ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি এবং কৌশলগত পুনর্নির্মাণ: ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যের অগ্রাধিকারের পরিবর্তনে আরব বিশ্ব নতুন ভিত্তি খুঁজে পেয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম আন্তর্জাতিক সফর ছিল মধ্যপ্রাচ্যে, যা ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্নতাকে দর্শায়। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্টরা চিরাচরিত ভাবে ইউরোপকে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যকে (ইউনাইটেড কিংডম) তাদের প্রথম বিদেশ ভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে এ বার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে রিয়াদের। কারণ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) মতো আরব শক্তিগুলি ট্রাম্পকে ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বছরের পর বছর ধরে উত্তেজনা ও ভাঙনের পর এখন ভূ-রাজনৈতিক ভাবে এই অঞ্চল যা অর্জন করতে চায়, তাতে কিছুটা সংহতির আভাস দেখা যাচ্ছে এবং এমনকি প্রাক্তন শত্রুদের সঙ্গেও সংহতির আভাস মিলেছে। রিয়াদে ট্রাম্পের ভাষণ আংশিক ভাবে দর্শিয়েছিল কেন এই পুনর্মিলনমূলক পরিবর্তনগুলি ঘটছে। সেই ভাষণে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্য ‘বিশৃঙ্খলা নয়, বরং বাণিজ্য’ দ্বারা সংজ্ঞায়িত এমন একটি যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে এই অঞ্চলটি সন্ত্রাসবাদের পরিবর্তে প্রযুক্তি রফতানির জন্য পরিচয় তৈরি করে নেবে। তিনি আরও বলেন যে, তাঁর নেতৃত্বে আমেরিকা নিছকই কোনও প্রচার করবে না বা বাগাড়ম্বরে জড়িয়ে থাকবে না। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন যে, আবুধাবি এবং রিয়াদের সাফল্য নব্য-সংরক্ষণবাদ এবং তথাকথিত ‘দেশ নির্মাতাদের’ দ্বারা চালিত সেই প্যাক্স-আমেরিকানা বিশ্বদৃষ্টির ফসল নয়, যারা আফগানিস্তান ও ইরাকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যয় করলেও স্থিতিশীল উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘শেষ পর্যন্ত তথাকথিত দেশ-নির্মাতারা যতটা গড়তে পেরেছে, চেয়ে অনেক বেশি দেশকে ধ্বংস করেছে।’
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম আন্তর্জাতিক সফর ছিল মধ্যপ্রাচ্যে, যা ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্নতাকে দর্শায়। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্টরা চিরাচরিত ভাবে ইউরোপকে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যকে (ইউনাইটেড কিংডম) তাদের প্রথম বিদেশ ভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে এ বার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে রিয়াদের।
এই অঞ্চলের প্রতি হোয়াইট হাউসের এই সংশোধিত দৃষ্টিভঙ্গিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলি এমন ভাবে অবস্থান সমন্বিত করার সুযোগ হিসেবে দেখেছে, যেখানে সংঘাতকে হ্রাস করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে চিরাচরিত ভাবে বিচ্ছিন্ন দেশ, যেমন সৌদি আরব ও কাতারকে আরও কাছে আনা এবং আরও সহযোগিতামূলকতায় বিশ্বাসী করে তোলা। কারণ ভূ-রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে সৌদি আরব প্রায় অর্ধ দশক ধরে অর্থনৈতিক অবরোধ স্থাপন করেছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে প্রাক্তন আল-কায়েদা (একিউ) জিহাদি আহমেদ আল-শারার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে দোহা ও রিয়াদ যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জনসেবার কাজকে স্থিতিশীল করার জন্য সহযোগিতা করছে। সৌদিরা ইরানের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কও স্বাভাবিক করেছে, যার ফলে সরাসরি সৌদি-ইরান সংঘাতের সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে। এটি এই অঞ্চলের প্রাথমিক সঙ্কটের বিন্দুগুলির পরিবর্তনকেই দর্শায়, বিশেষ করে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে। রিয়াদ এখন বৃহত্তর তেহরান-তেল আভিভ সমীকরণে একটি নিরপেক্ষ গতিশীল শক্তি হিসেবে অবস্থান করছে এবং একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ও গাজার যুদ্ধের মতো মূল বিষয়গুলিতে তার রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখছে।
এমনকি তুরস্ক - প্রেসিডেন্ট রিচেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের অধীনে, যিনি প্রায়শই সুন্নি ইসলামের মধ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন - সিরিয়াকে স্থিতিশীল করার জন্য রিয়াদের সঙ্গে একযোগে কাজ করছেন। ৯/১১-এর পর আমেরিকা যে গোষ্ঠীর (একিউ) সঙ্গে লড়াই করেছিল, তাদের সঙ্গে অর্থাৎ আল-শারার সঙ্গে ট্রাম্পের যুগান্তকারী বৈঠকের সময় এরদোগানও টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে যোগ দিয়েছিলেন। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ট্রাম্পকে পদক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রিলিয়ন ডলারের সৌদি বিনিয়োগের ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যবসামনস্ক ট্রাম্পের জন্য এটি তুলনামূলক ভাবে নিছকই অপ্রয়োজনীয় মূল্য; তিনি এমবিএস কর্তৃক প্রচারিত নীলনকশা অনুসরণ করে দামেস্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে সম্মত হন।
সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত করার প্রচেষ্টা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। আরব রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি এবং দেশ হিসেবে কাজ করে আসছে। আসাদের পতনের পর ইরান, রাশিয়া ও চিনকে তাদের প্রভাব পুনরুদ্ধার বা পুনরর্জন করা থেকে বিরত রাখা আমেরিকার অগ্রাধিকার নয়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক সময়ে গড়ে তুলেছিল এবং এখন হারিয়েছে। এমবিএস এই পদক্ষেপটির বাস্তবায়ন করেছে, যাতে তার আঞ্চলিক অংশীদাররা - যাদের সিরিয়ার ভবিষ্যতের সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে - নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, তুর্কিয়ে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) মতো কুর্দি জঙ্গি আন্দোলনগুলিকে ভেঙে ফেলার জন্য পদক্ষেপ করেছে, যাকে অনেকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পিকেকে ৪০ বছরের বিদ্রোহের পর অস্ত্র সমর্পণ করা এবং দল ভেঙে ফেলার ঘোষণা করেছে। হায়াত তাহরির আল-শামের প্রাক্তন নেতা আল-শারা আগে উত্তর সিরিয়ায় কুর্দি আধিপত্য দমনে তুর্কিদের জন্য কার্যকর ছিলেন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম দু’টি বিদেশ সফরের গন্তব্য ছিল রিয়াদ এবং আঙ্কারা।
ইতিমধ্যে, ইরানের সঙ্গে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের আলোচনা আরব শক্তিগুলির কাছ থেকে খুব একটা প্রতিক্রিয়া পায়নি। ২০১৩-২০১৫ সালের আলোচনার বিপরীতে - যা তেহরান এবং পি৫+১ রাষ্ট্রগোষ্ঠীর মধ্যে যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরের দিকে চালিত করে এবং যার বিরোধিতা করেছিল সৌদি আরব - রিয়াদ এখন আরও বেশি গ্রহণযোগ্য। এমনকি তারা ট্রাম্পের ইরান-বিরোধী নীতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য একটি সম্ভাব্য বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। সৌদি আরব ইরানকে তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলির উপর সম্ভাব্য ইজরায়েলি বিমান হামলা এড়াতে দ্রুত এই ধরনের চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য চাপ দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ইতিমধ্যে, ইরানের সঙ্গে তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের আলোচনা আরব শক্তিগুলির কাছ থেকে খুব একটা প্রতিক্রিয়া পায়নি। ২০১৩-২০১৫ সালের আলোচনার বিপরীতে - যা তেহরান এবং পি৫+১ রাষ্ট্রগোষ্ঠীর মধ্যে যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরের দিকে চালিত করে এবং যার বিরোধিতা করেছিল সৌদি আরব - রিয়াদ এখন আরও বেশি গ্রহণযোগ্য।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জটিলতায় ইজরায়েলের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রার্থীপদ খোলাখুলি ভাবে সমর্থন করে ইজরায়েলের প্রাইম মিনিস্টার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এখন সেই সম্পর্কের সীমাবদ্ধতাও প্রত্যক্ষ করছেন। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সমর্থন করেছেন এবং ইয়েমেনে ইরান ও হুতিদের মতো বিষয়গুলিতে আটকদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন ও ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে আলাপ-আলোচনাকেও উৎসাহ দিয়েছেন… এই সব কিছুর মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে কিছুটা হলেও সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন।
আজকের ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি স্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অভাব রয়েছে। এটি নীতির চেয়ে ব্যক্তিত্ব দ্বারা বেশি পরিচালিত হয়। ট্রাম্প মার্কিন উপস্থিতির মৌলিক বিষয়গুলি বজায় রাখার জন্য বিস্তৃত উদ্দেশ্য প্রকাশ করলেও এবং এই অঞ্চলে রাজতন্ত্রগুলি তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সংরক্ষণের জন্য আর মার্কিন সুরক্ষা পাবে না… এমন আশঙ্কাকে খানিক প্রশমিত করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এই অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো থেকে সরে আসছে। আশ্চর্যজনক ভাবে এটি উপসাগরীয় শক্তিগুলিকে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং বহু-সাযুজ্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং এমনটা হতাশার কারণে নয়, বরং নতুন সুযোগ ও প্রণোদনার প্রতিক্রিয়া হিসাবেই ঘটছে।
তবে শেষ যে প্রশ্নটি রয়েই গিয়েছে: মধ্যপ্রাচ্যে এই সুবিধাজনক জোট কত দিন টিকে থাকবে? ওয়াশিংটনে উপসাগরীয় শক্তিগুলির একে অপরের প্রভাব হ্রাস করার প্রথা হয়তো সাময়িক ভাবে ঐক্যের মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে চিরাচরিত হস্তক্ষেপবাদ যে ম্লান হয়ে যাচ্ছে… সেই স্বীকৃতির মাধ্যমেই এটি পরিচালিত হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটন সম্পূর্ণ রূপে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না, যার মধ্যে রয়েছে আইএসআইএস-বিরোধী অব্যাহত অভিযান এবং লোহিত সাগরে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসা সামরিক-প্রথম কৌশলগুলি। পুরনো প্রবাদ অনুযায়ী তাই বলতেই হয়, ‘মধ্যপ্রাচ্য আসলে এক সুবিশাল ভোজের মতো; আপনি হয় অতিথি তালিকায় থাকবেন অথবা খাদ্যতালিকায়। অতিথি তালিকা থেকে বাদ পড়া সহজ হলেও খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়া কঠিন।’ ট্রাম্প থাকা সত্ত্বেও এবং না চাইলেও এই প্রবাদতুল্য ভোজের কেন্দ্রে থাকছে সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
কবীর তানেজা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর এবং স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.