এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় দ্য হিন্দু-তে।
ইন্দো-প্যাসিফিক সমীকরণ ভারত-ভিয়েতনাম দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন রূপ দিচ্ছে।
৫-৭ মে, ২০২৬ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট তো লামের ভারত সফর ভারত-ভিয়েতনাম সম্পর্কের ক্রমাগত গভীরতার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত, যা ইন্দো-প্যাসিফিকের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত বাধ্যবাধকতার মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের পরিপক্বতাকে প্রতিফলিত করে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি বর্ধিত ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত এবং প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও জ্বালানি-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত চুক্তিগুলি কেবল সামান্য অগ্রগতিই নয়, বরং সম্পর্কের গতিপথে একটি গুণগত পরিবর্তনকেই দর্শায়।
এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে; এক দিকে ভিয়েতনাম দক্ষিণ চিন সাগরে ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী চিনের মোকাবিলা করছে, অন্য দিকে ভারত তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিকে একটি অধিক নিরাপত্তাকেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে সংহত করে চলেছে। বিশেষত সামুদ্রিক জবরদস্তি, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে হুমকির ধারণার অভিন্নতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য একটি স্থিতিশীল ভিত্তি প্রদান করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ভারত-ভিয়েতনাম সম্পর্কের বিবর্তন ধীর কিন্তু কাঠামোগত ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভারতের তৎকালীন ‘লুক ইস্ট’ (বর্তমানে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’) নীতি এই সম্পর্কের প্রাথমিক প্রেরণা যুগিয়েছিল এবং ২০১৬ সালে এটিকে একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্ভব হয়েছে। তার পর থেকে নিয়মিত উচ্চ-পর্যায়ের বিনিময়, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং সক্ষমতা-বর্ধনমূলক উদ্যোগগুলি পারস্পরিক বিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার স্তম্ভ
বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই অংশীদারিত্বের মেরুদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৩ সালে মিসাইল করভেট আইএনএস কৃপাণ হস্তান্তরের মতো প্রতীকী পদক্ষেপের পাশাপাশি ভারত ভিয়েতনামকে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ সহায়তা এবং সামুদ্রিক সহযোগিতার কাঠামো প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে। ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে চলমান বিতর্ক দক্ষিণ চিন সাগরে প্রতিরোধ ব্যবস্থার হিসেব-নিকেশে সক্ষমতা বৃদ্ধি থেকে দক্ষতা বাড়ানোর দিকে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা, দুর্লভ খনিজ সহযোগিতা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট একীকরণের উপর মনোযোগের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের দিকে একটি পদক্ষেপ প্রতিফলিত হয়েছে।
একই ভাবে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখন তা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৬ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অব্যবহৃত সম্ভাবনার স্বীকৃতিকেই তুলে ধরে। সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা, দুর্লভ খনিজ সহযোগিতা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট একীকরণের উপর মনোযোগের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের দিকে একটি পদক্ষেপ প্রতিফলিত হয়েছে। সর্বোপরি, অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথ-ইস্ট এশিয়ান নেশনস-এর (আসিয়ান) একটি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ভিয়েতনামের অবস্থান এটিকে ভারতের বৈচিত্র্যকরণ পরিকল্পনার জন্য একটি অপরিহার্য অংশীদার করে তুলেছে, বিশেষ করে চিন-কেন্দ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে।
আঞ্চলিক প্রভাব
এই গভীরতর অংশীদারিত্বের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, ভারত ও ভিয়েতনামের মধ্যকার সম্পর্ক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্ষুদ্র-বহুপাক্ষিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গঠন করে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে উভয় দেশই কৌশলগত জোটের একটি বৃহত্তর শৃঙ্খলে অবদান রাখে, যা একটি নিয়ম-ভিত্তিক সামুদ্রিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য লড়াই করে, যদিও তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট কাঠামোতে আইনত অন্তর্ভুক্ত নয়। দক্ষিণ চিন সাগরে একপাক্ষিকতা মোকাবিলার উদ্দেশ্যে একটি অভিন্ন আদর্শগত কাঠামো ‘আইনের শাসন, শান্তি ও স্থিতিশীলতা’-র উপর যৌথ বিবৃতিগুলির সুস্পষ্ট গুরুত্ব আরোপের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।
দ্বিতীয়ত, এই অংশীদারিত্ব ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আসিয়ানের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে তুলে ধরে। আসিয়ানের অন্যতম ভূ-রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী এবং কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ভিয়েতনাম, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের গভীরতর সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে, বৈচিত্র্যকরণ এবং কৌশলগত ঝুঁকি হ্রাসকরণ দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হানোইয়ের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি ভারতের বহুমুখী অংশীদারিত্বমূলক পদ্ধতির মধ্যে একটি স্বাভাবিক পরিপূরক খুঁজে পেয়েছে।
তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উদীয়মান প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতার সম্প্রসারণ ইন্দো-প্যাসিফিকে কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্রমবিকাশমান প্রকৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। ভারত-ভিয়েতনাম অংশীদারিত্বের মতো অংশীদারিত্বগুলো বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কারণ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলগুলো আরও বেশি সুরক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এই সফরকালে হওয়া চুক্তিগুলি অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য একটি আরও ব্যাপক কাঠামোর পক্ষে প্রচলিত অর্থনৈতিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে যাওয়ার প্রচেষ্টার দিকে ইঙ্গিত করে।
কাঠামোগত বিষয়সমূহ
ভবিষ্যতে ভারত-ভিয়েতনাম সম্পর্কের গতিপথ নির্ভর করবে উভয় পক্ষের কৌশলগত উদ্দেশ্যকে কার্যকর ফলাফলে রূপান্তর করার ক্ষমতার উপর। শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কৌশলগত সংগতি থাকা সত্ত্বেও, বিশেষ করে বাণিজ্য, সংযোগ এবং প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রহ্মসের মতো প্রতিরক্ষা রফতানি বাস্তবায়নের জন্য বৈজ্ঞানিক, আর্থিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বাধা অতিক্রম করা প্রয়োজন। একই ভাবে, উচ্চাভিলাষী বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য রসদ সরবরাহ, আইনি কাঠামো এবং বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা-সহ কাঠামোগত বাধাগুলো সমাধান করাও আবশ্যক।
ভারত-ভিয়েতনাম সম্পর্ক ইন্দো-প্যাসিফিকের ক্রমবিকাশমান কাঠামোর মধ্যে ক্রমশ আরও গভীর ভাবে প্রোথিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহৎ শক্তিগুলির প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতার সঙ্গে কৌশলগত আস্থাকে একত্র করে এমন অংশীদারিত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সুতরাং তো লামের এই সফরটি একটি একক কূটনৈতিক মাইলফলকের চেয়ে বরং একটি পরিণত, বহুমুখী অংশীদারিত্ব হিসেবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সূচনাকে চিহ্নিত করার জন্যই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় দ্য হিন্দু-তে।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +