রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত সফর করে গেলেন। বার্ষিক নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফল মূলত ভারত কী ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধের সমাধান করে তার উপর নির্ভর করবে।
ভারত-রাশিয়া সম্পর্ককে ‘হিন্দি রুশি ভাই ভাই’ স্লোগানের আওতায় পরিপূর্ণ বন্ধুত্ব অথবা ‘বিশেষ ও সুবিধাপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করা খানিক ক্লিশেই বটে, যা ২০১০ সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে গৃহীত একটি সরকারি তকমার মতো। এই দু’টি শব্দবন্ধই দুই দেশের মধ্যে দৃঢ় বন্ধনের উপর জোর দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, যারা ঠান্ডা লড়াই, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন সহ্য করেছে। এ ভাবেই সম্পর্কটি ‘সময়-পরীক্ষিত’ হওয়ার অতিরিক্ত উপাধি অর্জন করেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ঘটনাটি আবারও প্রকাশিত হয়েছে। রাশিয়া-পশ্চিম সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে নয়াদিল্লি নিজেকে খুঁজে পেয়েছে, কঠোর বৈদেশিক নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ভারতের অবস্থান ছিল কঠোর নিরপেক্ষতার: ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানকে সমর্থন না করা এবং রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখে যুদ্ধের দ্রুত অবসানের আহ্বান জানানো। কূটনৈতিক সূক্ষ্মতা সত্ত্বেও এই পদ্ধতি পশ্চিমের রাজধানীগুলিকে বিরক্ত করেছে, যারা নয়াদিল্লিকে মস্কোর উপর আরও চাপ প্রয়োগ করতে বাধ্য করতে চায়। তবে ভারতের বেড়াজাল বেঁধে রাখা এবং বিবদমান পক্ষগুলির মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করার মাঝেমধ্যে প্রচেষ্টা – যেমনটা ২০২৩ সালে জি২০ সভাপতিত্বের সময় দেখা গিয়েছিল - পশ্চিমি বিশ্ব সহ্য করেছে। তা ছাড়া, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ভারতের রেকর্ড আমদানি - যা ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে - আপাতদৃষ্টিতে সমস্ত অংশীদারদের উপকার করেছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিশোধিত তেল পণ্য হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে পুনঃরফতানি করা হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে আরোহণ ভূ-রাজনৈতিক মনোভাব-সহ বিশ্ব পরিস্থিতির অনেক কিছুকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস পর একটি অপ্রত্যাশিত ও অভাবনীয় পদক্ষেপে ট্রাম্প মার্কিন মাটিতে ভ্লাদিমির পুতিনকে আতিথ্য করেছেন, যিনি মার্কিন সরকারি নথিতে ‘তীব্র’ এবং ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ হিসাবে স্বীকৃত একটি দেশের প্রেসিডেন্ট এবং একই সঙ্গে ভারতের উপর ৫০% অভূতপূর্ব শুল্ক আরোপ করেছেন, যে কিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য অংশীদার’। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন দাবি যে, ভারতের রুশ তেল আমদানি ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধে কার্যকর ভাবে অর্থায়ন করছে’, তা নয়াদিল্লির বিদেশনীতির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বার্ষিক নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফল মূলত ভারত কী ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ সমাধান করে, তার উপর নির্ভর করবে।
বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলার সঙ্গে সঙ্গে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাও দেখা দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই এবং নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মস্কো ও কাজান সফরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বিষয়সূচির স্থবিরতা উন্মোচিত হয়, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পরিবহণ সংযোগ, বাণিজ্য এবং ব্যবসা-সহ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন করে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। অতএব, দ্বিপাক্ষিক সংলাপ স্থিতিশীল থাকাটা খুব একটা অবাক করার মতো বিষয় নয়। অগস্ট মাসে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং বিদেশমন্ত্রী ডঃ এস. জয়শঙ্করের মস্কো সফর এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে তিয়ানজিনে এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে মোদী-পুতিন বৈঠকের কথা উল্লেখ্য।
এই সম্পৃক্ততার বেশির ভাগই আসলে পুতিনের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত ভারত সফরের প্রস্তুতিমূলক কাজ ছিল। তবে বার্ষিক নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফল মূলত ভারত কী ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ সমাধান করে, তার উপর নির্ভর করবে। ট্রাম্প যখন ভারতের উপর চাপ প্রয়োগকে মস্কোর তেল রফতানি রাজস্ব বন্ধ করে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর উপায় হিসেবে দেখছেন, তখন মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক ভারত-মার্কিন বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত। এর অর্থ হল ট্রাম্পের দাবি মোকাবিলায় মধ্যম পথ খুঁজে বের করলে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে তার জ্বালানি সহযোগিতার কিছু অংশ ত্যাগ করতে বাধ্য হতে পারে।
সরকার-স্তরের মিথস্ক্রিয়া বেশ দৃঢ় থাকলেও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও সূক্ষ্মতা রয়েছে। রাশিয়ার বাজারে পশ্চিমি সংস্থাগুলির শূন্যস্থান পূরণ করতে ভারতীয় সংস্থাগুলি তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে যায়নি। যাঁরা আগে রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করেছিলেন, তাঁরা যথারীতি ব্যবসা চালিয়ে গিয়েছেন এবং যখন বহুজাতিক সংস্থাগুলি ২০২২ সালে রাশিয়া থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তাঁরাও তাতে যোগ দিয়েছিলেন। শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা - বিশেষ করে যাঁদের বিশ্ববাজারের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে - তাঁরা রাশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক ফোরামে যোগ দিতে বেশ অনিচ্ছুক। রাশিয়ার অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে বা যৌথ প্রকল্প বিকাশের জন্য ভারতীয় সংস্থাগুলিকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা সাধারণত ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে, রুশ ব্যবসাগুলি ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে বা তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখিয়েছে। এই পথে তারা অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছে, যদিও কিছু সাফল্যের আখ্যানও রয়েছে, মূলত রেলওয়ে এবং ডিজিটাল খাতে এমনটা হয়েছে। মার্কিন ডলার থেকে ‘জাতীয় মুদ্রা’য় বাণিজ্য স্থানান্তরের ফলে রুশ সংস্থাগুলির কাছে ভারতীয় টাকার যে উদ্বৃত্ত রয়েছে, তা রুশ সংস্থাগুলিকে ভারতীয় অর্থনীতিতে, বিশেষ করে অবকাঠামো প্রকল্প, সরকারি উদ্যোগ এবং স্টকে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছে।
রুশ ব্যবসাগুলি ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে বা তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখিয়েছে।
মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন নতুন প্রবণতা দেখা গিয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ভারত সব সময়ই রুশদের আকর্ষণ করেছে। কিন্তু মনে হচ্ছে গত তিন বছরে পর্যটকদের আগমনের হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, যা প্রতিফলিত হচ্ছে ক্রমবর্ধমান উৎসব, বইমেলা এবং প্রদর্শনীর সংখ্যার দ্বারা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে মস্কোতে অনুষ্ঠিত ‘উৎসব ভারত’ নামে একটি অনুষ্ঠান আনুমানিক ৮৫০,০০০ দর্শককে আকর্ষণ করেছিল। বলিউডের ছবিগুলি এখন রাশিয়ার বাজারে আগের তুলনায় অনেক বেশি করে মুক্তি পায়। সেই ছবিগুলি এখনও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি এবং সোভিয়েত যুগের মতো রুশ জনগণের কাছে ততটা পরিচিত না হয়ে উঠলেও রাশিয়ার প্রধান শহরগুলিতে এ হেন ছবির প্রিমিয়ার পুনরুজ্জীবিত উৎসাহকেই দর্শায়।
রাশিয়ায় ভারতীয় জনশক্তির আগমন ক্রমবর্ধমান, যেখানে ভারতীয় নাগরিকরা এখন ‘বিদেশে’ বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল এবং চিনা শ্রমিকদের পরেই জায়গা করে নিয়েছে। ভারতীয় শ্রমিকদের এখন রুশ উদ্যোগগুলির মধ্যে উচ্চ চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে নির্মাণ, বস্ত্র, গুদামজাতকরণ, কৃষি এবং খাদ্য শিল্পে। রাশিয়ায় অধ্যয়নরত ভারতীয়দের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ৩০,০০০-এরও বেশি শিক্ষার্থী রুশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ভর্তি হয়েছেন এবং মূলত চিকিৎসা বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। তবে ভারতীয় পর্যটকদের জন্য রাশিয়া আকর্ষণীয় গন্তব্য বলে মনে হচ্ছে না। ই-ভিসা ব্যবস্থা পর্যটকদের ১৬ দিন পর্যন্ত দেশে থাকার সুযোগ করে দিলেও ভারতীয় পর্যটকদের আগমনের সংখ্যা অতিমারি-পূর্ব স্তরের কাছাকাছি পৌঁছয়নি এবং প্রায় ২৫,০০০-৩০,০০০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে।
ঐতিহাসিক স্মৃতি দুই দেশের মধ্যে একটি অদৃশ্য সংযোগ হিসেবে রয়ে গিয়েছে, তাদের বন্ধুত্বের রসায়ন অতীতের অনুভূতি - কখনও কখনও অলঙ্কৃত - এখনও আজকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনেকাংশকে অবহিত করে।
ইতিবাচক গতিশীলতা সত্ত্বেও তৃণমূল পর্যায়ে সংযোগ হল ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের দুর্বলতম বিন্দু। পুরনো প্রজন্ম দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব সম্পর্কে বেশি সচেতন, বলিউড চলচ্চিত্র এবং সোভিয়েত সাহিত্যের মাধ্যমে একে অপরের সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান অর্জন করলেও তরুণ প্রজন্ম এ সব বিষয়ে অনেকটাই কম অবগত। ঐতিহাসিক স্মৃতি দুই দেশের মধ্যে একটি অদৃশ্য সংযোগ হিসেবে রয়ে গিয়েছে, তাদের বন্ধুত্বের রসায়ন অতীতের অনুভূতি - কখনও কখনও অলঙ্কৃত - এখনও আজকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনেকাংশকে অবহিত করে। যাই হোক, ভবিষ্যতের নেতাদের পছন্দ সম্ভবত আরও বাস্তবসম্মত বিবেচনার দ্বারা চালিত হবে এবং এই প্রজন্মগত পরিবর্তন অনিবার্য ভাবে এক দশক বা তারও বেশি সময়ের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় আউটলুক-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Aleksei Zakharov is a Fellow with ORF’s Strategic Studies Programme. His research focuses on the geopolitics and geo-economics of Eurasia and the Indo-Pacific, with particular ...
Read More +