-
CENTRES
Progammes & Centres
Location
মোদীর আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সফর পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে ভারত-লাতিন আমেরিকা সম্পর্ক আরও গভীর করার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি সরকার প্রধানদের আন্তর্জাতিক সফরগুলি সাধারণত জাঁকজমক ও প্রতীকময় হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাম্প্রতিক আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সফরও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আর্জেন্টিনা সফরের প্রথম পর্যায়ে মোদী জেনারেল হোসে ডি সান মার্টিনের মূর্তিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, যিনি ‘আর্জেন্টিনা, চিলি ও পেরুর মুক্তিদাতা’ নামে পরিচিত একজন প্রতীকী ব্যক্তিত্ব। পরে মোদী ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মাইলি প্রাসাদীয় কাসা রোসাদার (গোলাপি বাড়ি) বারান্দা থেকে জনগণের উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়েছিলেন। এই বাড়িতেই আর্জেন্টিনার সরকার প্রধানের কার্যালয় অবস্থিত। মোদী ব্রাজিলে বিমান থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে সালভাদরের আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান, সাম্বা-রেগে ব্যান্ড বাতালা মুন্ডোর সুরে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। ব্রাসিলিয়ায় প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ১১৪ ঘোড়াসম্পন্ন এক মনোময় শোভাযাত্রার মাধ্যমে মোদীকে স্বাগত জানান। তিনি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান - ন্যাশনাল অর্ডার অফ দ্য সাদার্ন ক্রস - মোদীকে প্রদান করেন।
মোদী ব্রাজিলে বিমান থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে সালভাদরের আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান, সাম্বা-রেগে ব্যান্ড বাতালা মুন্ডোর সুরে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়।
ভারত ও লাতিন আমেরিকার মধ্যে এই প্রতীকী বিনিময় খুব একটা প্রচলিত নয়। সর্বোপরি, ১৯৬৮ সালে ইন্দিরা গান্ধীর লাতিন আমেরিকা সফরের পর মোদীর বুয়েনস আইরেস সফর ছিল কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সফর। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিমহা রাও ১৯৯৫ সালে জি১৫ শীর্ষ সম্মেলনের জন্য বুয়েনস আইরেস গিয়েছিলেন এবং ২০১৮ সালে মোদী আর্জেন্টিনায় জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও সফরকেই ‘সরকারি’ সফর হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি। ‘সরকারি’ সফরে সাধারণত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং তা স্বভাবেও হয় স্বতন্ত্র। প্রকৃতপক্ষে, মোদীর ব্রাজিল সফরও ছিল ১৯৬৮ সালের পর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীদের পূর্ববর্তী সফরগুলি মূলত ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকা), আইবিএসএ (ভারত, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সংলাপ) অথবা জি২০-র মতো বহুপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য ছিল। ভারতীয় সরকার প্রধানদের লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘ সফর করা বিরল হলেও এই ধরনের সফরের সাধারণত তাৎক্ষণিক বা ফলপ্রসূ ফলাফল হয় না। এগুলি কূটনীতির একটি নিয়মিত অনুশীলন হিসেবেই রয়ে গিয়েছে এবং লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের প্রতি আকর্ষণ তৈরির জন্য নয়াদিল্লির অভিপ্রায়ের ইঙ্গিত দেয়। এগুলি ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা বৃদ্ধির প্রমাণ।
ব্রাজিলে ভারতের রফতানি – লাতিন আমেরিকায় রফতানির প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ - কৃষি-রাসায়নিক, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং ওষুধের মতো মূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে ঝুঁকে থাকে।
ভারত-লাতিন আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনীতি ব্যবসার চেয়ে গৌণ। গত দশকে ভারত ও লাতিন আমেরিকার মধ্যে রাজনৈতিক সফর বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে উভয় পক্ষের ব্যস্ত বাণিজ্যিক পথের তুলনায় তাদের পৌনঃপুনিকতা অনেক কম। ভারত এখন লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের শীর্ষ পাঁচটি বৃহত্তম রফতানি গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে এবং আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের শীর্ষ ১০টি বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারের মধ্যে অন্যতম। ব্রাজিলের সঙ্গে ভারতের গড় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০১৪-২০১৯ পাঁচ বছরের জন্য ৭.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০২০-২০২৪ সালে ১১.৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি (নিচের রেখচিত্র ১-এ চিত্রিত)। কোভিড-১৯ অতিমারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ফলে ২০২২ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৬.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের আগে ভারত ইউক্রেন থেকে প্রচুর পরিমাণে সূর্যমুখী তেল আমদানি করেছিল, যা পরবর্তীতে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলি থেকে সয়বিন তেল দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। ব্রাজিলে ভারতের রফতানি – লাতিন আমেরিকায় রফতানির প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ - কৃষি-রাসায়নিক, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং ওষুধের মতো মূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে ঝুঁকে থাকে। অন্য দিকে, ব্রাজিলের রফতানি মূলত পণ্য - যেমন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, চিনি, অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম এবং তুলা। একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক উন্নয়ন ভারত-ব্রাজিল বাণিজ্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ব্রাজিল বাণিজ্য যুদ্ধ, যেখানে ওয়াশিংটন হঠাৎ করে ব্রাজিলের আমদানির উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এটি ভারতে ব্রাজিলের অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, কাঠ, চিনি এবং লোহা ও ইস্পাত-সহ অন্যান্য পণ্যের রফতানির দরজা খুলে দিতে পারে। তবুও উভয় দেশের জটিল, প্রতিরক্ষামূলক ও আমলাতান্ত্রিক প্রকৃতির কারণে স্বল্পমেয়াদে বাণিজ্য দ্বিগুণ বা তিনগুণ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
রেখচিত্র ১. ভারত-ব্রাজিল বাণিজ্য (মার্কিন ডলারে)

সূত্র: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র, www.trademap.org
সর্বোপরি, ভারত-ব্রাজিল বাণিজ্যের তুলনায় আর্জেন্টিনার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য নগণ্য। ২০১৪-২০১৯ পাঁচ বছর ধরে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ভারতের গড় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ২.৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০২০-২০২৪ সালে তা বেড়ে ৪.৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আর্জেন্টিনার জন্য বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে ভারতের গুরুত্ব অপরিবর্তনীয়। ২০২৪ সালে আর্জেন্টিনার উদ্ভিজ্জ তেল রফতানির ৫২ শতাংশ - সয়াবিন তেল এবং সূর্যমুখী তেল দিয়ে তৈরি - ভারতে পাঠানো হয়েছিল। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ভারতে আর্জেন্টিনার রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশ উদ্ভিজ্জ তেল, বাকি রফতানির বেশির ভাগই সোনা, কাঠ এবং চামড়ায় পরিপূর্ণ।
রেখচিত্র ২. ভারত-আর্জেন্টিনা বাণিজ্য (মার্কিন ডলারে)

সূত্র: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র, www.trademap.org
ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা উভয়ই মার্কোসুরের অবিচ্ছেদ্য সদস্য, যা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, বলিভিয়া এবং প্যারাগুয়েকে নিয়ে গঠিত একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্লক। তবে মোদীর সাম্প্রতিক সফরে মার্কোসুরের কথা খুব কমই উল্লেখ করা হয়েছিল, যদিও ভারত-মার্কোসুর অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণের প্রক্রিয়াধীন। এর সম্পূর্ণ কারণ হল মার্কোসুরের নিজস্ব চ্যালেঞ্জ, যার মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মার্কোসুরকে অন্তর্ভুক্ত না করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রচেষ্টা, আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক ব্লক ত্যাগের হুমকি, ২০১২ সালে ভেনেজুয়েলার অন্তর্ভুক্তি ও ২০১৬ সালে এর স্থগিতাদেশ এবং ২০২৪ সালে বলিভিয়ার যোগদান।
ব্রাজিলীয় ও আর্জেন্টিনার সংস্থাগুলিও ভারতে প্রবেশের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে, যা একটি কঠিন কিন্তু প্রতিশ্রুতিশীল বাজার এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
ভারত ও ব্রাজিলের মধ্যে সীমান্তবর্তী বিনিয়োগ আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং অল্প পরিমাণে হলেও ভারত ও আর্জেন্টিনার মধ্যে বিনিয়োগ বেড়েছে। মূল্যের দিক থেকে (ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের আনুমানিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) এবং সংস্থার সংখ্যা উভয় দিক থেকেই লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে ব্রাজিল সবচেয়ে বেশি ভারতীয় বিনিয়োগের আবাসস্থল।(১) প্রযুক্তি, অটোমোবাইল, কৃষি রাসায়নিক এবং ভোগ্যপণ্য খাতে মুষ্টিমেয় ভারতীয় সংস্থার আর্জেন্টিনায় উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতীয় সংস্থাগুলি আর্জেন্টিনায় ৮,১০০ জন এবং ব্রাজিলে ১৬,০০০ জনেরও বেশি লোককে নিয়োগ করে।(২) ব্রাজিলীয় ও আর্জেন্টিনার সংস্থাগুলিও ভারতে প্রবেশের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে, যা একটি কঠিন কিন্তু প্রতিশ্রুতিশীল বাজার এবং এখন পর্যন্ত প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
ভারত-লাতিন আমেরিকা সম্পর্কের অগ্রভাগে বাণিজ্য থাকতে পারে। তবে উভয় পক্ষের রাজনীতিবিদদের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক হুমকি ও চিন থেকে দূরে মূল্য শৃঙ্খলের বিশ্বব্যাপী পুনর্বিন্যাসের ফলে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলিকে কাজে লাগানোর জন্য এটি একটি উপযুক্ত সময়। এটি লাতিন আমেরিকাকে ভারতের অর্থনৈতিক কক্ষপথের আরও কাছে নিয়ে আসার সুযোগ করে দিতে পারে।
হরি শেষশায়ী অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভিজিটিং ফেলো এবং কনসিলিয়াম গ্রুপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
১) লেখকের ব্যক্তিগত হিসাব অনুসারে, সরকারি কর্মকর্তা এবং বেসরকারি সংস্থাগুলির অনুমানের উপর ভিত্তি করে, ব্রাজিলে ১০০টিরও বেশি ভারতীয় সংস্থার একটি করে কার্যালয় বা প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
২) সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের উপর ভিত্তি করে অনুমান।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Hari Seshasayee is a visiting fellow at ORF, part of the Strategic Studies Programme, and is a co-founder of Consilium Group. He previously served as ...
Read More +