদেশি পদক্ষেপ
ঢাকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার – যা একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা - এর বাইরেও সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উন্নয়ন সহায়তার একটি মূল উৎস চিন জামাতকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শফিকুর রহমানের ঢাকা অফিসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন - যা ছিল দশ বছরের মধ্যে প্রথম সফর - এবং দলের সুসংগঠিত কাঠামোর প্রশংসা করেন। তার পর থেকে জেইআই এবং বেজিংয়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিনিময়মূলক সফর হয়েছে। বাংলাদেশের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও দলটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। বিপরীতে, নয়াদিল্লি চিরাচরিত ভাবে পাকিস্তানপন্থী এই ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। কারণ জামাত তাদের ভারত-বিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এস. জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরপরই তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ ভারত-বাংলাদেশ অংশীদারিত্বের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবে।
অন্য দিকে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এস. জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরপরই তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ ভারত-বাংলাদেশ অংশীদারিত্বের উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবে। এই সফর একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কারণ ভারতের চিরাচরিত ভাবে বিএনপি-র সঙ্গে হিমশীতল সম্পর্ক রয়েছে। তবে গত বছর থেকে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের খবর এবং জামাতের গোঁড়া মতাদর্শের পাশাপাশি বিএনপি বর্তমানে আরও বাস্তববাদী ও রাজনৈতিক ভাবে পরিণত বিকল্পের প্রতিনিধিত্ব করে। তারেক রহমান নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন। আবার চিনও বিএনপি-র সঙ্গে রাজনৈতিক বন্ধুত্বের ইতিহাস ভাগ করে নেয়। কারণ বেজিং এবং ঢাকার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দলটির শাসনামলে শুরু হয়েছিল।
বাণিজ্য ও উন্নয়নের জন্য বিদেশি তহবিলের উপর নির্ভরশীল একটি দেশ হিসেবে নির্বাচিত সরকারের জন্য বহিরাগত সহায়তা এর রাজনৈতিক বৈধতাকে উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়ে তুলবে। একই সঙ্গে টানাপড়েনপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতা তৈরি করবে।
গণতন্ত্রের পথে আরও এক ধাপ
দক্ষিণ এশিয়া যখন নতুন বাংলাদেশের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে, তখন নির্বাচনের তাৎপর্যকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলেও ব্যালট কেবল নির্বাচনী প্রতিযোগিতাই পুনরুদ্ধার করেছে। আওয়ামী লীগ বাদ পড়ার কারণে এটি সত্যিই জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করেছিল কি না, তা বিতর্কিতও বটে। শেখ হাসিনার প্রাক্তন নির্বাচনী এলাকা এবং আওয়ামীদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত গোপালগঞ্জে বেশিরভাগ ভোটার ভোটদান করা থেকে বিরত ছিলেন। নিষিদ্ধ দলটি ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য এক্স-এর মঞ্চে নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলেও ব্যালট কেবল নির্বাচনী প্রতিযোগিতাই পুনরুদ্ধার করেছে।
তা সত্ত্বেও ইউনূস যখন তাঁর নির্বাচিত প্রতিপক্ষের হাতে শাসনভার হস্তান্তর করতে চলেছেন, তখন বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে এক নির্ণায়ক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে নতুন সরকার কী ভাবে বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন করে এবং প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলা করে, তার উপর। নির্বাচনের পুনরাগমন অন্ত নয়, বরং বাংলাদেশের পরবর্তী গণতান্ত্রিক অধ্যায়েরই সূচনা।
সোহিনী বোস অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Sohini Bose is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), Kolkata with the Strategic Studies Programme. Her area of research is India’s eastern maritime ...
Read More +